স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে প্রতিবেশি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সফরের বিরোধিতাকে কেন্দ্র করে হাটহাজারী-পটিয়া ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সহিংস তান্ডবের মামলায় একে একে গ্রেপ্তার হচ্ছেন হেফাজতে ইসলামের বিলুপ্ত কমিটির শীর্ষস্থানীয় নেতারা। কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক এই সংগঠনটির প্রথম সারির পদগুলোতে দায়িত্ব পালনকারী চট্টগ্রামের তিন ডজনেরও বেশি নেতা আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর গ্রেপ্তারের তালিকায় রয়েছেন। আর গ্রেপ্তার এড়াতে সেসব নেতার অনেকেই আত্মগোপনেও রয়েছেন। তবে র্যাব-পুলিশ তালিকাভুক্তদের খোঁজে সন্দিগ্ধ জায়গাগুলোতে হানা দিচ্ছে।
তান্ডবের মামলা তদন্তের সাথে সম্পৃক্ত পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের সার্বিক আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি করোনার প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে সরকারের লকডাউনসহ নানা বিধি-নিষেধ মাঠ পর্যায়ে কার্যকর করার দায়িত্ব রয়েছে পুলিশের কাঁধে। এর বাইরে অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে হেফাজতে ইসলামের তান্ডবের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোর তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নেয়া। এক্ষেত্রে অতীতের নমনীয়তার বদলে যেখানে যতটুকু প্রয়োজন সর্বোচ্চ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাহিনীর শীর্ষ পর্যায় থেকে নির্দেশনা রয়েছে। মামলার তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নিতেই এজাহারভুক্ত আসামিসহ ঘটনার সাথে যাদের সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়, তাদেরকে গ্রেপ্তার করা এবং জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার। এখন সেটাই করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার হয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের নির্দেশে রিমান্ডে থাকা হেফাজতের বিলুপ্ত কমিটির নেতাদের অনেকেই মামলা-সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তান্ডবের নেপথ্যে থাকা অনেকের নাম-পরিচয়ও প্রকাশ করেছেন। নিজস্ব অনুসন্ধানের পাশাপাশি জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই করে মামলা-সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।
সর্বশেষ গতকাল বুধবার বিকেলে হেফাজতে ইসলামের বিলুপ্ত কমিটির প্রচার সম্পাদক জাকারিয়া নোমান ফয়জীকে কক্সবাজারের চকরিয়া থেকে গ্রেপ্তার করে চট্টগ্রাম জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের একটি দল। তিনি হাটহাজারীর মেখল হামিউছ-ছুন্নাহ মাদ্রাসার শিক্ষক। চট্টগ্রামে গ্রেপ্তারের তালিকায় এরকম তিন ডজনের বেশি নেতার নাম রয়েছে। যাদের কয়েকজন এরইমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন।
জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) এস এম রশিদুল হক পূর্বদেশকে বলেন, হেফাজত নেতা জাকারিয়াকে চকরিয়া থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হাটহাজারীতে সাম্প্রতিক সহিংসতা ও তান্ডবের ঘটনায় ইন্ধনদাতা হিসেবে তার নাম রয়েছে। এ ব্যাপারে তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। এ ছাড়া হেফাজতে ইসলামের সাবেক আমির আহমদ শফীকে হত্যার অভিযোগে করা মামলায় পিবিআই- এর তদন্তে তার নাম এসেছে। তিনি গ্রেপ্তার এড়াতে হাটহাজারী থেকে কক্সবাজারের চকরিয়ায় আত্মগোপন করেছিলেন।
পুলিশ জানায়, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তের পর গত ১১ এপ্রিল সন্ধ্যায় হাটহাজারী বাসস্ট্যান্ড থেকে র্যাব-পুলিশের যৌথ দল হেফাজতে ইসলামের বিলুপ্ত কমিটির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদীকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়েই সংগঠনটির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের আইনের আওতায় আনার পদক্ষেপ নেয়া শুরু করে। গতকাল বুধবার গ্রেপ্তার হওয়া সংগঠনের তখনকার প্রচার সম্পাদকের দায়িত্বে থাকা জাকারিয়া নোমান ফয়েজীই সর্বপ্রথম গণমাধ্যম কর্মীদেরকে আজিজুল হক আটক হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন। পরদিন ঢাকায় পুলিশ তাকে আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেয়। এরপর হাটাহাজারী থানার তান্ডবের মামলায় বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের পর নগরীর লালখানবাজার মাদ্রাসা থেকে র্যাব হেফাজতের বিলুপ্ত কমিটির শিক্ষা ও সংস্কৃতি সম্পাদক মুফতি হারুন ইজাহারকে গ্রেপ্তার করে। বর্তমানে তিনি হাটহাজারী থানার দুটিসহ তিনটি মামলায় মোট নয়দিনের রিমান্ডে রয়েছেন। এর মধ্যে গত ৪ মে রাতে হাটহাজারী মাদ্রাসার শিক্ষক ও হেফাজত ইসলামের বর্তমান আহব্বায়ক কমিটির সদস্যসচিব নুরুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি দল রাজধানী ঢাকায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে তার বাসভবনে সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাতকালে হেফাজত নেতারা লিখিতভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাতে সংগঠনের গ্রেপ্তারকৃত নেতাকর্মীদের মুক্তি ও ধরপাকড় বন্ধসহ চার দফা লিখিত দাবিনামা জমা দেন।
পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মো. আনোয়ার হোসেন পূর্বদেশকে বলেন, থানাসহ সরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা-ভাঙচুর, জনচলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তান্ডব চালানোর মামলায় যারা অভিযুক্ত রয়েছেন, তাদেরকেই প্রচলিত আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। কার কী দলীয় পরিচয় বা কে কোন সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছেন, সেটা দেখা পুলিশের কাজ নয়। মামলার নথিপত্র এবং তদন্তে বেআইনি কর্মকান্ডে জড়িত কিনা সেটাই পুলিশের কাছে একমাত্র বিবেচ্য বিষয়। সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই তান্ডবের সাথে সম্পৃক্তদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরবিরোধী কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে গত ২৬ মার্চ ঢাকার বায়তুল মোকাররম মসজিদ এলাকায় সংঘর্ষ হয়। এর জেরে ওই দিনই হাটহাজারী ও পটিয়ায় সহিংসতার ঘটনা ঘটে। হাটহাজারীতে পুলিশের সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের কর্মীদের সংঘর্ষে চারজন নিহত হন। সেসময় পটিয়া ও হাটহাজারী থানা ভবনে হামলা, ভূমি অফিস ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে পৃথক সাতটি মামলা হয়। এসব মামলায় ৪ হাজার ৩০০ জনকে আসামি করা হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে পরদিন সারাদেশে হরতাল কর্মসূচি পালন করে হেফাজতে ইসলাম। সংগর্ষের পর থেকেই চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়কের হাটহাজারী অংশের ওপর রীতিমত প্রাচীর তুলে যান ও জনচলাচল বন্ধ করে দেয় হাটহাজারী মাদ্রাসার বিক্ষুব্ধ ছাত্ররা। এরপর গত ২২ এপ্রিল হেফাজতের নেতা-কর্মীদের আসামি করে পৃথক তিনটি মামলা করে হাটহাজারী থানা পুলিশ। এর মধ্যে দুই মামলায় হেফাজতের বিলুপ্ত কমিটির আমির জুনায়েদ বাবুনগরীকেও আসামি করা হয়। তিন মামলায় আসামি করা হয় তিন হাজার জনকে। এর মধ্যে একশ’ ৪৮ জনের নাম এজাহারে উল্লেখ করা হয়।



