স্বাধীনতা সংগ্রামে ইনু ও ইউসুফ সালাহউদ্দিনের অবদান অবিস্মরণীয়

0
স্বাধীনতা সংগ্রামে ইনু ও ইউসুফ সালাহউদ্দিনের অবদান অবিস্মরণীয়

নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

মুক্তিযুদ্ধে বিএলএফ বাহিনীর সীতাকুন্ড থানা কমান্ডার এবং সন্দ্বীপ, সীতাকুন্ড ও মিরসরাই-তিন থানার এফএফ কমান্ডার, খ্যাতিমান প্রকৌশলী এই পরিচয় স্বাধীনতা সংগ্রামে ইঞ্জিনিয়ার ইউসুফ সালাহউদ্দিনের অবদানকে সামান্যই জ্ঞাপন করে। তার চেয়েও বৃহৎ এবং আরো মহৎ কৃতিত্বে সমুজ্জ্বল তাঁর সংগ্রামী জীবন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পতাকা তৈরিতে তিনি অবদান রাখেন। তিনি তখন ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির ছাত্র। পতাকা তৈরি ছাড়াও স্বাধীনতার জন্য তাঁর শ্রেষ্ঠ অবদান হলো- ছাত্রনেতা হাসানুল হক ইনু এবং তিনি মলোটভ ককটেল ফাটিয়ে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান বিচারপতি এস এ রহমানকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধ শুধু ৯ মাসের ঘটনা প্রবাহ নয়। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহাসিক পটভূমি। মহান মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর ইতিহাসের বহু ঘটনা প্রবাহের সাথে ইউসুফ সালাউদ্দিন ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। বিশেষ করে ৬৮তে বঙ্গবন্ধুসহ ৩৫জন রাজনীতিবিদ, সিএসপি অফিসার এবং ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিরুদ্ধে জনমত গঠনসহ ঊনসত্তরের গণঅভ্যূত্থানের প্রাক্কালে প্রতিটি আন্দোলন সংগ্রামে তিনি সামনের সারিতে ছিলেন। ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্রলীগের কর্মকান্ডে সরাসরি সম্পৃক্ত হন। দরাজ কণ্ঠে নিত্যনতুন স্লোগান দিয়ে তখন নেতাদের দৃষ্টি কেড়েছিলেন তিনি। ইতিমধ্যে পূর্বপাকিস্তান কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কমিটি গঠিত হয়। তোফায়েল আহমদ সভাপতি ও আ স ম আবদুুর রব সাধারণ সম্পাদক। ওই কমিটিতে ইউসুফ সালাউদ্দিন সহ সম্পাদক নির্বাচিত হন। স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে পূর্ববাংলার ছাত্র জনতা ছিল তখন খুবই সোচ্চার ও প্রতিবাদমুখর। স্বতঃস্ফূর্তভাবে যেকোন মিছিলে সর্বস্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দিত, এত বড় বড় মিছিল হতো যে কোথায় তার শুরু ও কোথায় শেষ তা দেখা যেত না। ৬ দফাভিত্তিক ১১ দফার সমর্থনে সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের আয়োজিত প্রতিটি কর্মসূচিতে ইউসুফ সালাউদ্দিন ছিলেন বেশ তৎপর। ঢাকা কলেজ ছাত্রাবাসের ৩২২ নম্বর কক্ষে থাকাকালে তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা ইকবাল সোবহান চৌধুরীর (পরবর্তীকালে বাংলাদেশ অবজারভারের সম্পাদক) হাত ধরে তিনি রাজনীতিতে এসেছিলেন। ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভতি হন। আহসান উল্লাহ হলের ২০৪ নম্বর কক্ষ বরাদ্দ পান। সেই কক্ষটি ছিল কেন্দ্রীয় নেতাদের আড্ডাস্থল। তোফায়েল আহমেদ, আবদুর রাজ্জাক, সিরাজুল আলম খান, আ স ম আবদুর রব, কাজী আরেফ আহমেদ, শেখ শহিদুল ইসলামসহ তৎকালীন কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের সকল রাজনৈতিক কর্মকান্ড তাঁর ২০৪ নম্বর কক্ষকে ঘিরে আবর্তিত হতো। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় অফিস বলাকা ভবনের চার তলায় হলেও ইকবাল হল আর আহসান উল্লাহ হলেই মূলত সমস্ত আন্দোলন সংগ্রামের কর্মসূচি প্রণীত হতো।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ ছিল একটি নিয়মতান্ত্রিক ছাত্র সংগঠন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রেক্ষাপটে ছাত্রলীগ অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে ১১দফা আন্দোলনের মাধ্যমে ৬৯’এর গণঅভ্যুত্থানের সূচনা করে। এ নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের আড়ালে ছাত্রলীগের একটি হার্ডকোর গ্রুপ সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। মার্শাল মনি, হাসানুল হক ইনু, আ.ফ.ম. মাহবুবুল হক, শরীফ নুরুল আম্বিয়া, চিশতী শাহ হেলালুর রহমান, শিবনারায়ণ দাস, ইউসুফ সালাউদ্দিন এবং আরো অনেকে এ গ্রুপে সক্রিয় ছিলেন। প্রয়াত কাজী আরেফ আহমেদ ছিলেন সেকেন্ড -ইন- কমান্ড। ইয়াহিয়ার মার্শাল ‘ল’ নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন বন্ধ করলেও ছাত্রলীগের এ হার্ডকোর গ্রুপের প্রস্তুতি থাকে অব্যাহত।
ওদিকে ঢাকা সেনানিবাসের ১৪ পদাতিক বাহিনীর সদর দফতরে স্থাপিত ট্রাইবুনালে তথন বিচার চলছিল তথাকথিত ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার’ আসামিদের। ‘৬৯ এর চলমান ছাত্র-জনতার প্রবল আন্দোলনের মুখে পাকিস্তানি সামরিক চক্র যখন বুঝতে পারল এই মিথ্যা প্রহসনের মামলা আর চালিয়ে যেতে পারবে না, তখনই তারা সামরিক ব্যারাকে বন্দি সার্জেন্ট জহুরুল হককে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে। অজুহাত-তিনি পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। সেদিন ছিল ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের ১৫ ফেব্রুয়ারি। ইউসুফ সালাউদ্দিনসহ যারা সেদিন রাজপথে আন্দোলন করছিলেন এবং বুকের মাঝে এক স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন লালন করেছিলেন, তাদের কাছে সার্জেন্ট জহুরুল হকের হত্যাকান্ড ছিল সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের দামামা।
সার্জেন্ট জহুরুল হকের নির্মম হত্যাকান্ডের দিন স্মরণে তারা গঠন করেন ‘১৫ ফেব্রুয়ারি বাহিনী’ । মুক্তিযুদ্ধের লক্ষে পরিকল্পিত প্রথম সশস্ত্র বাহিনী।
‘৭০-এর জানুয়ারি থেকে আসন্ন নির্বাচন উপলক্ষে রাজনৈতিক কার্যকলাপ শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন ঐতিহাসিক ৬ দফা দিবস ৭ জুন। ঐ দিন রেসকোর্স ময়দানে প্রথম নির্বাচনী সভার প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ঐ দিন পল্টন ময়দানে (রেসকোর্স সভার আগে) কুচকাওয়াজের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর হাত থেকে বাহিনী পতাকা (রেজিমেন্টাল কালার) গ্রহণ করে ‘১৫ ফেব্রæয়ারি বাহিনী’ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করবে।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শুরু হয়ে গেল প্রস্তুতি। ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কাঠামোয় লালিত বিপুল সংখ্যক হার্ডকোর সদস্য তৈরি করা হলো ৭ জুন ইকবাল হল (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) থেকে মিছিল করে পল্টন ময়দানে যাওয়ার জন্য। এবার যে প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ালো তা হলো কেমন হবে বাহিনী-পতাকা। এই বাহিনীর সঙ্গে নেতৃস্থানীয় যারা জড়িত ছিলেন তাদের মধ্যে আ স ম আবদুর রব, কাজী আরেফ আহমেদ, শেখ শহিদুল ইসলাম, মনিরুল ইসলাম (মার্শাল মনি), হাসানুল হক ইনু, শরীফ নুরুল আম্বিয়া, চিশতি শাহ হেলালুর রহমান, মোয়াজ্জেম হোসেন খান মজলিশ, শিবনারায়ণ দাস, আবদুল্লাহ সানি, মইনুল ইসলাম চৌধুরী, গোলম ফারুক, ফিরোজ শাহ উল্লেখযোগ্য।
পতাকা তৈরি নিয়ে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের ১১৬ নং কক্ষে মিটিংয়ে বসেন । এ কক্ষটি বরাদ্দ ছিল তৎকালীন ছাত্রনেতা আ স ম আবদুর রবের নামে। কাজী আরেফ আহমেদের প্রস্তাব অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হলো পতাকার সবুজ জমিনের ওপর থাকবে একটি লাল বৃত্ত, আর লাল বৃত্তের মাঝে থাকবে পূর্ব পাকিস্তানের মানচিত্র। সবুজ জমিন বাংলার চির সবুজের প্রতীক, লাল সূর্য রক্তে রাঙা হয়ে উঠবে স্বাধীনতার সূর্য আর জন্ম নেবে একটি নতুন দেশ-সোনালি আঁশের রঙে হবে তার পরিচয়। লাল বৃত্তের মাঝখানে সোনালি রংয়ের মানচিত্র তারই প্রতীক।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সবাই কাজে নেমে পড়লেন। কামরুল আলম খান খসরু গেলেন তখন বলাকা সিনেমা হলের চারতলার এক বিহারি দরজির দোকানে এবং তাঁর কাছ থেকে বড় এক টুকরা সবুজ কাপড়ের মাঝে সেলাই করে আনলেন লাল বৃত্তাকার সূর্যের প্রতীক। এবার আরেক সমস্যা দেখা দিল পূর্ব পাকিস্তানের মানচিত্র নিয়ে। তারা সিদ্ধান্ত নিলেন ওটা লাল বৃত্তের মাঝে রঙ দিয়ে আঁকা হবে। আঁকাআঁকিতে কুমিল্লার শিবনারায়ণ দাশের হাত ছিল পাকা। তিনি বললেন ‘আমি বাপু পেইন্ট করতে পারব, তবে মানচিত্র আঁকতে পারব না’। তাঁর একথার পর হাসানুল হক ইনু (পরবর্তীকালে জাসদের সভাপতি, মন্ত্রী এবং এমপি) এবং ইউসুফ সালাউদ্দিন ঠিক করলেন পূর্ব পাকিস্তানের মানচিত্র ট্রেসিং পেপারে ট্রেস করে নিয়ে আসবেন। তারা গেলেন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন জিন্নাহ হলে (বর্তমান তিতুমীর হল)। উল্লেখ্য, ইউসুফ সালাউদ্দিন এবং হাসানুল হক ইনু উভয়েই তখন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। জিন্নাহ হলে ৪০৮ নং কক্ষে থাকেন হাসানুল হক ইনুর কাজিন এনামুল হক। তার কাছ থেকে তারা অ্যাটলাস নেন। দু’জনে মিলে ট্রেসিং পেপারে পূর্ব পাকিস্তানের মানচিত্র এঁকে নিয়ে গেলেন ইকবাল হলের ১১৬ নং কক্ষে। বাকি সবাই সেখানে অপেক্ষা করছিলেন। শিবনারায়ণ দাশ তাঁর নিপুণ হাতে ট্রেসিং পেপার থেকে পূর্ব পাকিস্তানের মানচিত্র আঁকলেন লাল বৃত্তের মাঝে। তাতে দিলেন সোনালি রঙ। তৈরি হয়ে গেল ১৫ ফেব্রুয়ারি বাহিনীর পতাকা।
পরদিন তারা আ স ম আবদুর রব ও শেখ শহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে সুশৃংখল মিছিল নিয়ে ইকবাল থেকে গেলেন পল্টন ময়দানে। সেখানে মঞ্চে দাঁড়ানো বঙ্গবন্ধু ১৫ ফেব্রুয়ারি বাহিনীর অভিবাদন গ্রহণ করলেন এবং বাহিনীর পক্ষে আ স ম আবদুর রব ইকবাল হলের ১১৬ নং কক্ষে তৈরি পতাকা বঙ্গবন্ধুর হাত থেকে গ্রহণ করলেন আনুষ্ঠানিকভাবে। এই সেই পতাকা যা উড়ল বাংলার ঘরে ঘরে স্বাধীন বাংলার পতাকা হয়ে। এই পতাকাটিই ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ২ মার্চ ছাত্রনেতা শাহজাহান সিরাজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলাভবনে বিশাল ছাত্র জমায়েতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা হিসেবে ঘোষণা দেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলন করেন আ স ম আবদুর রব।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ পতাকা থেকে বাংলাদেশের মানচিত্রটি বাদ দিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
বঙ্গবন্ধুকে আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বাঁচাতে ইঞ্জিনিয়ার ইউসুফ সালাউদ্দিন ও ইঞ্জিনিয়ার হাসানুল হক ইনু তাঁদের জীবনের উপর প্রচন্ড ঝুঁকি নিয়েছিলেন। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের ২২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত এক রুদ্ধধার বৈঠকে আ স ম আবদুর রব বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে কে কে জীবন উৎসর্গ করতে আগ্রহী জানতে চাইলে ইউসুফ সালাউদ্দিন ও হাসানুল হক ইনু দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর জন্যে তারা যেকোন ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। সেদিন বৈঠকে সিদ্ধান্ত হল, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান বিচারপতি এস এ রহমানের গাড়িতে বোমা হামলা চালিয়ে তাঁকে মেরে ফেলতে হবে। বিচারপতি এস এ রহমান বাংলা একাডেমির পেছনে সরকারি রেস্ট হাউসে থাকতেন। ঢাকা সেনানিবাসের সদর দপ্তরে স্থাপিত ট্রাইব্যুনালে তখন বিচার চলছিল। হাসানুল হক ইনু আর ইউসুফ সালাউদ্দিন দুজনেই প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ফলে তারা মলোটভ ককটেল তৈরি করতে জানতেন। যথারীতি দুটো মলোটভ ককটেল তৈরি করে ইউসুফ সালাউদ্দিন আর হাসানুল হক ইনু তা কোমরে বেঁধে ২২ ফেব্রুয়ারির সকাল থেকে ঢাকার কাওরান বাজার এলাকায় ওঁৎ পেতে অপেক্ষা করছিলেন বিচারপতি এস এ রহমানের গাড়ির জন্যে। সেখানে তারা সকাল থেকে অপেক্ষা করছিলেন।
জীবনকে তুচ্ছ করে নিশ্চিত মৃত্যুর ঝুঁকি মাথায় নিয়ে পাকসেনাদের পাহারাধীনে থাকা বিচারপতির গাড়ি বহরে ককটেল ছোঁড়ার জন্যে প্রকাশ্য রাজপথে দাঁড়িয়ে থাকার কথা মনে হলে এখনও শিউরে ওঠেন ইউসুফ সালাউদ্দিন। প্রায় ২/৩ ঘণ্টা অপেক্ষা করার পর তারা জানতে পারলেন, বিচারপতি রহমানের গাড়ি কোর্টে আসে নি। সেদিন ঢাকায় সংগ্রামী জনতা তাদের নিশ্চিত জীবন ঝুঁকি থেকে বাঁচান। ওইদিন সকালে বিক্ষুদ্ধ ছাত্র জনতা বিচারপতি এস এ রহমানের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিলে তিনি বাবুর্চির বেশে পালিয়ে যান। অতঃপর ৬৯-এর আন্দোলন গণঅভ্যূত্থানে রূপ নেয়। সামরিক সরকার বঙ্গবন্ধুকে আন্দোলনের চাপের মুখে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। ১৯৬৯ এর ২২ ফেব্রুয়ারি কারামুক্ত শেখ মুজিবুর রহমানকে তোফায়েল আহমদ ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
এর মধ্যে ৭০ এর নির্বাচন এসে যায়। আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন, ক্ষমতা হস্তান্তরে পশ্চিমাদের টালবাহানা অনিবার্য হয়ে ওঠে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। পশ্চিমাদের সাথে তাঁরা যুদ্ধ যে অনিবার্য তা আগে থেকে জানতেন। তাঁরা ডামি বন্দুক দিয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়া শুরু করেন। ২৫মার্চ রাতে ইউসুফ সালাউদ্দিনের চোখের সামনে পলাশী মোড়ে ফায়ায় ব্রিগেডের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গুলি করে মেরে ফেলে পাকবাহিনী। অবস্থা বেগতিক দেখে ছাত্রনেতারা ঢাকার জিঞ্জিরায় একত্রিত হন। সবাই করণীয় ঠিক করলেন, স্ব স্ব এলাকায় গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আমজনতাকে সংগঠিত করবেন। ইউসুফ সালাউদ্দিন ২৭ মার্চ সীতাকুন্ডের উদ্দেশ্য ঢাকা ত্যাগ করেন। পায়ে হেঁটে নদীপথে অনেক কষ্ট স্বীকার করে মার্চের ৩১ তারিখে নিজ এলাকা সীতাকুন্ডে পৌঁছেন।
একাত্তরের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে বিকেলে বাড়ি থেকে বের হয়ে দেখেন সীতাকুন্ডের আকাশে বোমারু বিমান চক্কর দিচ্ছে। কোন কিছু বুঝে ওঠার আগেই সীতাকুন্ড বাজারে (মহন্তের হাট) বিমান থেকে বোমা হামলা চালাতে থাকে। এতে বাজারে বহু লোক হতাহত হয়। অবশ্য বেশির ভাগ বোমা বাজার সংলগ্ন পুকুরে নিক্ষেপিত হওয়ায় হতাহতের ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম হয়েছে। তারপরও শতাধিক এর মতো লোক সেদিন মারা যান। সর্বত্র আতঙ্ক, টানটান উত্তেজনা। শিল্পাঞ্চল হওয়ায় সীতাকুন্ডের মানুষ রাজনীতিসচেতন বিধায় এ ধরনের একটি পরিস্থিতির জন্যে তাদের মানসিক প্রস্তুতি ছিল। কঠিন সতর্কতার মাধ্যমে আত্মরক্ষামূলকভাবে সময় অতিবাহিত হচ্ছে তখন। এপ্রিলের শেষে ইউসুফ সালাউদ্দিন বেঙ্গল রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন মতিনের গ্রæপে যোগ দেন ও ট্রেনিংয়ের জন্যে ভারতে চলে যান। সেখানকার দেরাদুন গেরিলা ট্রেনিং ক্যাম্পে দেড় মাসের মতো প্রশিক্ষণ নিয়ে জুনমাসে দেশে ফিরে এসে বাঁশবাড়িয়া পাহাড়ে প্রথম ঘাঁটি স্থাপন করেন। সীতাকুন্ডের বহু বাড়ি মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে বাঁশবাড়িয়ার শিকদার বাড়ি, বাড়বকুন্ডের রহমত উল্লাহ চেয়ারম্যানের বাড়ি, কুমিরা ঘাট ঘরের শামসুদের বাড়ি, হাতিলোটার আবু বকর ছিদ্দিকীর বাড়ি, কুমিরার হারুণের বাড়ি, মুরাদপুরের কালু চেয়ারম্যানের বাড়ি, গোপ্তাখালী কালাম চেয়ারম্যানের বাড়ি (আবজার বাড়ি), বসরতনগর নুরুল ইসলাম ভূঁইয়ার বাড়ি, মহানগরের আমিনুল হক ভ্ূঁইয়া বাড়ি, বারৈপাড়া চৌধুরী বাড়ি, বগাচতরের দর্জি বাড়িসহ আরো কিছু বাড়ি মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ আস্তানা ছিল।
সীতাকুন্ডে বেশ কটি মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপ বিভিন্ন জনের নেতত্বে বেশ তৎপর ছিল। বিশেষ করে নায়েক শফি, আবুল কালাম আজাদ, আবু তাহের বি এসসি, এস এম খুরশিদ, নুর আহমেদ, মফিজুর রহমান, ইউসুফ আলী, আবদুল মতিন, সিরাজদৌল্লা, আলী আকবর ভূঁইয়া, রেহান উদ্দিন, নুরুল হুদা, শহিদউল্লাহ, মোবাক্কর হোসেন প্রমুখের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে পাকসেনাদের বিরুদ্ধে চোরাগোপ্তা হামলা, ব্রিজ উড়িয়ে দেয়া, রাজাকার-আলবদরদের বিরুদ্ধে অভিযানে সাহসী ভূমিকা রাখেন। অক্টোববের শেষদিকে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ইউসুফ সালাউদ্দিনকে সীতাকুন্ড, সন্দ্বীপ ও মীরসরাই এই তিন থানার কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেন। তিনি কমান্ডারের দায়িত্বে থাকলেও যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ নানা সীমাবদ্ধতার কারণে মুক্তিযোদ্ধা গ্রæপ লিডারদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হতো না। গ্রæপ লিডাররা বাস্তবতার নিরিখে পরিকল্পনামাফিক কার্যক্রম চালাতেন। সারাদেশের মতো সীতাকুন্ডের স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার আলবদরদের তৎপরতা ছিল। রাজাকারবিরোধী অভিযানও এখানে অনেক হয়েছে। বাড়বকুন্ডের তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান সীতাকুন্ড থানা রাজাকার কমান্ডার মফিজুর রহমান ভূঁইয়াকে হত্যা করা হয়।
অন্যদিকে ছাত্রনেতাদের মধ্যে যারা বিএলএফ হিসেবে পরিচিত মরহুম এডভোকেট সালাউদ্দিন হারুণ, আবুল কাশেম ভূঁইয়া, কাজী দিদারুল আলম, কাজী দেলোয়ারুল আলম, মনিরুল ইসলাম বাবুল, আলোকজান্ডের চৌধুরী, আফতাব উদ্দিন হিরু, ইমাম হোসেন, নুরুল আলম, মাহমুদসহ আরো অনেকে সীতাকুন্ডের মুক্তিযুদ্ধে নানাভাবে অবদান রেখেছেন।
সত্যি কথা বলতে কী, সীতাকুন্ডে পাকসেনাদের সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখযুদ্ধ খুব একটা হয় নি। তবে বিভিন্ন ব্রিজ, কালভার্ট ভেঙ্গে দিয়ে চোরাগোপ্তা আক্রমণ করে পাকবাহিনীকে নাস্তানাবুদ করার ঘটনা ঘটেছে। আগস্টের মাঝামাঝিতে অবশ্য ইউসুফ সালাউদ্দিন নিজেই কুমিরা রেলওয়ে ব্রিজ ধ্বংস করার অপারেশনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এতে তাঁর সাথে স্থানীয়দের মধ্যে অংশ নেন কামাল উদ্দিন, মাহমুদ, হিরু, খালেদ, আবুল কালাম, নাজিম, আনু মিয়া, গেদুসহ অন্যরা। এছাড়া অন্য গ্রুপ লিড়ারদের নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধারা মগপুকুর এলাকার রেলওয়ে ব্রিজটি ধ্বংস করে দেয়।
সীতাকুন্ডের সর্বশেষ যুদ্ধ হয় কুমিরায়। এতে বহু ভারতীয় সেনা নিহত হন। এই যুদ্ধে জাফর ইমাম গ্রুপ, ভারতীয় ও মুক্তিসেনারা অংশ নেন। যৌথ আক্রমণের মুখে পাকবাহিনী পিছু হটে গেলে সীতাকুন্ড হানাদারমুক্ত হয়।
আসলে মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনযুদ্ধ। অত্যাধুনিক অস্ত্রধারী পাকসেনাদের সাথে বলতে গেলে নিরস্ত্র বাঙালির অসম যুদ্ধ। বিজয়ের পেছনে মুক্তিযোদ্ধাদের একক কৃতিত্ব ছিল না। রাজাকার-আলবদর ছাড়া সর্বস্তরের মানুষ মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে র্দীঘমেয়াদী পরিকল্পনা ছিল। এতো তাড়াতাড়ি দেশ হানাদারমুক্ত হবে তা কেউ কল্পনা করেনি। যার কারণে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও অনেকে ভারতের বিভিন্ন গেরিলা ক্যাম্প থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে আসে।
দেশমাতৃকাকে শত্রুমুক্ত করে ইউসুফ সালাউদ্দিন আবার ঢাকার প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে লেখাপড়ায় মনোযোগী হন। ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। মুক্তিযুদ্ধ শেষ করে জীবনযুদ্ধে সম্পৃক্ত হন।
তবে একথা ঠিক যে, শোষণমুক্ত সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর ডাকে দেশকে পরাশক্তির হাত থেকে মুক্ত করতে সর্বোচ্চ অবদান রাখার চেষ্টা চালাতে কখনো কুণ্ঠিত হননি তিনি।

লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক