দেখার কেউ নেই!

0
দেখার কেউ নেই!

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার। এ সৈকতকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে কক্সবাজার পর্যটন কেন্দ্র। এটি দেশের প্রধান পর্যটন নগরী। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বছরে কোটি পর্যটকের সমাগম হয় বিশ্বের দীর্ঘতম এই সমুদ্র সৈকতে। পর্যটক ছাড়াও দেশি-বিদেশি শতাধিক আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার এক হাজারের বেশি কর্মকর্তা অস্থায়ীভাবে বাস করেন এই শহরে। এ নগরীকে কেন্দ্র করে সড়ক, রেল ও আকাশ পথে ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন হলেও কক্সবাজারের মূল আকর্ষণ সমুদ্র সৈকতকে রক্ষায় কোন উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি এ যাবৎ। একদিকে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত পর্যটক, ট্যুর অপারেটর, পর্যটক ও হোটেল-মোটেল ব্যবসায়ীদের দায়িত্বহীন আচরণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় প্রশাসনের অক্ষমতার কারণে প্রতিনিয়ত পর্যটন এলাকাটি মারাত্মক হুমকির মুখে রয়েছে। এরসাথে ক্ষমতাসীনদের প্রভাব প্রতিপত্তিতে পরিবেশ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞাকে উপেক্ষা করে সৈকতের বালিয়াড়িতে গড়ে উঠছে শত শত অবৈধ দোকান। সম্প্রতি ক্ষমতার পালাবদলের পর পর আবারো পুরনো ট্র্যডিশনে নতুন করে দখলে নামছে প্রভাবশালী মহল। এতে নতুন করে হুমকির মূখে পড়তে যাচ্ছে সৈকতটি। আমরা মনে করি, এসব দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে দ্রæত পদক্ষেপ নিতে না পারলে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত ও শহর বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। গতকাল সোমবার দৈনিক পূর্বদেশে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনের উল্লেখ করা হয়, নগরীর কলাতলী ও সুগন্ধা পয়েন্টের বিস্তৃর্ণ বালিয়াড়ি দলখ করে অবৈধভাবে শতাধিক দোকান নির্মাণ করেছে একটি মহল। অভিযোগ রায়েছে সদ্য বিদায়ী জেলা প্রশাসকের অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে একটি মহলকে বালিয়াড়িতে তিনশত দোকান নির্মাণের কার্ড প্রদান করেন। এতে উচ্ছ্বসিত মহলটি রাতের অন্ধকারে একসাথে একই ডিজাইন ও রঙ লাগিয়ে ভাসমান তৈরি দোকানগুলো স্থাপন করেছে বালিয়াড়িতে। এ ঘটনায় কক্সবাজারে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। সংক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীরা। পর্যটকরাও বিরক্ত প্রকাম করছে বলে জানা যায়। মাত্র একবছর আগে দুর্নীতিবাজ ও অগণতান্ত্রিক একটি সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ফ্যাসিস্ট সরকারকে বিদায় করেন। গঠন করা হয়, নোবেল বিজয়ী ড. মুহম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তবর্তী সরকার। আশা করা হয়েছিল, রাজসৈতিক দুর্বিত্যায়ন বন্ধ হবে, দূষণ-দখর থেকে পর্যটন খাতসহ নদী, খাল, বিল ও জলাশয় রক্ষা পাবে। কিন্তু একবছর পওে দেখা যায়, ‘যে লাউ সেই কদু’। কক্সবাজারের এ ঘটনা তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ হতে পারে। এছাড়া কক্সবাজার শহর, সমুদ্র সৈকত ও আশপাশের এলাকায় অপরিচ্ছন্নতার ছাপ দেখা গেছে। সুয়ারেজ সিস্টেম না থাকায় হোটেল-মোটেল থেকে তরল বর্জ্য ড্রেন দিয়ে পড়ছে বাঁকখালী নদীতে। সমুদ্র সৈকতের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পয়েন্ট লাবণী, সুগন্ধা, কলাতলী ও আশপাশের বার্মিজ স্কুলের সামনের সড়ক, টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনের সড়ক, জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সামনে রয়েছে ময়লার বিশাল ডাম্পিং।
স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রতিবছর কক্সবাজারে এক কোটিও বেশি পর্যটক আসেন। এর মধ্যে পর্যটন মৌসুমেই আসেন প্রায় অর্ধকোটি। মূলত পর্যটন মৌসুমে (ডিসেম্বর-জানুয়ারি) ও ছুটির দিনগুলোতে এখানে ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত পর্যটকের সমাগম ঘটে। এদের থাকা-খাওয়ার জন্য রয়েছে প্রায় সাড়ে চারশ হোটেল, মোটেল ও রেস্টুরেন্ট। এখান থেকে প্রতিদিন শত শত টন বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। যার বেশিরভাগই শেষ পর্যন্ত সাগরে গিয়ে পড়ছে।
এ প্রসঙ্গে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনে প্রকৃতির অমূল্য সম্পদ রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। কিন্তু অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এই পর্যটন শহরে সব কিছুই হুমকির মুখে রয়েছে। যেন ইসিএ এলাকা নির্ধারিত সমুদ্র সৈকতের ৩০০ মিটারের মধ্যে নির্মিত এবং নির্মাণাধীন বহুতল ভবনগুলো ভেঙে দেওয়ার মধ্য দিয়ে সমুদ্র সৈকত রক্ষায় দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় বাস্তবায়ন শুরু হয়, এটাই প্রশাসনের প্রতি পরিবেশ কর্মীদের দাবি। গ্রিন কক্সবাজারের প্রতিষ্ঠাতা মনে করেন, পৃথিবীর বহু সভ্যতা বিলীন হয়ে গেছে দূষণের ফলে। যেভাবে চলছে তাতে একদিন এই কক্সবাজারকেও পরিত্যক্ত ঘোষণা করতে হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি টেকনিক্যাল বিষয়। এখানকার প্রশাসনের সেই সক্ষমতা নেই। পর্যটন বোর্ডকে এখানে এগিয়ে আসতে হবে। শিগগিরই এটার একটা বৈজ্ঞানিক সমাধান খুঁজে বের করতে হবে। পাশাপাশি হোটেল-মোটেলের ওপর চাপ কমিয়ে বিকল্প ‘কমিউনিটি ট্যুরিজম’ ধারণার বিকাশ ঘটাতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা একসময়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান কক্সবাজার সৈকতের দূষণ ও দখলের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তিনি এখন পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা। কিন্তু তিনি আগের মত কেন সোচ্চার নয়, এ নিয়ে তাঁর নিরবতা অনেককে ভাবিয়ে তুলেছে। অথচ তিনি ইচ্ছে করলে এ মুহূর্তে এ পর্যটন নগরীকে দূষণ ও দখল থেকে রক্ষা করতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারেন। আমরা আশা করি, সরকার কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত রক্ষায় একটি পরিকল্পিত উদ্যোগ নিবে।