
সনেট দেব
বাংলাদেশের শহুরে জীবন আজ নানা সমস্যায় জর্জরিত। তার মধ্যে অন্যতম বড় সংকট হলো ফুটপাত দখল। যে জায়গা মূলত পথচারীদের নিরাপদে চলার জন্য বরাদ্দ, সেটিই আজ হকার, অস্থায়ী দোকান, নির্মাণসামগ্রী কিংবা রাজনৈতিক শক্তির দখলে চলে যাচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষকে বাধ্য হয়ে মূল সড়কে নেমে গাড়ির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়। শুধু পথচারীদের জন্যই নয়, এখানে শিশুরা, বৃদ্ধ ও শারীরিকভাবে অসুস্থ মানুষদের জন্যও জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঝুঁকি যেমন বাড়ছে, তেমনি নাগরিক জীবনের মৌলিক অধিকারও খর্ব হচ্ছে। ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও সিলেটÑসব প্রধান শহরেই এই সমস্যা বিরাজমান, যা নগরের চলাচল ও সামাজিক স্বাচ্ছন্দ্যকে বিঘিœত করছে।
ঢাকা শহরের একটি জরিপ বলছে, রাজধানীর প্রায় ৭০ শতাংশ ফুটপাত দখল হয়ে আছে। তবে এ সমস্যা শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ নয়। চট্টগ্রাম শহরের কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী এলাকা থেকে শুরু করে নিউ মার্কেট, আন্দরকিল্লা, রিয়াজউদ্দিন বাজার, জুবিলি রোড কিংবা কোতোয়ালিÑপ্রায় সব জায়গায় ফুটপাত ব্যবসায়ী ও হকারদের অস্থায়ী দোকানে ভরে থাকে। বিশেষ করে রেলস্টেশন এলাকা একটি বড় উদাহরণ। এখানে যাত্রীদের চলাচলের জন্য বরাদ্দ জায়গা প্রায় প্রতিদিন দখল হয়ে থাকে, ফলে হাজারো মানুষকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গাড়ির রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হয়। এছাড়া শহরের ব্যস্ততম পথগুলোতে ফুটপাতে হাঁটতে গিয়ে শিশুরা প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হয়, যা নগরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অঙ্গনেই বড় প্রশ্ন তোলে।
২০১৯ সালে চট্টগ্রামের জুবিলি রোড এলাকায় এক কলেজছাত্রী ট্রাফিক জ্যামে আটকে থাকা বাসের পাশে দিয়ে হাঁটতে গিয়ে দুর্ঘটনায় নিহত হন। পরবর্তীতে জানা যায়, যে ফুটপাত দিয়ে তিনি নিরাপদে হাঁটতে পারতেন সেটি দখল হয়ে দোকান ও অস্থায়ী বসতিতে পরিণত হয়েছিল। এই ঘটনা শুধুমাত্র একটি পরিবারের জীবন বিপর্যস্ত করেনি, বরং পুরো সমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেÑআমরা কি নাগরিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যথেষ্ট দায়িত্বশীল? এই ধরনের দুর্ঘটনা শুধু পথচারীর জীবন নয়, শিক্ষাব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং সামাজিক সচেতনতাকেও সরাসরি প্রভাবিত করছে।
২০২৫ সালে আন্দরকিল্লা ও নিউ মার্কেট সংলগ্ন এলাকায় ফুটপাত দখলের কারণে কয়েকজন স্কুলছাত্রী ও কলেজছাত্র রাস্তায় নেমে হেঁটেছিলেন। হঠাৎ একটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ফলে দু’জন গুরুতর আহত হন। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, ফুটপাতের এই দখল কেবল পথচারীর নিরাপত্তা হ্রাস করছে না, বরং এতে এলাকায় যানজটও বাড়ছে। সেখানকার ব্যবসা, ক্রেতা প্রবাহ এবং স্থানীয় অর্থনীতিও এই পরিস্থিতির কারণে নেতিবাচক প্রভাব পাচ্ছে। প্রতিদিনকার এই সমস্যাগুলো চট্টগ্রামের নাগরিক জীবনে মানসিক চাপ এবং উদ্বেগের মাত্রা বৃদ্ধি করছে, যা শহরের সাধারণ চলাচল, ব্যবসা এবং সামাজিক কর্মকাÐকে ব্যাহত করছে।
চট্টগ্রাম রেলস্টেশনের মূল ফুটপাতটি দীর্ঘদিন ধরে হকার, অস্থায়ী দোকান এবং নির্মাণ সামগ্রীর দখলে আছে। সম্প্রতি এখানকার এক বৃদ্ধা পথচারী নিরাপদে হাঁটতে না পেরে রাস্তার দিকে নেমে যান এবং একটি ছোট ভ্যানের সাথে সংঘর্ষে গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, প্রতিদিনই এখানে অনুরূপ বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে যাত্রাবিরতি সময় হাজারো মানুষ বাধ্য হয়ে গাড়ি চলাচলের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। এই ঘটনা শুধু ব্যক্তির জীবন বিপর্যস্ত করেনি, বরং পুরো শহরের নাগরিক নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ফুটপাত দখল ও অনিয়মের কারণে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে, যা একটি সভ্য নগরের জন্য লজ্জাজনক।
ফুটপাত দখল শুধু মানুষের চলাচল বিঘিœত করছে না, বরং অর্থনীতিতেও ব্যাপক ক্ষতি করছে। বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, ঢাকার সড়ক দুর্ঘটনার অন্তত ২০ শতাংশের সঙ্গে ফুটপাত দখল প্রত্যক্ষভাবে সম্পর্কিত। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার কারণে বছরে এউচ-এর প্রায় ২ থেকে ৩ শতাংশ অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অর্থাৎ, পথচারীর অধিকার রক্ষায় ব্যর্থতা শুধু মানবিক দিকেই নয়, জাতীয় অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। চট্টগ্রাম ও অন্যান্য প্রধান শহরে এই ধরনের ঘটনা শহরের ব্যস্ত অর্থনৈতিক এলাকা ও ব্যবসায়িক স্থাপনাগুলোর আয়ের ধারা ব্যাহত করছে, যা শহরের সমৃদ্ধি ও নগরায়নের জন্য ক্ষতিকর।
শহরের অর্থনীতি ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমও ফুটপাত দখলের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পথচারীদের বাধাগ্রস্ত চলাচল দোকানপাট ও বাজারের সম্ভাব্য ক্রেতাদের কমিয়ে দিচ্ছে। চট্টগ্রাম ও ঢাকার মতো ব্যস্ত নগর এলাকায়, যেখানে রাস্তাঘাটের প্রতিটি সেন্টিমিটার গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে ফুটপাত দখল ব্যবসার প্রবাহকে মারাত্মকভাবে হ্রাস করছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য এটি আয়ের ক্ষতি এবং স্থিতিশীলতা হ্রাসের বড় কারণ। ফলে নগরের অর্থনৈতিক চাকা সরাসরি প্রভাবিত হচ্ছে, যা স্থানীয় ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বিষয়টি ভিন্ন। সিঙ্গাপুর, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া বা ইউরোপের শহরগুলোতে ফুটপাত শুধু পথচারীর নিরাপদ চলাচল নয়, বরং সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকান্ডের অংশ। সেখানকার পরিকল্পিত নগরব্যবস্থাপনা ফুটপাতকে সবার জন্য উন্মুক্ত ও প্রাণবন্ত রাখে। মানুষ সেখানে শুধু চলাচল করে না, স্ট্রিট পারফরম্যান্স, সৃজনশীল প্রদর্শনী ও ছোট ব্যবসা-উদ্যোগের জন্যও ফুটপাত ব্যবহার করে। অথচ আমাদের প্রধান শহরগুলোতে ফুটপাত পরিণত হয়েছে দখলদারিত্বের প্রতীকে। এটি নগরের সৌন্দর্য, সামাজিক ভারসাম্য ও নাগরিক জীবনের মৌলিক অধিকারকে চ্যালেঞ্জ করছে।
অবশ্য হকারদের জীবিকার বিষয়টিও উপেক্ষা করা যায় না। চট্টগ্রামের নিউ মার্কেট ও রিয়াজউদ্দিন বাজার এলাকার ফুটপাতগুলোতে হাজারো হকার তাদের সংসার চালান। তারা এই অস্থায়ী দোকানগুলোতে তাদের পরিবারবর্গের জন্য জীবিকা নির্বাহ করে। তাদের জীবিকা নিশ্চিতে বিকল্প ব্যবস্থা না নিলে সমস্যা থেকে যায়। একদিকে হকারদের উচ্ছেদ করলে মানবিক সঙ্কট তৈরি হয়, অন্যদিকে দখল চলতে থাকলে শহরের মানুষ প্রতিদিন দুর্ভোগে পড়ে। এই দ্ব›দ্ব সমাধানে দরকার সুষ্ঠু পরিকল্পনা, যেমনÑনির্দিষ্ট হকার জোন তৈরি করা, ভ্রাম্যমাণ বাজার ব্যবস্থা চালু করা কিংবা নির্দিষ্ট সময়সীমায় ব্যবসার অনুমতি দেওয়া। এটি নাগরিক ও ব্যবসায়ী উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করতে পারে।
ফুটপাতের সমস্যা শুধুই চলাচলের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি নগর পরিবেশ ও সামাজিক সম্পর্ককেও প্রভাবিত করছে। রাস্তার পাশে দীর্ঘ সময় ধরে দখল থাকা দোকান, হকার ও নির্মাণ সামগ্রী শহরের দৃশ্যমান অগোছাল পরিচ্ছন্নতাকে নষ্ট করছে। পথচারীর নিরাপত্তাহীনতার কারণে শহরের মানুষ মানসিক চাপ ও উদ্বেগের মধ্যে বাস করছে। একই সাথে শিশুদের খেলার স্থান, বৃদ্ধদের নিরাপদ চলাচলের স্থানও সংকুচিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি শুধু দৈনন্দিন জীবনকে অস্বস্তিকর করছে না, বরং নাগরিক জীবনের মান ও শহরের সমন্বিত কার্যকারিতাকেও ব্যাহত করছে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (ঈউঅ) ও সিটি কর্পোরেশনেরও দায়িত্ব আছে। তারা যদি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে নাগরিকবান্ধব শহর গড়তে চান, তবে ফুটপাতের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু মাঝে মাঝে উচ্ছেদ অভিযান চালালে কিছুদিনের জন্য সমাধান মিলবে, কিন্তু টেকসই হবে না। প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়া ভেঙে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা না হলে দখল প্রতিনিয়ত নতুনভাবে ফিরে আসবে। পরিকল্পিত নগরায়ন ছাড়া নগরবাসীর নিরাপত্তা ও শহরের সৌন্দর্য স্থায়ীভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
ফুটপাত দখলের সমস্যা নগরের সৌন্দর্যও নষ্ট করছে। উন্নত বিশ্বের মতো আমাদের শহরগুলোতেও ফুটপাত হতে পারত মানুষের অবসর সময় কাটানোর জায়গা, সাংস্কৃতিক প্রকাশের ক্ষেত্র কিংবা সৃজনশীল নাগরিক জীবনের প্রতীক। অথচ এখন ফুটপাত পরিণত হয়েছে বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম ও দখলদারিত্বের চিত্রপটে। এটি শুধুমাত্র নগরপরিকল্পনার ব্যর্থতা নয়, বরং সমাজের সচেতনতা ও নাগরিক দায়িত্বের অভাবকেও প্রতিফলিত করছে।
ফুটপাত দখল শুধু অবকাঠামোগত সমস্যা নয়, বরং নাগরিক অধিকার ও মানবিকতার প্রশ্ন। একদিকে পথচারীর জীবন ঝুঁকির মুখে, অন্যদিকে শহরের শৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। চট্টগ্রামসহ সব বড় শহরের ফুটপাত যদি নাগরিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া যায়, তবে দুর্ঘটনা কমবে, অর্থনৈতিক ক্ষতি হ্রাস পাবে এবং শহরের সৌন্দর্য বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। একটি সভ্য নগরের চেহারা ফুটপাতের ব্যবহারের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়। তাই এখনই সময়, নাগরিক, প্রশাসন ও সমাজ মিলিত হয়ে ফুটপাত মুক্ত ও নিরাপদ করার উদ্যোগ নেওয়ার।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট



