পূর্বদেশ ডেস্ক
ফিলিস্তিনকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়াও। কানাডা প্রথম জি-৭ দেশ হিসাবে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দেয়। এরপরই ঘোষণা আসে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষ থেকে। আর এর কয়েক মিনিট পরই যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেন।
ইসরায়েলি গণহত্যা ও গাজায় নির্মম অভিযানের মধ্যে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেবে বলে আগেই জানিয়েছিল যুক্তরাজ্য।
গতকাল রোববার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এক ভিডিও বার্তায় আনুষ্ঠানিকভাবে সেই ঘোষণা দিয়েছেন। খবর বিডি ও বাংলা ট্রিবিউনের।
এতে তিনি বলেন, আজ শান্তি ও দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের আশা পুনরুজ্জীবীত করতে আমি মহান এই দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে পরিষ্কারভাবে বলছি যে, যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দিচ্ছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা ভিডিওতে স্টারমার বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা ভয়াবহতার মধ্যে আমরা শান্তি ও দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাবনাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কাজ করছি। এর মানে হচ্ছে, নিরাপদ একটি ইসরায়েল রাষ্ট্রের পাশাপাশি একটি কার্যকর ফিলিস্তির রাষ্ট্র থাকা- এ মুহূর্তে এর কোনওটিই নেই।
ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার সময় এখন এসে গেছে। ফিলিস্তিন এবং ইসরায়েলের মানুষ যাতে একটি ভাল ভবিষ্যত পায় সেই প্রতিশ্রুতি দিতেই যুক্তরাজ্যের এই পদক্ষেপ বলে বর্ণনা করেন স্টারমার। ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী গোষ্ঠী হামাসের জন্য এটি কোনও পুরস্কার নয়, বলেন তিনি।
এর আগে কানাডা থেকে আসা প্রথম ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। এক্সে পোস্ট করা এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, কানাডা আজ থেকে ফিলিস্তিনকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দিচ্ছে। একইসঙ্গে ফিলিস্তিন এবং ইসরায়েলের জন্য একটি শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যৎ গঠনে অংশীদারিত্বের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।
কানাডার পরপরই অস্ট্রেলিয়া থেকে ঘোষণা আসে। এক বিবৃতিতে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যন্থনি আলবানিজ লেখেন, কানাডার সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে অস্ট্রেলিয়া ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দিচ্ছে।
তিনি বলেন, কানাডা ও যুক্তরাজ্যের যৌথ প্রচেষ্টার অংশ হিসাবেই অস্ট্রেলিয়া এই পদক্ষেপ নিয়েছে এবং এর মধ্য দিয়ে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন দ্বিরাষ্ট্র সমাধানে একটি আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা গড়ে উঠবে।
ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়ে হত্যাকারীদের (হামাস) পুরস্কৃত করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ইসরায়েলি নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন গাভির। এই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়ায় নিজের পরবর্তী কর্মপরিকল্পনারও আভাস দিয়েছেন তিনি। বেন গাভির বলেছেন, পরবর্তী ক্যাবিনেট মিটিংয়ে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি সার্বভৌমত্ব প্রয়োগের প্রস্তাব তুলবেন তিনি। সেখানে সীমিত শাসনাধিকার ভোগ করা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে (প্যালেস্টিনিয়ান অথোরিটি) বাতিল করা উচিত বলেও দাবি জানান তিনি।
স্বীকৃতির ঘোষণায় নিজেদের আপত্তি প্রকাশ করেছে ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে মন্ত্রণালয়ের অ্যাকাউন্টে বলা হয়, ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে কেবল হামাসকে পুরস্কৃত করা হলো। এর পেছনে রয়েছে ব্রিটেনে তাদের সমর্থক গোষ্ঠী মুসলিম ব্রাদারহুডের উৎসাহ।
ওই পোস্টে অভিযোগ করা হয়, হামাস নেতারা এই স্বীকৃতিকে ৭ অক্টোবরের হত্যাযজ্ঞের ফসল বলে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছে।
তবে এই বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। তিনি বলেন, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের সম্ভাবনা পুনর্জীবিত করতে, মহান ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আজ আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতির ঘোষণা দিচ্ছি।
এর মাধ্যমে হামাসকে মোটেও পুরস্কৃত করা হয়নি বলে জোর দিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা শাসন ব্যবস্থায় হামাসের কোনও স্থান নেই। এই স্বীকৃতি মোটেও হামাসকে পুরস্কৃত করে না।
তিনি আরও বলেন, আমাদের আন্তরিক চাওয়া হচ্ছে দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের মাধ্যমে সংকট মোকাবিলা করা। এটি হামাসের বিদ্বেষপূর্ণ দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত।
স্বীকৃতির ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে ফিলিস্তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বারসেন আঘাবেকিয়ান শাহিন বলেছেন, এই স্বীকৃতির মাধ্যমে আমরা সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার দিকে আরেক ধাপ অগ্রসর হলাম। অবশ্য বিষয়টা এমন না যে, আগামীকালই যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। তবে এটা সামনে আগানোর জন্য আমাদের এমন একটা ধাপ তৈরি করে দিলো, যার ওপর আমরা আরও বড় কিছু তৈরি করতে পারি।
ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্রের স্বীকৃতি বলতে কী বোঝায়? : ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হোক বা না হোক এর অস্তিত্ব আছে। আন্তর্জাতিকভাবে ফিলিস্তিনের অনেক বড় স্বীকৃতি আছে। বিদেশে এর ক‚টনৈতিক মিশন আছে এমনটি ক্রীড়াদলও আছে যারা অলিম্পিকসহ বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। কিন্তু ইসরায়েলের সঙ্গে ফিলিস্তিনের দীর্ঘদিনব্যাপী সংঘাতের কারণে ফিলিস্তিনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনও সীমানা নেই। কোনও রাজধানী নেই এবং কোনও সেনাবাহিনী নেই।
পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের দখলদারিত্বের কারণে ১৯৯০ এর দশকে শান্তিচুক্তির মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ গঠিত হলেও ওই এলাকার জনগণের ওপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই।
ওদিকে, গাজাতেও ইসরায়েল দখলদার বাহিনী। গাজা এখন এক বিপর্যয়কর যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এক ধরনের আধা স্বাধীন রাষ্ট্রের মর্যাদা নিয়ে থাকা ফিলিস্তিনকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়াটা অনিবার্যভাবেই অনেকটা প্রতীকী। রাজনৈতিক এবং নৈতিক দিক থেকে এটি শক্তিশালী বার্তা হলেও মাঠ পর্যায়ে পরিস্থিতির পরিবর্তন খুব বেশি ঘটবে না। তারপরও এই প্রতীকী পদক্ষেপটিও শক্তিশালী।
গত জুলাইয়ে জাতিসংঘে এক ভাষণে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি বলেছিলেন, দ্বিরাষ্ট্র সমাধানকে সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের ওপর বিশেল এক দায়িত্বভার আছে।



