রাইসুল উদ্দিন সৈকত
করোনাভাইরাসের তান্ডবে বাংলাদেশে দীর্ঘ হচ্ছে নতুন কবরের সারি। যে মানুষগুলো কদিন আগেই নিশ্বাস নিয়েছিলেন পৃথিবীর বুকে, আমাদেরই সাথে, তারা আজ শায়িত হয়েছে সেই কবরগুলোতে। কোনোভাবেই লাগাম টানা যাচ্ছে না। তীব্রগতিতে বাড়ছে মহামারি করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা। এমন মৃত্যু ভারী করে তুলেছে অনেক পরিবারকে। বিশেষ করে জনগণের স্বাস্থ্যবিধি না মানায় এই ভাইরাসের প্রকোপ এমনই বেড়েছে যে সর্বোচ্চ মৃত্যু দেখেছি আমরা। করোনার নতুন নতুন ধরন বৈশ্বিক জনমানসে ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করে জীবন-জীবিকার উপর আরোপ করেছে এক অশনিসংকেত। সংক্রমণ ঠেকাতে এখন গোট দেশকেই করা হয়েছে অবরুদ্ধ। কিন্তু তবুও মিলছে না সুফল।
সরকার নানা উদ্যোগের পাশাপাশি তৃতীয়বারের মত কঠোর লকডাউন ঘোষণা করার পর প্রথমদিনেই মৃত্যুর রেকর্ড। সার্বিকভাবে লকডাউন যেমনটা হওয়ার কথা ছিল তেমনটা হচ্ছে না। জনগণও বিধিনিষেধ মানছে না। এই লকডাউন অর্থহীনতায় পর্যবসিত হয়েছে।জনগণকে এই ভাইরাসের ভয়বহতা বোঝানো যাচ্ছে না। আবার সরকারও কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এই অবস্থায় নিশ্চিত মৃত্যুর অপেক্ষা করা ছাড়া এই জনপদের মানুষের যেন কিছুই করার নেই।
সারাদেশে চলছে সর্বাত্মক ‘কঠোর লকডাউন’। সময় যতই গড়াচ্ছে, ততোই বিধিনিষেধের ভীতি কমছে সাধারণ মানুষের। রাস্তায় সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বাড়ছে গাড়ির সংখ্যা। কঠোর লকডাউন বা করোনা কোনো কিছুই আটকাতে পারছে না সাধারণ মানুষকে। তাই মূল রাস্তায় লোকজনের উপস্থিতি কম থাকলেও পাড়া-মহল্লায় সব ধরনের দোকানপাট খোলা রয়েছে। থাকছে সাধারণ মানুষের জটলা। হাটবাজারে দেখা যাচ্ছে একজনের শরীরের সঙ্গে আরেকজনের শরীর লেগে আছে। বিভিন্ন জায়গায় চেকপোস্ট বসিয়ে তলাশি চালানো হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হলে জরিমানা এবং গ্রেপ্তারও করা হচ্ছে। এতোকিছুর পরেও এখনো মানুষ বুঝতে পারছে না। সরকার লকডাউন বা কঠোর বিধিনিষেধ না দিলে আমরা কেউ মানি না, মানার চেষ্টাও করি না। যেন প্রশাসনকে ফাঁকি দিয়ে চলছি আমরা। দেশের বর্তমান সময়ে করোনার এই ভয়াবহ রূপের কারণ আমরা নিজেরাই। নিজেদের স্বেচ্ছাচারিতা, অবহেলা, অসচেতনতা, অতিরিক্ত জনসমাগম আমরা করেই চলেছি। কোনোভাবেই আমরা স্বাস্থ্যবিধি মানছি না।
একবার চিন্তা করেন! ২০২০ সালের ৮ মার্চ যখন প্রথম করোনাভাইরাসের রোগী শনাক্ত হয় আমাদের দেশে, তখন দেশের মানুষ রোগকে তেমন বেশি গুরুত্ব দেয়নি, সেটা আমরা সবাই জানি। প্রথম অবস্থায় যদি বিধি নিষেধগুলো সকলে মেনে চলত তাহলে আজকে সেনাবাহিনী মাঠে নেমেছে কিনা বা নেমে কী করছে তা অতি কৌতূহলবশত রাস্তায় নেমে দেখার জন্য জরিমানা গুণতে হতো না। করোনা প্রতিরোধে নামে মাত্র লকডাউন শব্দটা ব্যবহার করছি আমরা। যার বাস্তবে কোনো প্রয়োগ নেই। একের পর এক সরকারি বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও পালন হচ্ছে না। মানুষের এমন অবাধা বিচরণের প্রভাবে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টের পাশাপাশি দেশে হানা দিয়েছে। নতুন আরেকটি ছত্রাকজনিত রোগ ‘ব্ল্যাক ফাঙ্গাস’। অনেকের মাঝে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। আমাদের দেশে খুব দ্রুত ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট বাংলাদেশে বিস্তার লাভ করেছে এবং তা বেশ উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে জনসাধারণের মনে।
পরিশেষে বলতে চাই, করোনা ভাইরাসজনিত সংক্রমণ সম্পূর্ণ নতুন একটি রোগ। এই সংক্রমণ ইতিমধ্যে বিশ্বকে তছনছ করে দিয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্র কিংবা উন্নত রাষ্ট্রগুলোও আজ ধরাশায়ী হয়েছে এই সংক্রমণের কাছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন নতুন স্ট্রেইন দেখা যাচ্ছে। সুতরাং এর সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে কিংবা বেঁচে থাকতে হলে সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই। তাই আসুন, আমার নিজ জীবনের কথা চিন্তা করে, আমাদের পরিবার এবং আত্মীয়স্বজনের জীবনের কথা চিন্তা করে, আমাদের চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের কথা চিন্তা করে, চিকিৎসাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কথা চিন্তা করে আরো অধিক সতর্ক হই। করোনা মোকাবিলায় সবচেয়ে জরুরি ব্যক্তির সচেতনতা ও সরকারনির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা।
আমার মতে, করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য দুইটা পথ আছে। একটা হচ্ছে টিকা দেওয়া। টিকার কারণে হার্ড ইমিউনিটি চলে আসবে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে সচেতনতা। মহামারিকে পরাজিত করতে প্রয়োজন সচেতনতা। কিছু না হোক নিজের পরিবারকে সুস্থ রাখতে হলেও আসুন সচেতন হই। সুস্থ থাকি। করোনার এই ভয়াল রূপ থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করি।
লেখক: চেয়ারম্যান, এলবিয়ন গ্রæপ



