হাইব্রিড ও উফশী জাতের ধানের দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় পর্যায়ের ধানের জাতগুলো। বর্তমানে চট্টগ্রাম অঞ্চলে দেশি জাতের ধানের আবাদ শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। তবে ক্রমবর্ধমান খাদ্যের চাহিদা বৃদ্ধি, কৃষি জমি কমে যাওয়া, জমির উর্বরতা হ্রাসের কারণে এখন কৃষক বোরো মৌসুমের মত আউশের আবাদে হাইব্রিড কিংবা উফশী জাতের ধানের আবাদের দিকে ঝুঁকছেন। উৎপাদনের কথা চিন্তা করে তারা দেশি জাতের ধানের আবাদ কিংবা উৎপাদনে মোটেও আগ্রহী নয়। তবে কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থানীয় পর্যায়ের ধানগুলোর হেক্টর প্রতি উৎপাদন কম হলেও এই ধানের চাল সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ। সেজন্য এই ধানগুলো যাতে হারিয়ে না যায় সেজন্য সরকারি পর্যায়ে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাঁচ জেলা চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, লক্ষীপুর ও ফেনীতে ২০১০-১১ অর্থবছর থেকে হাইব্রিড ধানের উৎপাদন শুরু হয়। তার আগে এই অঞ্চলে বিভিন্ন উফশী এবং জেলা পর্যায়ের স্থানীয় আউশ ধানের আবাদ হতো বেশি। ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে যেখানে আউশ মৌসুমে এই অঞ্চলে প্রায় ৮৭ হাজার হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হতো সেটা ২০২০-২১ মৌসুমে গিয়ে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭০৩ হেক্টরে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে বাহারি ধানগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। উৎপাদন কম হবার কারণে স্থানীয় পর্যায়ের ধান আবাদে আগ্রহী নন কৃষকেরা। কৃষি সম্প্রসারণের তথ্য অনুাযায়ী প্রায় ৪০ ধরনের স্থানীয় জাতের ধান খুবই অল্প পরিমাণে উৎপাদন হচ্ছে। তার মধ্যে লক্ষীপুরে পানবিড়া সোনালী ইরি, লাখী ইরি, গয়াল; ফেনীতে বিন্নিতোয়া, চিকনাল, আচিন; নোয়াখালীতে কালীমুগ, টাঙ্গাইল, কেরানডোল, লাঠিশাইল, ধারিয়াল, হামিদা, দয়ালহরি, নারিকেলপিড়ি; চট্টগ্রামে গিরিং, হাসিকলমই, পাজাম, অন্যান্য। এছাড়া বৈলাম, ষাইট্রা, ভাতুড়ী, মাইড়চা, বটেশ্বর, কণ্টকতারা, বাছাইরি, চাপাখৈ, তাহেরচিকন, আসীমসহ অনেক জাতের স্থানীয় ধান কম বেশি দুই বা তিন জেলায় আবাদ হচ্ছে। আবার অনেক ধানের আবাদ বন্ধ হয়ে গেছে।
চট্টগ্রামের বাঁশখালী এলাকার প্রবীণ কৃষক মোস্তাক আহমদ পূর্বদেশকে বলেন, আমরা আগে বিন্নিতোয়া, বৈলাম, পাজাম, বাছাইরি, চাপাখৈ, গিরিং, হাসিকলমিসহ আরও অনেক ধরনের ধানের আবাদ করতাম। এই ধানগুলো থেকে ভালো মানের চাল পাওয়া যেত। কিন্তু এখন এইসব ধান উৎপাদন খুবই কমে গেছে। এখন আউশ মৌসুমেও বাজার থেকে হাইব্রিড বীজ কিনে উৎপাদন করছি বেশী উৎপাদনের আশায়। লোকাল ধানগুলো উৎপাদন তুলনামূলক কম। যার কারণে বেশি উৎপাদনের কারণে এখন আউশ মৌসুমে হাইব্রিড ধানের উৎপাদন বাড়ছে। তবে অনেক ধরনের ধান হারিয়ে গেছে উৎপাদন না হওয়ার কারণে। আগামীতে এই ধান আর পাওয়া যাবে না। কৃষি সম্প্রসারণের তথ্যমতে, ১৯৯৮-৯৯ মৌসুমে চট্টগ্রাম অঞ্চলে উফশী জাতের ধানের আবাদ ছিল ৪৮ হাজার ২০০ হেক্টর এবং স্থানীয় জাতের ধানের আবাদ ছিল ৮৭ হাজার হেক্টর। ১৯৯৯-০০ মৌসুমে উফশী ৪৩ হাজার ও স্থানীয় ৬৮ হাজার হেক্টর, ২০০০-০১ মৌসুমে উফশী ৬৮ হাজার ও স্থানীয় সাড়ে ৬৪ হাজার হেক্টর, ২০০১-০২ মৌসুমে উফশী সাড়ে ৬৯ হাজার এবং স্থানীয় সাড়ে ৫৩ হাজার হেক্টর ,২০০২-০৩ মৌসুমে উফশী ৭৬ হাজার ৬৪৮ ও স্থানীয় ৫৫ হাজার হেক্টর, ২০০৩-০৪ মৌসুমে উফশী ৭৫ হাজার ও স্থানীয় ৫৮ হাজার হেক্টর, ২০০৪-০৫ মৌসুমে উফশী সাড়ে ৭৮ হাজার ও স্থানীয় ৬২ হাজার হেক্টর, ২০০৫-০৬ মৌসুমে উফশী ৬৮ হাজার ও স্থানীয় ৬৮ হাজার হেক্টর, ২০০৬-০৭ মৌসুমে উফশী ৭৮ হাজার ও স্থানীয় ৬৯ হাজার হেক্টর, ২০০৮-০৯ মৌসুমে উফশী ৯৫ হাজার ও স্থানীয় ৭১ হাজার হেক্টর জমিতে।
এদিকে ২০১০-১১ মৌসুমে হাইব্রিড এক হাজার ৬৮০ হেক্টর, উফশী এক লাখ তিন হাজার এবং স্থানীয় ৬৭ হাজার ৪০৫ হেক্টর, ২০১১-১২ মৌসুমে হাইব্রিড ৩ হাজার ৮১, উফশী এক লাখ এবং ৬১ হাজার ৮০০ হেক্টর, ২০১২-১৩ মৌসুমে হাইব্রিড তিন হাজার ২৪৩, উফশী সাড়ে ৯২ হাজার এবং স্থানীয় ৫১ হাজার ১২৮ হেক্টর, ২০১৩-১৪ মৌসুমে হাইব্রিড ৪ হাজার, উফশী সাড়ে ৯৭ হাজার এবং স্থানীয় ৫০ হাজার ৭৭৬ হেক্টর, ২০১৪-১৫ মৌসুমে হাইব্রিড সাড়ে ৪ হাজার, উফশী ৮৫ হাজার এবং স্থানীয় ৩৭ হাজার ৩৮১ হেক্টর, ২০১৫-১৬ মৌসুমে হাইব্রিড ৫ হাজার, উফশী সাড়ে ৮২ হাজার এবং স্থানীয় সাড়ে ২৯ হাজার হেক্টর, ২০১৬-১৭ মৌসুমে হাইব্রিড ৪ হাজার ৭৫০, উফশী ৮৩ হাজার এবং স্থানীয় ২৮ হাজার হেক্টর, ২০১৭-১৮ মৌসুমে হাইব্রিড ৬ হাজার, উফশী ৯০ হাজার এবং সর্বশেষ ২০২০-২১ মৌসুমে স্থানীয় জাতের ধানের আবাদ হয় প্রায় ১৯ হাজার হেক্টর জমিতে।
চট্টগ্রাম জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের উপ-পরিচারক আকতারুজ্জামান পূর্বদেশকে বলেন, চট্টগ্রামে আমন মৌসুমে স্থানীয় প্রজাতির ধানের আবাদ কম হয়। তবে আউশ মৌসুমে আবাদের পরিমাণ বাড়ে। বিশেষ করে সন্দ্বীপ উপজেলায় এখনো স্থানীয় জাতের ধানের আবাদ হয়। সাহেবচিকন সহ বেশ কয়েক জাতের স্থানীয় ধান এখনো চাষ হচ্ছে। তবে স্থানীয় জাতের ধানগুলো যে একেবারে বিলুপ্ত হয়েছে এমনটি নয়। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট দেশীয় জাতের ধানগুলো আবার ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে।



