করোনাকালের দ্বিতীয় বাজেট স্বপ্ন বাস্তবায়নের সক্ষমতা অর্জন করতে হবে

0
করোনাকালের দ্বিতীয় বাজেট স্বপ্ন বাস্তবায়নের সক্ষমতা  অর্জন করতে হবে

বৈশ্বিক মহামারী করোনার তাÐব চলছে দেড় বছর ধরে। অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বিপর্যস্ত বিশ্ব এখন অর্থনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তা সুরক্ষার সংগ্রামে লিপ্ত। বাংলাদেশ এর থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। এ মহাদুর্যোগের দ্বিতীয় বর্ষে জাতীয় সংসদে ২০২১-২০২২ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। সংক্ষিপ্ত পরিসরে উত্থাপিত হলেও এটি হচ্ছে স্বাধীনতার পর পঞ্চাশ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট। সদ্য অর্জিত মধ্য আয়ের দেশ বাংলাদেশের সামনে বিশাল চ্যালেঞ্জ, আছে আকাশসম স্বপ্ন- এ স্বপ্ন এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ৬ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী বৃহস্পতিবার বিকালে জাতীয় সংসদ ভবনে। ‘জীবন-জীবিকায় প্রাধান্য দিয়ে সুদৃঢ় আগামীর পথে বাংলাদেশ’ শিরোনামে উত্থাপিত বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, করোনা ভাইরাসের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মোকাবিলায় জীবন ও জীবিকাকে প্রাধান্য দিয়ে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের মাধমে জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ করবে এ বাজেট। করোনাকালিন অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের স্বপ্নে কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী। বাজেটে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে, ৬ লক্ষ, ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। আর আয় ধরা হয়েছে, ৩ লক্ষ ৮৯ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি ২লক্ষ, ১৪ হাজার ৬৮১ টাকা। যা দেশি-বিদেশি অনুদান ও ঋণ থেকে পূরণ করা হবে।
অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় প্রবৃদ্ধি অর্জন, করোনা মোকাবেলায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষার বিষয়ে যে বক্তব্য এবং আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, বিভিন্ন মহল থেকে বাজেটে এর বাস্তব প্রতিফলন নেই বলে মন্তব্য করা হচ্ছে, পাশাপাশি প্রবৃদ্ধি অর্জনের হারকে ‘বাস্তবতাবিবর্জিত উচ্চাকাক্সক্ষা’ বলা হচ্ছে। দীর্ঘ মেয়াদি করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী অর্থনীতির হিসাব-নিকাশ ওলটপালট করে দিয়েছে, বিশ্বব্যাপী চলমান এ অর্থনৈতিক দুর্যোগের বাইরে নয় বাংলাদেশ। গত বছরের বাজেট বাস্তাবায়ন ও উন্নয়ন কর্মসুচি বাস্তাবয়নে সক্ষমতার চরম ঘাটতি দৃশ্যমান হয়েছে। এরই মধ্যে দেশে রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধি পেলেও অন্যান্য খাতে অর্থনৈতিক মন্দার চিত্র খোদ সরকারের হিসাবেই উঠে এসেছে। আমরা লক্ষ করেছি, গত অর্থবছরে দেশের মোট জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৫ শতাংশ, যা সংশোধন করে ৫ দশমিক ২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। এ বাস্তবতায় আগামী অর্থবছরে ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন অসম্ভব বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তত্ত¡াবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা এবি মীর্জা আজিজুল ইসলাম মনে করেন, ‘ বাজেটে আগামী অর্থবছরে ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু এটি সম্ভব নয়। কারণ প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি যেসব দিয়ে বোঝা যায়, সেগুলোর মধ্যে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানি অন্যতম। কিন্তু এর কোনোটিই বাড়ছে না। ফলে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা আমাদের কাছে যৌক্তিক মনে হয়নি। আর বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান না বাড়লে মধ্যবিত্ত তেমন উপকার পাবে বলে মনে হয় না।
পূর্বের অভিজ্ঞতা বলছে, আমাদের ব্যয়ের সক্ষমতা কম। আমাদের দুর্বলতাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বাস্তবায়নের হার কম। প্রতিবছরই বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা, সংশোধিত বাজেটে তা কমানো হয়। আর বাস্তবায়ন হয় তার চেয়েও কম। অন্যদিকে উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর গুণগত মান খুবই নিম্ন। রাস্তা নির্মাণের পর তিন থেকে ৬ মাসের মধ্যে তা নষ্ট হয়ে যায়। ফলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রকল্প নির্বাচন, পর্যাপ্ত বরাদ্দ দেওয়া, যথাসময়ে বাস্তবায়ন এবং গুণগত মান নিশ্চিত করা জরুরি। তবে আজিজুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্টরা সামগ্রীকভাবে বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা গেলে তা ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে বলে মত দেন। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, এবার ব্যয়ের ক্ষেত্রে আমাদের প্রত্যাশা ছিল, সম্প্রসারণমূলক পদক্ষেপ। এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান গুরুত্ব পাওয়া জরুরি ছিল। কিন্তু খাতগুলোতে ওইভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই করোনার কারণে অনেক লোক চাকরি হারিয়েছে। নিম্নমধ্যবিত্ত অনেক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে এসেছে। এসব মানুষের জন্য বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ থাকা জরুরি ছিল। এই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি কেবল গ্রামকেন্দ্রিক নয়, শহরেও আনতে হবে। এছাড়া চাকুরিহারা প্রবাসীদের দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি। কৃষিতেও স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন। কারণ এ সময়ে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে না পড়ে। বলতে দ্বিধা নেই, সরকার প্রতি বছর বাজেটের আকার বড় করছে । সন্দেহ নেই, এর মধ্যে ‘লোক দেখানো’ একটি প্রবণতা থাকে; যে বৃত্ত-বলয় থেকে এবারও মুক্তি মেলেনি। এ কথা সর্বজনবিদিত, উন্নয়ন বাজেটের বিশাল আকার থাকলেও বছর শেষে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা কমানো হয়। এবারের বাজেটও এ ছক থেকে বের হতে পারবে না বলেই মনে হচ্ছে।
আমরা জানি, বাজেট বাস্তবায়নের সঙ্গে রাজস্ব আদায়, অর্থ ব্যয় ও ঘাটতি অর্থায়ন- এ তিনটি বিষয় জড়িত। বিশেষজ্ঞরা প্রস্তাবিত বাজেটের সামনে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। আমরা মনে করি, জাতিকে শুধু স্বপ্ন দেখালেই হবে না; স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য যে সক্ষমতা প্রয়োজন; সেটাও অর্জন করতে হবে।