খন রঞ্জন রায়
মহাবিশ্বের ৩০ ভাগ স্থল আর ৭০ ভাগ জল। এর মাত্র ৩ শতাংশ মিষ্টি (খাবার, পারিবারিক বিভিন্ন কাজ, কৃষি কাজ ও শিল্পখাতে উপযোগী) এবং বাকি ৯৭ শতাংশ লোনা পানি। সুপেয় এবং নিরাপদ পানির জন্য সারাবিশ্বেই হাহাকার। এই কারণেই বলা হয়, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ যদি হয়, তবে তা হবে পানির কারণে। এরকম পরিস্থিতিতে পানির আধার অধিকার সংরক্ষণে এখন বিশ্বব্যাপী সকলেই সোচ্চার। মিষ্টি- লোনা নয়, পানির অধিকারে মরিয়া সারাবিশ্ব। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অর্থনীতির বড় শক্তি সাগরকেন্দ্রিক। ব্যবসা-বাণিজ্যের বড় অংশই সাগরনির্ভর। বঙ্গোপসাগরের সীমানা নির্ধারণের পর থেকে বাংলাদেশের জন্য নীল জলের অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। যুগ যুগ ধরে এই উপসাগর মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার কারণ হয়েছে। এর অধিকার এখন আরো বিস্তৃত হয়েছে; আইনসিদ্ধ হয়েছে।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বিগত সরকারের প্রচেষ্টায় আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে সীমানা বিরোধের অবসান হয়েছে। এক বিশাল অঞ্চলজুড়ে (স্থলভাগের প্রায় ৮০ শতাংশ) বাংলাদেশের একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মিয়ানমারের সঙ্গে ন্যায্যতার ভিত্তিতে ২০০ নটিক্যাল মাইল অর্থনৈতিক এলাকা ও তদুর্ধ্ব মহীসোপান এলাকা এবং ভারতের সঙ্গে সমুদ্রজয়ে বিরোধপূর্ণ ২৫ হাজার ৬০২ বর্গ কিলোমিটারের মধ্যে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গকিলোমিটারের সমুদ্রসীমা বাংলাদেশের সঙ্গে যোগ হয়েছে। অধিকৃত এই অঞ্চলে বাংলাদেশ তার সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাÐ চালানোর জন্য আর্থিক ও কারিগরি ক্ষেত্রে যে ব্যাপক প্রস্তুতি থাকা দরকার আমাদের তার ছিটেফোটাও নেই। সমুদ্রবিজয়ে ভারতের সঙ্গে আটটি ও মায়ানমারের সঙ্গে ১৩টি তেল-গ্যাস বøক জিতেছে বাংলাদেশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্জিত সমুদ্রসীমায় আনুমানিক ৪০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) আর ভূ-সীমায় মজুদ রয়েছে ১২ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। বর্তমানে প্রতিবছর দেশে এক টিসিএফ গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। সে হিসেবে আগামী ১২ বছর পর দেশে গ্যাসের সঙ্কট দেখা দেবে। এক্ষেত্রে সমুদ্রসীমায় গ্যাস উত্তোলন করতে পারলে এ সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
বঙ্গোপসাগরের এ অঞ্চলে প্রাণিজ সম্পদের পাশাপাশি গ্যাস হাইড্রিড, জিরকন, ইলেমেনাইট, ম্যাগনেটাইটসহ বিভিন্ন মূল্যবান খনিজ সম্পদের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। ভারত ও মায়ানমার ইতোমধ্যে এ সমস্ত মূল্যবান সমুদ্রসম্পদ আহরণ শুরু করেছে। ফলে তারা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সমুদ্র সম্পদের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা নিজ খরচে কিংবা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে সমুদ্র সম্পদ আহরণ করছে। ভারত তার জাতীয় বাজেটে সমুদ্র সম্পদ আহরণে বড় ধরণের বরাদ্দ রেখেছে। আর মায়ানমার চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে জোরদার করে সমুদ্রসীমার মধ্যে থাকা সম্পদ আহরণে কাজ করছে। বাংলাদেশ এখানে এখনো কল্পনা-পরিকল্পনা, নীতি নির্ধারণে সময় পার করছে। বাংলাদেশে এ মুহূর্তে জ্বালানির ঘাটতি বিদ্যমান। গ্যাসের অভাবে অনেক শিল্প-কারখানা চালানো সম্ভব হচ্ছে না, কারখানা নির্মাণের পরও গ্যাস সংযোগ না পেয়ে উৎপাদনেও যেতে পারছেন না অনেক উদ্যোক্তা। এমন অবস্থায় গ্যাসপ্রাপ্তির সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র সমুদ্রে অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম জোরদারের কালক্ষেপণ দেশের সার্বিক অর্থনীতির উপর খড়গ নেমে আসবে। নিজস্ব কোম্পানি গঠনের মাধ্যমেই সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন কার্যক্রম শুরু করতে কালবিলম্ব জাতির অপূরণীয় ক্ষতি। নিজস্ব দক্ষ জনবল আর দৃঢ় মনোবল এখানে সাহসী ভূমিকা পালন করবে।
বাংলাদেশ দুনিয়ার সবচেয়ে ঘনবসতি দেশ। গত পাঁচ দশকে বর্ধিত জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে বসতবাড়ি, স্কুল-কলেজ, রাস্তাঘাট, শিল্পকলকারখানাসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণে কৃষিজমি ব্যবহার করায়, জমি ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। শিল্প কলকারখানা স্থাপনের জন্য দেশের চাষযোগ্য জমি নষ্ট না করে সাগরপ্রান্তের দিকে নজর দিতে হবে। উদ্ধার করতে হবে উপকূলীয় বিশাল বালুকা রাশির পরিত্যক্ত জমি। ফলাতে হবে ফসল আর নির্মাণ করতে হবে শিল্প। আবির্ভূত, উত্তোলনকৃত, উদ্ধারকৃত জমিতে বনায়ন করা হলে ভূমিক্ষয় যেমন রোধ করা সম্ভব হবে, তেমন উপকূলবর্তী এলাকা ঘূর্ণিঝড় ও টর্নেডোর আঘাত থেকে রক্ষা পাবে। লবণ চাষের জন্য পুরনো পরিত্যক্ত রৌদ্রতাপ পদ্ধতির পরিবর্তন করে গুণগতমানের লবণ চাষে মনোনিবেশ ঘটাতে হবে। দেশের সম্ভাবনার লবণকে শিল্পগণ্য করে বিদেশনির্ভরতা পরিত্যাগ করা যায় অনায়াসে। এক্ষেত্রে সর্বত্র সবখানে সব জায়গায় দরকার সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ প্রশিক্ষিত প্রযুক্তিসমৃদ্ধ লোকবল। সমুদ্রের পানি ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব না দিয়ে কোনো লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়, টেকসই লক্ষ্য বাস্তবায়নে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রকল্প- যেমন সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যে ও পরিচর্যা বৃদ্ধি, সুপেয় পানি এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে সমুদ্রের পানি সম্পদের যথাযথ ব্যবস্থাপনার জন্য দক্ষ জনবল সৃষ্টিতে বিনিয়োগ করতে হবে।
অধিকৃত বঙ্গোপসাগরের প্রাথমিক সম্পদ হচ্ছে মাছ। বাংলাদেশ জলসীমায় পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মৎস্য শিকারিরা এসে মাছ ধরে নিয়ে যায়। এ দেশের মৎস্য আহরণে ও মৎস্য প্রক্রিয়াকরণে যারা জড়িত তাঁদের আধুনিক প্রযুক্তি বিদ্যার কোন প্রশিক্ষণ নেই। নেই গভীর সমুদ্রে পরিবাহী কোন সর্বাধুনিক মৎস আহরণে যান। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু কর্মসূচি বাস্তবায়ন হলেও সমুদ্রসীমা নির্বিঘœ হয়নি। বাড়ানো জনবল পাহাড়ার কাজে লাগবে। আহরণে নয়। সম্পদের ভোগের সুযোগ বাড়াতে আলাদা পরিকল্পনায় এগুতে হবে। দেশের সাধারণ তরুণদের সমুদ্রসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রযুক্তিবিদ্যা শিক্ষার সুযোগ করে দিতে হবে। সমুদ্র উপকূলবর্তী ১৯ জেলায় ১৩০ উপজেলা সরকারি/বেসরকারি, শিল্পগোষ্ঠীর উদ্যোগে একাধিক মেরিন ফিশারিজ, মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী হতে হবে। সমুদ্র উপকূল দ্বীপে দুর্ঘটনায় গত ৫০ বছরে ২০ হাজার ৫০৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। স্থাবর সম্পদ ধ্বংস হয়েছে ৩ হাজার ৪১৭ কোটি ২০ লাখ টাকার। ১৯৬৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সারাদেশে যাত্রী ও পণ্যবাহী মিলিয়ে ২ হাজার ৫৭২টি নৌ দুর্ঘটনা ঘটেছে। সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় নৌ পরিবহনের গুরুত্ব অপরিসীম। দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য, মৎস্য, পণ্য সামগ্রী এবং যাত্রী পরিবহনে নৌ-পরিবহন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সমুদ্র সংলগ্ন নদীপথে পণ্য এবং যাত্রী সাধারণের জানমালের নিরাপত্তা ও নৌযানের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিতকল্পে সংশ্লিষ্ট সকলের সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিবছর ‘নৌ নিরাপত্তা সপ্তাহ পালন করা হয়, তাতে জনগণ কিছুটা হলেও সচেতন হয়। এই পথের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্য ভোগ করার অধিকার বিষয় সমূহজ্ঞান আহরণ করে। পায়রা বন্দর, আর মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর পুরোদমে চালু হলে এই সংশ্লিষ্ট খাতের লোকবলের দক্ষতা আরো বাড়াতে হবে। প্রয়োজন হবে দেশেই কন্টেইনার তৈরী, রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত বিষয়ে জ্ঞানদক্ষ- তরুণ, যুবগোষ্ঠী অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যিক সুবিধা গতিশীল করে আন্তঃআঞ্চলিক সুযোগও অবারিত হবে। অপরিহার্য হবে জোরালো ভূমিকা পালনের। জনবল সংকট মুকাবিলায় এখন থেকেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। আমাদের অধিকৃত বঙ্গোপসাগরের সাথে ভারত মহাসাগরে বøু ইকোনমির উন্নয়ন এ অঞ্চলের দেশগুলোর জনগণের জীবনে কল্যাণ বয়ে আনার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। কর্মসংস্থান, নতুন কর্ম উদ্যোগ, আঞ্চলিক অর্থনীতির কানেকটিভিটি- সবই সম্ভব হবে এই নীল জলের অর্থনীতির কারণে।
সমুদ্র সম্পদের প্রাচুর্যের কারণেই প্রতিবেশ হিসেবে বিবেচিত বঙ্গোপসাগরের চার ধারের রাষ্ট্র ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, শ্রীলংকা ও থাইল্যান্ড এ সম্পদ ব্যবহারের জন্য আগ্রহী হয়ে উঠেছে। তারা মনে করে তারা এই সম্পদের সহ-অংশীদার। এই দেশগুলোর প্রায় ৫০ কোটি মানুষের জীবনযাত্রা বিভিন্নভাবে বঙ্গোপসাগরের সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। এ কারণেই এই সম্পদের ব্যবস্থাপনার জন্য গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সংস্থা। দূরদর্শী পরিকল্পনায় এ সমস্ত সংগঠনের নেতৃত্বে থাকতে হবে বাংলাদেশকে। তা না হলে নীল সাগরের অনন্ত জলরাশির সম্পদ হাতছাড়া হবে। আমাদের প্রকৃতির অংশ অধিকৃত অংশ কাগজে আর স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকবে। জাতির আকাক্সক্ষা আর ইতিহাস তা-নয়; ইতিহাস অধিকার আদায়ের। আমরাও তাই-চাই।
লেখক: সমাজচিন্তক, গবেষক ও সংগঠক



