ঘুরছে না রেলের ২০ প্রকল্পের চাকা

108

রাহুল দাশ নয়ন

রেলওয়েতে বর্তমান ৩৫টি প্রকল্প চলমান আছে। প্রকল্পগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন, লোকোমোটিভ সংগ্রহ, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, আখাউড়া-আগরতলা রেল সংযোগের মতো অগ্রাধিকার প্রকল্পও আছে কয়েকটি। প্রকল্পগুলো ৪-১২ বছর আগে হাতে নেয়া হলেও এখনো পর্যন্ত শেষ হয়নি। ২০২২ সাল নাগাদ শেষ হওয়ার কথা থাকায় সাতটি প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এমন অনেক প্রকল্প আছে চার বছরেও কাজ শুরু হয়নি। চলমান ৩৫টি প্রকল্পের মধ্যে ২০টি প্রকল্পের চাকা ঘুরছে ধীরগতিতে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্ভাব্যতা যাচাই, দরপত্র প্রক্রিয়া, পরামর্শক নিয়োগ, তহবিল সংগ্রহ, যথাসময়ে ফান্ড না পাওয়া, ঠিকাদারের গাফিলতি, জমি অধিগ্রহণ, করোনাকালীন স্থিতিবস্থাসহ নানা কারণেই নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পগুলোর দীর্ঘসূত্রিতা বেড়েছে। আবার এমন কিছু প্রকল্প আছে যেগুলো সংশোধন করে পরিধি বাড়ানো হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মেয়াদ বাড়ানোর বিকল্প ছিল না। এখন মেয়াদ বাড়ানোর সাথে সাথে প্রকল্পের ব্যয়ও বাড়ছে। সামনে জাতীয় নির্বাচন চলে আসায় অনেকগুলো প্রকল্প একযোগে শেষ করতে সরকারের পক্ষ থেকে চাপ আছে। চলমান প্রকল্পগুলোর বেশিরভাগই আগামী তিন বছরের মধ্যে শেষ হবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. কামরুল আহসান বলেন, ‘রেলওয়ের চলমান প্রকল্পগুলো যাতে যথাসময়ে শেষ হয় সেজন্য তাগাদা দিয়েছি। এখন অনেকগুলো প্রকল্পের কাজে অগ্রগতি বেড়েছে। আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই রেলের উল্লেখযোগ্য প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ হবে।’
জানা যায়, ২০১০ সালে দোহাজারি হতে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু হতে মিয়ানমারের নিকটে ঘুমধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্রাক নির্মাণ প্রকল্প। ২ বছর মেয়াদ বাড়িয়ে প্রকল্পটি শেষ করতে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। যদিও আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগেই এই রুটে ট্রেন চালানোর কথা বলছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। কুলাউড়া থেকে শাহবাজপুর সেকশনের পুনর্বাসন প্রকল্পটি ২০১১ সালে হাতে নেয়া হয়। আগামী ৩১ ডিসেম্বর প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো ২৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের ৭০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহ প্রকল্পটি ২০১১ সালে হাতে নেয়া হলেও এখনো কাজই শুরু হয়নি। এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৪ সালের জুনে। রেলওয়ের ঢাকা-টঙ্গী সেকশনের ৩য় ও ৪র্থ ডুয়েল গেজ লাইন এবং টঙ্গী-জয়দেবপুর সেকশনে ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। ২০১২ সালের প্রকল্পটির ২০২৩ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও গত নভেম্বর মাস পর্যন্ত ৬৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
২০১৪ সালে আখাউড়া থেকে লাকসাম পর্যন্ত ডুয়েলগেজ ডাবল রেললাইন নির্মাণ এবং বিদ্যমান রেল লাইনকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর প্রকল্পটি ২০২৩ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা। গত নভেম্বর পর্যন্ত এ প্রকল্পের ৮৬ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সেকশনে বিদ্যমান মিটারগেজ রেল লাইনের সমান্তরাল একটি ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পটি ২০১৪ সালে শুরু হয়। আসছে ৩১ ডিসেম্বর প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো ৮২ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। ২০১৬ সালে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। ২০২৪ সালের জুন মাসে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা। এ প্রকল্পের অগ্রগতি ৬৭ শতাংশ। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে আখাউড়া থেকে আগরতলা ডুয়েলগেজ রেলওয়ে সংযোগ প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। ২০২৩ সালের জুনে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো ৬৪ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতুতে ২০১৬ সালে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটির কাজ শেষ হবে। এ প্রকল্পের ৫০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ২০টি মিটারগেজ লোকোমেটিভ এবং ১৫০টি মিটারগেজ যাত্রীবাহী ক্যারেজ সংগ্রহ প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয় ২০১৭ সালে। এ প্রকল্পের মেয়াদ ২০২২ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ২০২৪ সাল পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এ প্রকল্পের অগ্রগতি ৫০ শতাংশ। ২০১৮ সালে পাবর্তীপুর হতে কাউনিয়া পর্যন্ত মিটারগেজ রেলওয়ে লাইনকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর প্রকল্পটি চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা ছিল। গত নভেম্বর মাস পর্যন্ত প্রকল্পটির অগ্রগতি এখনো শূন্যের কোটায়। ২০১৮ সালে মুধখালী হতে কামারখালী হয়ে মাগুরা শহর পর্যন্ত ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়। ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এ প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে এ প্রকল্পের অগ্রগতি ৩৯ শতাংশ।
২০১৭ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশ রেলওয়ের রোলিং স্টক অপারেশন উন্নয়ন প্রকল্পটি গ্রহণ করা হলেও সেটিও নির্ধারিত সময় চলতি সালের জুনের মধ্যে শেষ হয়নি। দুই বছর মেয়াদ বাড়ানো প্রকল্পটির ৩০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া রেলওয়ের খুলনা-দর্শনা জংশন সেকসনে ডাবল লাইন রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটি চলতি সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এ প্রকল্পের অগ্রগতি গত নভেম্বর মাস পর্যন্ত শূন্য। ২০১৮ সালে ভারতের সাথে রেল সংযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে চিলাহাটি এবং চিলাহাটি বর্ডারের মধ্যে ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়। ২০২৩ সালের জুনে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি ৫৯ শতাংশ। ২০১৮ সালে গ্রহণ করা বগুড়া হতে শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত ডুয়েল গেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটি ২০২৩ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। মেয়াদ এক বছর থাকলেও এ প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ৫ শতাংশ। বাংলাদেশ রেলওয়ের ১০০টি মিটারগেজ যাত্রীবাহী ক্যারেজ পুনর্বাসন প্রকল্পের ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ। প্রকল্পের মেয়াদ ছয় মাস থাকলেও ৪৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।

সমীক্ষা প্রকল্পেও ধীরগতি : ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে চট্টগ্রাম পতেঙ্গার বে-টার্মিনাল রেলওয়ে সংযোগ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ২০২২ সালের জুনে প্রকল্প কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এক বছর সময় বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে ৪৮ শতাংশ। ২০১৯ সালে সুনামগঞ্জ জেলা সদরে রেলওয়ে সংযোগের জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং বিশদ ডিজাইন প্রকল্পটি ২০২২ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও শেষ হয়নি। পরে একবছর মেয়াদ বাড়ানো এ প্রকল্পটির অগ্রগতি ৪৯ শতাংশ। গোবরা হতে পিরোজপুর পর্যন্ত ব্রডগেজ রেললাইন নির্মাণ এবং বাগেরহাট রেলসংযোগ স্থাপনের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিশদ ডিজাইন প্রকল্পটি ২০১৯ সালে হাতে নেয়া হয়। ২০২১ সালের মধ্যে প্রকল্প কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও চলতি বছর পর্যন্ত প্রকল্পটির অগ্রগতি মাত্র ২০শতাংশ।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের এক প্রকৌশলী বলেন, ২০২৫ সালের মধ্যে বেশিরভাগ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে। এসব প্রকল্প শেষ হলে রেলে দৃশ্যমান উন্নয়ন চোখে পড়বে। বরাদ্দ না পেলে প্রকল্প এগিয়ে নেয়া কঠিন। ঠিকাদাররাও টাকা না পেলে কাজ এগিয়ে নিতে চায় না।
গত বছরের আগস্ট মাসে রেলওয়ের প্রকল্পে ধীরগতি নিয়ে রেলমন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভায় ক্ষোভ জানানো হয়েছিল। সেসময় প্রকল্পে ধীরগতির সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল। সেই বৈঠকে করোনা ছাড়াও জমি অধিগ্রহণসহ নানা কারণে প্রকল্পের কাজে ধীরগতি হচ্ছে বলে জানিয়েছিলেন রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন। এজন্য অতিরিক্ত লোকবল যুক্ত করে নানা কৌশলে কাজের গতি বাড়ানোর কথা জানিয়েছিলেন মন্ত্রী।