আয়াত হত্যা এবং আমাদের দায়

14

আজহার মাহমুদ

একটা ছোট্ট শিশু। সম্ভবত ৬ বছর হবে কন্যা শিশুটির। সেই শিশুটিই নাকি খন্ড-বিখন্ড! একবার আপনার চোখ দুটো দিয়ে কল্পনা করেন তো! কিংবা ভাবেন সেই মেয়েটি আপনার মেয়ে কিংবা ছোট্ট বোন। শরীরে কি কম্পন সৃষ্টি হয় না? বুকে ভয়ের সমুদ্র জেগে উঠে নিশ্চয়। ধরেন সেটা আপনার ভাই, মা, বাবা! আপনি কল্পনা করেন তাদের খন্ড খন্ড শরীর। ভাবেন কেমন হতে পারে সেই দৃশ্য। আপনি হয়তো আমার উপর রাগ করতে পারেন। কেন আমি এমন বাক্য লিখে শুধু শুধু পাঠকদের আঘাত করছি। আসলে আমি বুঝাতে চাইছি আয়াতের বাবা-মা এবং তার দাদার কষ্টের একটু ছিঁটেফোটা অংশ। সম্পূর্ণ কষ্টের পরিমাণ আমরা কেউই বুঝবে না। আমাদের গ্রাম্য একটা প্রবাদ আছে, যার যায় সে বুঝে। ঠিক একইভাবে এই কষ্টের পরিমাপ আমি আপনি আমরা কেউই করতে পারবো না। এই বিষয়টি নিয়ে আমি লেখার কারণ হচ্ছে এটার শুরু থেকেই আমি খবরটা জানতাম। তাই অনেক দায় আমার চোখের সামনে ভাসছে।
এক
প্রথমেই আমি বলে রাখি ব্যক্তিগতভাবে আয়াতের এই হত্যাকান্ডে আমি নিজেও অপরাধবোধে ছিলাম। এর কারণ হচ্ছে আমি কিছুই করতে পারিনি। আপনারা হয়তো হাসছেন আমি কি এমন হলাম যে কিছু করতে পারতাম! আসলে ঘটনটা শুরু হয় আয়াত হারিয়ে যাওয়ার দিন থেকে। আমাকে আমার এক ছোট ভাই এই হারিয়ে যাওয়ার একটি ফেসবুক পোস্টে মেনশন করেন। তার মেনশন করার কারণ হচ্ছে আমি পত্রিকায় মাঝে মাঝে লিখি আর একটা পত্রিকায় চাকরি করি। সবমিলিয়ে এই সংবাদ আমি ছড়িয়ে দিতে পারবো এটাই তার ধারণা ছিলো। তাই এই মেনশন করা। আমি প্রথমত এই তথ্যটা কতটা সত্য সেটা যাচাই করতে পোস্টে দেওয়া নম্বরে ফোন করলাম। অপরপ্রান্তে একজন বয়স্ক লোক ফোনটা রিসিভ করেন। লোকটা হচ্ছেন আয়াতের দাদা। আয়াতের দাদাকে আমার পরিচয় দিলাম। এবং সমস্ত ঘটনা জানলাম। উনার কথা শুনে বুঝলাম মেয়ে হারিয়ে যায়নি, তাকে কেউ নিয়ে গেছে। এরপর উনাকে আমার স্বল্প জ্ঞানে যতটুকু জানা ছিলো ততটুকুই উনাকে পরামর্শ দিয়েছিলাম। এরপর আমি আমার জায়গা থেকে একটা ফেসবুক পোস্ট করলাম। ব্যাস আমার দায়িত্ব শেষ। আসলে এর বাইরে তেমন কিছু করারও ছিলো না। বাকিটুকু থানা-পুলিশের কাজ।
এরও ৩/৪ দিন পর(আনুমিনক) আমার মোবাইলে একটা অপরিচিত নম্বর থেকে কল আসে। আমি রিসিভ করার পর পরিচয় দিলেন তিনি হারিয়ে যাওয়া মেয়েটির দাদা। আমি অবাক হলাম এই ভদ্রলোক আমার নম্বরটাও তাহলে রেখে দিয়েছেন। তিনি আমাকে তার অসহায়ত্ব প্রকাশ করলেন। কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, আমার নাতনীটাকে এখনও খুঁজে পেলাম না। দয়া করে আমার নাতনীটার জন্য কিছু করেন। আমি প্রায় বাকরুদ্ধ ছিলাম তখন। আমার লজ্জাও লাগছিলো। আমিও অসহায়ত্বেও জায়গা থেকে উনাকে বললাম আমি যতটুকু পারার ততটুকু করছি। উনি চট্টগ্রামের কয়েকটি পত্রিকার নাম বলেছেন সেখানে নিউজটি পাবলিশ করলে হয়তো তাড়াতাড়ি খুঁজে পাবেন। যদিও ততদিনে তার নাতনী আর বেঁচে নাই। কিন্তু এই বিষয়টা তো ততদিন পর্যন্ত তার পরিবার জানতো না। মেয়ের মৃত্যুর সংবাদ এবং খন্ড-বিখন্ড শরীরের দৃশ্য দেখার চাইতে নিখোঁজ মেয়ের অপেক্ষায় থাকাটা বোধহয় তার পরিবারের কষ্ট কম হতো। হুমায়ূন আহমেদের অপেক্ষা উপন্যাস যারা পড়েছেন তারা হয়তো এটার ভালো দিকটা বুঝতে পারবেন। যদিও নিখোঁজ মানুষকে খুঁজে পাওয়াটাই প্রথম শর্ত হওয়া উচিত। তবে সেটা মৃত হলেই হৃদয় ভেঙ্গে যায়।
যাইহোক আয়াতের দাদা যেসব পত্রিকার কথা বলেছেন সেসব পত্রিকা চট্টগ্রামের প্রথম সারির স্থানীয় পত্রিকা। আমি সেসব পত্রিকার অফিসের ঠিকানা তাকে দিয়েছি। সেইসাথে তার নাতনী হারিয়ে যাওয়ার যে পোস্টার করেছে সেটি নিয়ে যেতে বলেছি। যদি মানবিক দিক থেকে সংবাদ করে তাহলে তো ভালো। আয়াতের দাদা আরও বলেন, এক সাংবাদিক নিউজ করে দিবে বলে তাদের কাছ থেকে দশ হাজার টাকা দাবি করেছেন। আমি অবশ্য টাকা দিয়ে নিউজ করতে নিষেধ করেছি। আর একজন লোক ফোন দিয়ে বলেছেন, বিশ হাজার টাকা দিলে মেয়েকে খুঁজে দিবেন। আমি বলেছিলাম, এই তথ্যটি থানায় জানান। ফোন নম্বরসহ থানায় বিষয়টি খুলে বলুন। এসব বিষয়ে একমাত্র পুলিশ আপনাকে সহযোগিতা করতে পারে। এরপর আর আয়াতের দাদার সাথে আর কথা হয়নি। তিনি কি পত্রিকা অফিসে গিয়েছিলেন! না-কি যাননি সেটাও জানি না। আমাদের এই দুইবার কথোপকথনের কয়েকদিন পরই জানতে পারলাম আয়াতের লাশ ৬ টুকরো করে সাগরপাড়ে ফেলে দেয় খুনি। এবং সেখান থেকেই নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়। এই অপরাধবোধ হচ্ছে, মানুষের জন্য কিছু করতে না পারার। মানসিক যন্ত্রণায় আমি লিখতেও পারিনি এই ক’দিন।
দুই
আয়াত হত্যাকান্ডের পর যেভাবে চটকদার নিউজ করা হচ্ছে সেটা দেখে আমার কিছুটা রাগ লাগছিলো। পত্রিকায় কি মৃত মানুষকে নিয়ে নিউজ করলে বেশি লাভ? একটা পত্রিকার মাধ্যমে মানুষ যেভাবে জানবে সেভাবে আর কোনো মাধ্যমে প্রচার করা সম্ভব নয়। অথচ আয়াতের পরিবার সেই সহযোগিতা পাননি। আয়াতের নিখোঁজের প্রচারণা হয়েছে ফেসবুকে। এটা ফেসবুকেই ভাইরাল হয়েছে। আর ৬ টুকরোর সংবাদটা দিতে গণমাধ্যম তখন উঠেপড়ে লেগেছে। এই জায়গায় গণমাধ্যমের আরও বেশি ভূমিকা থাকা উচিত বলে আমি মনে করি। গণমাধ্যমের উপর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, নির্ভরতাকে যদি প্রাধান্য না দেওয়া হয় তবে সেটা গণমাধ্যমকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে। অনেকেই হয়তো বলতে পারেন, গণমাধ্যমে সংবাদ হলেও কি হতো! আয়াত ততদিনে মৃত। কিন্তু আয়াত মৃত এই তথ্য আমরা কিংবা আয়াতের পরিবার কেউ-ই জানি না। আমরা একটা জীবত, সুস্থ আয়াতেরই অপেক্ষা করেছিলাম। ওই যে হুমায়ূন আহমেদের অপেক্ষা উপন্যাসের মতোই। যাইহোক সেই সহযোগিতা না পেলেও মৃত্যুর পর আয়াতের পরিবারের সাথে এখন গণমাধ্যম কর্মীদের নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে। সংবাদ হচ্ছে। লাশের টুকরো অংশগুলোও খুঁজে পাওয়া গেছে। এখানেও গণমাধ্যমের অবদান আছে। সেই অবদানটা শুরু থেকে হলে বেশ উপকৃত হতো আয়াতের পরিবার। অন্তত মনের শান্তিটা পেতো তারা।
তিন
আয়াতের হত্যা যে করেছে তার মতো পাশবিক মানুষ এই পৃথিবীতে আর কতজন আছে আমার জানা নেই। কিন্তু কতটা পাশবিক হলে এমনটা করা যায় সেটাই মাথায় আসছে না আমার। আমাদের সমাজে অমানবিকতা, পাশবিকতার পরিমাণ কতটা নিচে নেমে গেছে সেটা এই আয়াতের হত্যা দ্বারা বুঝা যাবে। একটা বেকার ছেলে অপহরণ করে টাকা দাবি করতে গিয়ে এমন একটা ফুটফুটে কন্যাকে হত্যা করে টুকরো টুকরো করে ফেললো! এটা ভাবতেই তো শরীর শিউরে উঠে। এই অমানুষগুলো আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখন ছড়িয়ে পড়ছে। জীবনে কিছু করার জন্য যারা অন্যেও বুকে চুরি চালায় তাদের সেই সফলতা দিয়ে কি হবে! অপহরণ করে টাকা নিয়ে সেই টাকা দিয়ে জীবন চালাবে এমন অবান্তর চিন্তা এই বিংশ শতাব্দীতে এসেও তৈরী হয় এটাও অদ্ভুত বিষয়। আমারা বোধহয় অবক্ষয়ের শেষ প্রান্তেই আছি। এরচেয়ে বেশি আর কীভাবে অমনিবিক, পাশবিক হওয়া যায় সেটা আমার ধরণা নেই।
পরিশেষে বলতে চাই, আয়াতের পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হোক। খুনিকে সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি দেওয়া হোক। সেইসাথে এমন ঘটনা যাতে ভবিষ্যতে না ঘটে সেই ধরনের সমাজ গঠনে আমাদের ভ‚মিকা রাখতে হবে। সচেতন থাকতে হবে পরিবারকে। কোনো ভাবেই আপনার সন্তানকে একা ছাড়বেন না। সেইসাথে আইনশৃংখলা বাহিনীর আরও দ্রুত এই ধরনের ঘটনাগুলো সমাধানে ভূমিকা রাখতে হবে। যত দ্রুত কাজটা করা যায় তত দ্রুত ভিকটিম বেঁচে যেতে পারে। নয়তো আসামী ধরা পড়লেও এভাবে আয়াতদের খন্ড-বিখন্ড লাশ দেখতে হবে।

লেখক : প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক