যাত্রী বাড়ছে, কমছে বাস

34

নগরীতে প্রায় ৫০ লক্ষ জনসংখ্যার বসবাস হলেও চলাচলের একমাত্র মাধ্যম ছিল সিটি বাস সার্ভিস। উন্নত বিশ্বে সিটি বাসের মাধ্যমে চলাচল করলেও চট্টগ্রামে তার ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা গেছে। দিন দিন জনসংখ্যা বাড়তে থাকলেও এখন কমছে বাসের সংখ্যা। আঞ্চলিক ট্রান্সপোর্ট কমিটি (আরটিসি) এবং মেট্রোপলিটন এলাকার যাত্রী ও পণ্য পরিবহন কমিটির নির্দেশনায় দেখা গেছে, নগরীতে বাস চলাচলের নির্ধারিত সিলিং রয়েছে ১ হাজার ৫৪৫টি কিন্তু রুটগুলোর মধ্যে বাস চলাচলের অনুমোদন পেয়েছে ১ হাজার ১৭৫টি। এরমধ্যে সবগুলো মিলিয়ে সর্বোচ্চ ৫৫০টি বাস চলাচল করছে।
জানা গেছে, চালকদের প্রতিযোগিতা ও ভুলের কারণে মামলা হলেও জরিমানা প্রদান করতে হচ্ছে মালিকদের। তাই অনেক মালিক এখন পরিবহন ব্যবসা থেকে অন্য ব্যবসায় চলে যাচ্ছেন। নতুন সড়ক পরিবহন আইনে অতিরিক্ত জরিমানার প্রভাবে গাড়ির প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন বলে জানান পরিবহন মালিকরা।
কিন্তু পুলিশ বলছে ভিন্ন কথা, পুলিশের দাবি- সড়ক পরিবহন আইন শুধু বাসের জন্য নয়, সকল ধরনের পরিবহনের জন্য। আর সুশৃঙ্খল থাকলে পুলিশ কোন পরিবহনকে হয়রানি করে না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কর্ণফুলী সেতু হতে নিউ মার্কেট পর্যন্ত ১নং রুট। রুটের দূরত্ব ১০ কিলোমিটার। রুটের বাসগুলো কর্ণফুলী সেতু-রাজাখালী-কালামিয়া বাজার-রাহাত্তারপুল-নতুন চান্দগাঁও থানা-বহদ্দারহাট-কাপাসগোলা-চকবাজার-সিরাজউদ্দৌলা রোড-আন্দরকিল্লা-লালদিঘী হয়ে নিউমার্কেট মোড় পর্যন্ত গিয়ে রুট শেষ করে একই পথে ফিরে আসবে। এ রুটে সিলিং রয়েছে ১০০টি এবং রুট পারমিট হয়েছে ৪৩টি বাস। কিন্তু রুটে একটি বাসও চলাচল করে না।
কালুরঘাট সেতু হতে নিউ মার্কেট পর্যন্ত ২নং রুট। রুটের মোট দূরত্ব ১৪ কিলোমিটার। রুটের বাসগুলো কালুরঘাট ব্রিজ-ইস্পাহানি মসজিদ-কাপ্তাই রাস্তার মাথা-সিএমপি রাস্তার মাথা-শারাফাত পেট্রোল পাম্প-বাস টার্মিনাল-বহদ্দারহাট পুলিশ বক্স-মুরাদপুর-ষোলশহর ২নং গেট-মেডিকেল-চকবাজার-জামালখান-আন্দরকিল্লা-লালদিঘী জেল গেট হয়ে নিউ মাকেট মোড়ে শেষ করে একই পথে ফিরে আসবে। এ রুটে সিলিং রয়েছে ৭৫টি এবং রুট পারমিট হয়েছে ৪৫টি বাস। কিন্তু সকাল বেলায় ৩ থেকে ৪টি চললেও বাকিগুলো চলে না।
নিউ মার্কেট হতে ফতেয়াবাদ পর্যন্ত ৩নং রুট। রুটের মোট দূরত্ব সাড়ে ১৪ কিলোমিটার। রুটের বাসগুলো নিউ মার্কেট-তিন পোলের মাথা-এনায়েত বাজার- বৌদ্ধ মন্দির-কাজীর দেউড়ী-ওয়াসা-ষোলশহর ২নং গেট-মুরাদপুর-হামজারবাগ-অক্সিজেন-বালুছড়া-নন্দীর হাট-ফতেয়াবাদ শেষ করে একই পথে ফিরে আসবে। এ রুটে সিলিং রয়েছে ১০০টি এবং রুট পারমিট হয়েছে ১০০টি বাস। এমনকি এ রুটের সব বাসই চলাচল করতে দেখা গেছে।
টাইগারপাস হতে ভাটিয়ারি পর্যন্ত ৪নং রুট। রুটের মোট দূরত্ব ১৫ কিলোমিটার। রুটের বাসগুলো টাইগার পাস-ওয়াসার মোড়-গরীবউল্লাহ মাজার-ওয়ারলেস কলোনি-ইউএসটিসি-এ কে খান-কর্নেল হাট-সিটি গেট-ফৌজদারহাট-বানুর বাজার-বিএমএ গেট-ভাটিয়ারি শেষ করে একই পথে ফিরে আসবে। এ রুটে সিলিং রয়েছে ১৫০টি এবং রুট পারমিট হয়েছে ১৩২টি বাস। তবে ৩০ থেকে ৩৫টি বাস ছাড়া বাকিগুলো চলে না।
লালদিঘী মোড় হতে বিমানবন্দর পর্যন্ত ৫নং রুট। রুটের মোট দূরত্ব ১৮ দশমিক ৬ কিলোমিটার। রুটের বাসগুলো লালদিঘী-নিউ মার্কেট-মাদারবাড়ি-বারেক বিল্ডিং-ফকিরহাট-নিমতলা ব্রিজ-সল্টগোলা-ইপিজেড-বন্দরটিলা-সিমেন্ট ক্রসিং-ফ্লেটিলা-স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল-ড্রাইডক-কয়লার ডিপু হয়ে বিমানবন্দর শেষ করে একই পথে ফিরে আসবে। এ রুটে সিলিং রয়েছে ৭৫টি এবং রুট পারমিট হয়েছে ৭৫টি বাস। তবে ৩০ থেকে ৩৫টি বাস চললেও বাকিগুলো চলে না।
লালদিঘী হতে সি-বিচ পর্যন্ত ৬নং রুট। রুটের মোট দূরত্ব ১৬ দশমিক ৬ কিলোমিটার। রুটের বাসগুলো লালদিঘীর পাড় হতে নিউ মার্কেট-টাইগার পাস-চৌমুহনী-বাদামতলী-বারিক বিল্ডিং-ফকির হাট-নিমতলা ব্রিজ-সল্টগোলা-ইপিজেড-বন্দরটিলা-সিমেন্ট ক্রসিং-স্টিলমিল বাজার-কাটগড়-সি বিচ শেষ করে একই পথে ফিরে আসবে। এ রুটে সিলিং রয়েছে ১৫০টি এবং রুট পারমিট হয়েছে ১৫০টি বাস। তবে ৮০ থেকে ৯০টি বাস ছাড়া বাকিগুলো চলে না।
কোতোয়ালী মোড় হতে ভাটিয়ারি পর্যন্ত ৭নং রুট। রুটের মোট দূরত্ব ১৬ দশমিক ১ কিলোমিটার। রুটের বাসগুলো কোতোয়ালি মোড়-নিউ মার্কেট-পুরাতন স্টেশন-টাইগার পাস-চৌমুহনী-বাদামতলী-জেলা পুলিশ লাইন-রাজমুকুট-ওয়াপদা গেট-নয়াবাজার-অলংকার-কর্নেলহাট-ফকিরহাট ব্রিজ-ফৌজদারহাট-বানুর বাজার-ভাটিয়ারি পর্যন্ত শেষ করে একই পথে ফিরে আসবে। এ রুটে সিলিং রয়েছে ১২৫টি এবং রুট পারমিট হয়েছে ১০৭টি বাস। তবে ৫৫ থেকে ৬০টি বাস চললেও বাকিগুলো চলে না।
নিউ মার্কেট হতে অক্সিজেন পর্যন্ত ৮নং রুট। রুটের মোট দূরত্ব ৮ কিলোমিটার। রুটের বাসগুলো নিউ মার্কেট-কদমতলী-টাইগারপাস-ওয়াসার মোড়-ষোলশহর ২নং গেট-রুবি গেট-শেরশাহ কলোনি-বায়েজিদ-অক্সিজেন পর্যন্ত শেষ করে একই পথে ফিরে আসবে। এ রুটে সিলিং রয়েছে ৭৫টি এবং রুট পারমিট হয়েছে ৩৯টি বাস। তবে ১৫ থেকে ১৬টি বাস চললেও বাকিগুলো চলে না।
কালুরঘাট হতে সি-বিচ পর্যন্ত ১০নং রুট। রুটের মোট দূরত্ব ২৫ কিলোমিটার। রুটের বাসগুলো কালুরঘাট-ইস্পাহানি মসজিদ-কাপ্তাই রাস্তার মাথা-বাস টার্মিনাল-বহদ্দারহাট-মুরাদপুর-ষোলশহর ২নং গেট-জিইসি-ইস্পাহানি মোড়-টাইগার পাস-চৌমুহনী-বাদামতলী-বারিক বিল্ডিং-ফকির হাট-নিমতলা ব্রিজ-সল্টগোলা-ইপিজেড-বন্দরটিলা-সিমেন্টক্রসিং-স্টিলমিল বাজার-কাটগড়-সি বিচ শেষ করে একই পথে ফিরে আসবে। এ রুটে সিলিং রয়েছে ২০৫টি এবং রুট পারমিট হয়েছে ১৯৭টি বাস। তবে ১১০ থেকে ১১৫টি বাস চললেও বাকিগুলো চলে না।
ভাটিয়ারি হতে সি-বিচ পর্যন্ত ১১নং রুট। রুটের মোট দূরত্ব ২৩ কিলোমিটার। রুটের বাসগুলো ভাটিয়ারি-বিএম গেট-বানুর বাজার-ফৌজদার হাট- ফকিরহাট ওভারব্রিজ-সিটি গেট-কর্নেল হাট-অলংকার-নয়াবাজার-ওয়াপদা গেট-বড়পোল-নিমতলা-কাস্টম-সল্টগোলা-ইপিজেড-বন্দরটিলা-সিমেন্টক্রসিং-স্টিলমিল বাজার-কাটগড়-সি বিচ শেষ করে একই পথে ফিরে আসবে। এ রুটে সিলিং রয়েছে ১২৫টি এবং রুট পারমিট হয়েছে ১২৫টি বাস। তবে ৮০ থেকে ৮৫টি বাস চললেও বাকিগুলো চলে না।
নিউ মার্কেট জিপিও হতে চন্দনাইশ বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ১৩নং রুট। রুটের বাসগুলো জিপিও-পটিয়া-বিজিসি ট্রাস্ট শেষ করে একই পথে ফিরে আসবে। এ রুটে সিলিং রয়েছে ৩০টি এবং রুট পারমিট একটিরও হয়নি। তাই কোন বাস চলে না।
কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে সি-বিচ পর্যন্ত ১৪নং রুট (প্রিমিয়ার ট্রান্সপোর্ট)। রুটের বাসগুলো কাপ্তাই রাস্তার মাথা-বাস টার্মিনাল-বহদ্দারহাট-মুরাদপুর-ষোলশহর ২নং গেট-জিইসি-ইস্পাহানি মোড়-টাইগার পাস-চৌমুহনী-বাদামতলী-বারিক বিল্ডিং-ফকির হাট-নিমতলা ব্রিজ-সল্টগোলা-ইপিজেড-বন্দরটিলা-সিমেন্টক্রসিং-স্টিলমিল বাজার-কাটগড়-সি বিচ শেষ করে একই পথে ফিরে আসবে। এ রুটে সিলিং রয়েছে ২০টি এবং রুট পারমিট হয়েছে ৪টি বাস। তবে একটিও চলে না।
কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে সি-বিচ পর্যন্ত ১৫নং রুট (মেট্রো প্রভাতী)। রুটের বাসগুলো কাপ্তাই রাস্তার মাথা-বাস টার্মিনাল-বহদ্দারহাট-মুরাদপুর-ষোলশহর ২নং গেট-জিইসি-ইস্পাহানি মোড়-টাইগার পাস-চৌমুহনী-বাদামতলী-বারিক বিল্ডিং-ফকির হাট-নিমতলা ব্রিজ-সল্টগোলা-ইপিজেড-বন্দরটিলা-সিমেন্ট ক্রসিং-স্টিলমিল বাজার-কাটগড়-সি বিচ শেষ করে একই পথে ফিরে আসবে। এ রুটে সিলিং রয়েছে ৫৫টি এবং রুট পারমিট হয়েছে ৫৫টি বাস। তবে এ রুটে সব বাস চলে।
কুয়াইশ থেকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত ১৬নং রুট। রুটের বাসগুলো কুয়াইশ কানেক্টিং রোডের মুখ থেকে অক্সিজেন কেডিএসের সামনে-ষোলশহর ২নং গেট ফ্লাইওভার-লালখানবাজার-টাইগারপাস-বাদামতলী-কাস্টমস মোড়-ইপিজেড-সিমেন্ট ক্রসিং-গুপ্তখাল-পদ্মা, মেঘনা, যমুনা-লালদিয়ার চর-এয়ারপোর্ট শেষ করে একই পথে ফিরে আসবে। এ রুটে সিলিং রয়েছে ৩০টি তবে একটি বাসেরও রুট পারমিট হয়নি। তাই কোন বাস চলে না।
নিমতলা থেকে বড় দারোগার হাট পর্যন্ত ১৭নং রুট। রুটের বাসগুলো নিমতলা-বড়পোল-অলংকার-ভাটিয়ারি-কুমিরা-সীতাকুন্ড-বড় দারোগার হাট শেষ করে পুনরায় একই পথে ফিরে আসবে। এ রুটে সিলিং রয়েছে ৩০টি এবং রুট পারমিট হয়েছে ২০টি বাসের। তবে বাসগুলো অলংকার মোড় হতে চলে।
এছাড়া ইপিজেড রিজার্ভ স্টাফ সার্ভিসের সিলিং রয়েছে ২০০টি এবং রুট পারমিট হয়েছে ৯৩টি বাসের। অনুমোদিত সব বাস চলাচল করে।
বাস কমিয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে নগরীর লুসাই পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম শমু জানান, ২০১৮ সালে নতুন সড়ক পরিবহন আইন করায় মামলা ও জরিমানার পরিমাণ বাড়ার ফলে পরিবহন ব্যবসা থেকে সরে এসেছেন অনেকেই। এছাড়া নগরীতে ছোট গাড়ির পরিমাণ বাড়ার কারণে বাসের চাহিদা কমে গেছে। তাই অনুমোদন থাকা স্বত্তে¡ও বাস পরিচালনায় মালিকরা অত আগ্রহী নন।
মেট্রোপলিটন পরিবহন মালিক গ্রূপের মহাসচিব বেলায়েত হোসেন বেলাল বলেন, পরিবহনে এখন কেউ বিনিয়োগ করতে চান না। আর বর্তমানে গাড়ির ব্যবসায় আয় হচ্ছে না। যা আয় হয়, তা মামলা-মোকাদ্দমায় চলে যাচ্ছে।
সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ড. মুহাম্মদ মাসুম চৌধুরী বলেন, নগরীতে দিন দিন জনসংখ্যা বাড়ছে। সে তুলনায় কোন বাস বাড়ছে না। উন্নত বিশ্বে সরকার ভর্তুকি দিয়ে হলেও গণপরিবহন তথা বাস সার্ভিস চালু রাখে। কিন্তু আমাদের দেশে তা নেই বললেই চলে। তবে জনসাধারণের উচিত গণপরিবহন ব্যবহার করে ট্রাফিক ব্যবস্থায় সুশৃঙ্খল ফিরিয়ে আনা।
চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (যানবাহন) শ্যামল কুমার নাথ দৈনিক পূর্বদেশকে জানান, কাউন্টার ভিত্তিক বাস সার্ভিস পরিচালনার জন্য আমরা উদ্বুদ্ধ করছি। যত্রতত্র পার্কিং না করে নির্দিষ্ট স্থানে পার্কিং করলে পুলিশ মামলা বা কোন প্রকারের হয়রানি করবে না। তাই পরিবহন চালক-মালিককে অনুরোধ করবো ট্রাফিক আইন তথা সড়ক আইন মেনে বাস পরিচালনা করতে।
তিনি আরও জানান, আশা করবো বাসগুলো যেন শুরুর পয়েন্ট থেকে শেষ পয়েন্ট (গন্তব্য) পর্যন্ত যাবে। মাঝপথ থেকে ঘুরিয়ে নিবে না। এছাড়া চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, সিডিএ এবং ওয়াসার কাজের জন্যও সড়কে বাস চলতে অসুবিধা হয়। তাই সেবা সংস্থাও যেন সেদিকে খেয়াল রাখেন তার অনুরোধ করছি। সড়কে শৃঙ্খলতা ফিরে আসলে বন্দর নগরী এবং পর্যটন নগরীর প্রকৃত রূপ ফিরে পাবে।