অধ্যাপক মেজর (অব.) নূরুল কুতুবী
প্রতি বৎসরের ন্যায় এ বছর ও ৩০তম ২৯ এপ্রিল আমাদের সামনে উপস্থিত। প্রতি বছর ২৯ এপ্রিল যখন আসে তখন সেদিন স্বজনহারাদের দীর্ঘশ্বাস ও বিলাপে উপকূল অঞ্চলগুলো থমথমে হয়ে উঠে। অসংখ্য বাবা-মা তার সন্তানের খোঁজে পায়চারি করেন সেই সাগরপাড়ে। নির্মম প্রাকৃতিক দুর্যোগ তাড়িত সর্বনাশা সাইক্লোন অনেকেরই সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে সচ্ছল জীবন থেকে রাতারাতি পথের ফকির বানিয়েছে। সেই প্রলয়, ভয়াল ঘূর্ণিঝড়ের স্মৃতিজড়িত ব্যথা জাগানিয়া মাস এখনও মানুষকে ব্যথিত করে। ঘূর্ণিঝড়ের তান্ডবে মুহূর্তেই মাটির সঙ্গে মিশে যায় তিল তিল করে গড়ে তোলা সাজানো গোছানো সংসার। এপ্রিলের এ দিনটি বঙ্গোপসাগরের তীরের বাসিন্দাদের মাঝে স্বজন হারানোর দিন। তারা এখনও লোনা পানিতে স্বজনদের লাশের গন্ধ পায়। তাই ২৯ এপ্রিল মানে উপকূলীয় এলাকার ১৯টি জেলার উপর বয়ে যাওয়া এক মহা প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের কাহিনী, ২৯ এপ্রিল মানে মানে দু’লাখ বনি আদমের প্রাণ নাশের করুণ ইতিহাস, ২৯ এপ্রিল মানে অসহায় শিশুর আর্তনাদ আর বৃদ্ধ-বৃদ্ধার করুণ এ চিৎকার এবং ২৯ এপ্রিল মানে উপকূলীয় বেড়িবাঁধ, বসতবাড়ি, গবাদিপশু, সমস্ত গাছপালা ধ্বংস হয়ে যওয়ার করুণ ইতিহাস। আর তাই ২৯ এপ্রিল,৯১ এর করুণ কাহিনী সম্পর্কে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অবগত করার দায়িত্ব ও কর্তব্য মনে করে প্রতি বছরের ন্যয় এ বছরও ২৯ এপ্রিল সম্পর্কে পত্রিকায় দু’চারটি কথা লিখার চেষ্টা করছি। 
সবুজে-শ্যামলে, হরিতে-হিরণে সুন্দর এই পৃথিবীর মানচিত্রে ছোট্ট একটি দেশ- বাংলাদেশ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সসত্য যে লাল-সবুজের এই দেশটির ৪৭২০১ বর্গ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল- একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের লীলাভূমি অন্যদিকে সম্ভাবনাময় অঞ্চল হিসেবে আখ্যায়িত। ভৌগলিক অবস্থানগত কারণেই প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেন এদেশের মানুষের নিত্যসঙ্গী, দেশটি নদীবাহিত পলিমাটিতে তৈরি একটি বদ্বীপ। বিশাল গঙ্গা-যমুনা-মেঘনার প্রবাহ মিলিয়ে সাতশত নদী বয়ে গেছে এদেশের উপর দিয়ে। তার ওপর এদেশের দক্ষিণাংশ জুড়ে রয়েছে বঙ্গোপসাগর- যার আকার অনেকটা ওলটানো ফানেলের মতো। ফলে সাগরে ঝড় উঠলেই প্রবল দক্ষিণা হাওয়ার তোড়ে: সমুদ্রের লোনা পানির উঁচু হয়ে উঠে পড়ে নিচু উপক‚ল ডিঙিয়ে। এতে সৃষ্টি হয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বন্যা, ঝড় ঝঞ্ঝা, টর্নেডো, সাইক্লোন- তার সঙ্গে নদীভাঙন জলোচ্ছ্বাস ও জমিতে লবণাক্ততার আক্রমণ এসব প্রায় প্রতিবছর লেগেই আছে। এমনি নানা দুর্যোগ এদেশের মানুষের জীবনকে তাদের সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্নকে তছনছ করে দেয়। যে সব প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশে অধিক হারে পরিলক্ষিত হয় তার মধ্যে রয়েছে- ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, নদীভাঙন, ভূমিকম্প, ভূগর্ভের পানিতে আর্সেনিক, পানিতে লবণাক্ততা, টর্নেডো, ভূমিক্ষয় ইত্যাদি। হারিকেনের প্রাবল্য নির্ভর করে সমুদ্র পৃষ্ঠের তাপমাত্রার উপর। গত একশ বছরে বাতাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। এই গ্যাস ভূ-পৃষ্ঠ থেকে বিকীর্ণ উত্তাপ শক্তি শোষণ করে আবহাওয়ার তাপমাত্রা বাড়ায়। দেখা গেছে এর ফলে আগের তুলনায় আবহাওয়ার গড় তাপমাত্রা বেড়েছে। আর এই তাপমাত্রার বৃদ্ধি দরুণ জলের বাষ্পীভবনের মাত্রাও বেড়েছে। আকস্মিকভাবে কোনো জায়গায় বাষ্পীভবনের মাত্রা বাড়লে সেখানে শূন্যতার সৃষ্টি হয় এবং সেই শূন্যতা থেকে ক্রমান্বয়ে বাতাস ঘূর্ণিপাক খেতে খেতে হারিকেনের সৃষ্টি হয়। বাতাসে সে হারে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ছে সে হারে চলতে থাকলে বিংশ শতাব্দীর শেষে উষ্ণমন্ডলীয় অঞ্চলে হারিকেনের প্রাবল্য বাড়বে ৫০ শতাংশের মত। মেক্সিকো উপসাগর, বঙ্গোপসাগর প্রভৃতি অঞ্চলে এমনিতেই হারিকেনের প্রাবল্য বেশি। প্রতি বছর এই সব অঞ্চলে ঘটে বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়। সেসব ঝড়ের প্রকৌপে উপকূলবর্তী অঞ্চল গুলিতে প্রাণহানি এবং সম্পত্তির ক্ষতি ঘটে বিস্তর।
ঘুর্নিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস এর কারণ ইতোপূর্বে বহু কল্প কথা ছিল। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে এর কারণ সম্পর্কে বিজ্ঞান ভিত্তিক ব্যাখ্যা এসেছে। পরিবেশবাদী বিজ্ঞানীদের মতে এ দুর্যোগের অন্যতম কারণ হচ্ছে- সমুদ্রের নিম্নস্থলে ভূমিকম্পের সৃষ্টি, সমুদ্রগর্ভের লুকানো আগ্নেয়গিরি বিস্ফোরন, সমুদ্রের তলদেশ অগভীর হয়ে যাওয়া, গ্রীষ্ম-মন্ডলীয় সমুদ্রে বিভিন্ন বায়ুর উথাল-পাতাল সংমিশ্রণে সৃষ্ট নিম্নচাপ ও বিভিন্ন কারণে পৃথিবীর ওজোনস্তরের ক্ষতি হয়ে ভূমন্ডল উত্তপ্ত হওয়ায় এ দুর্যোগের সৃষ্টি। বাংলাদেশ একটি আর্দ্র-উষ্ণ মন্ডলীয় দেশ। এর উপকুল রেখা হচ্ছে মোচাকৃতির যা দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর ছুঁয়ে আছে। এ ধরনের প্রাকৃতিক অবস্থান সাইক্লোন বা ঘূর্ণিঝড়ের উৎস ভূমি হিসেবে খ্যাত। অনেকে বাংলাদেশকে ঘূর্ণিঝড়ের অবতরণস্থল বলে মনে করেন।
তাই কুতুবদিয়াসহ চট্টগ্রামের পুরো উপকূলীয় এলাকাকে ঘূর্ণিঝড় বা সাইক্লোনের অবতরণস্থল বা জলোচ্ছ্বাসের লীলাভূমি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একদিকে হিমালয় পর্বতমালা ও অন্যদিকে মায়ানমার, থাইল্যান্ডের পর্বতরাজির মাঝখানে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকাসমূহ ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হয় প্রায় বছরই। তাই হিসাবে দেখা যায়- বিগত ২০০ বছরে (১৭৯৪-১৯৯৯৮) বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় সাতলাখ মানব সন্তানের মৃত্যু ঘটেছে। সাধারণত ঘূর্ণিঝড়ের একমাত্র সময় হল- এপ্রিল হতে নভেম্বর মাস পর্যন্ত। সে নিরিখে হিসেবে দেখা যায় ১৬৮৪ সালের মে মাসে এক সামুদ্রিকঝড় প্রবাহিত হয়েছিল যার পানির উচ্চতা ছিল বিশ থেকে ত্রিশ ফুট। ১৭৭০ সালের মে মাসে ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে কর্ণফুলী নদীর মোহনা থেকে মেঘনা নদীর মোহনা পর্যন্ত বিস্তৃত জনপদ ধ্বংস করে দিয়েছে। ১৮২২,১৮২৫ ও ১৮৪৮ সালের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ¡াসগুলোর সব কটিই হয়েছিল মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে। ১৮৬৭ ও ১৮৭৬ সালের ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাস ছিল সর্বাধিক ভয়াবহ। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর সেই ভয়াল ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে আক্রান্ত হয়েছিল ৮১০০ বর্গ কি:মি: এলাকা, মৃত্যু হয়েছিল প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের, ধ্বংস হয়েছিল চার লাখ ঘরবাড়ি। এছাড়া ৩৫০০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ২০০০০ হাজার মাছ ধরার নৌকা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
কুতুবদিয়ায় ভয়াল ২৯ এপ্রিলের শুরু হওয়া ঝড়ের করুণ চিত্র: সকাল থেকে মেঘাচ্ছন্ন আকাশ গুমোট আবহাওয়া বিরাজ করছে। সকাল দুপুর হতে হালকা বৃষ্টিসহ বায়ুপ্রবাহ শুরু হয়েছে। রাতেই এটি অগ্নীমূর্তি ধারণ করে, রাত ৯টার দিকে চূড়ান্তভাবে শুরু হয় ঝড়। এদিকে দ্বীপের খেটে খাওয়া ক্লান্ত-শ্রান্ত মানুষগুলো নিবিড় প্রশান্তিতে ঘুমুচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ এ কোন প্রলয়ের মহাগর্জন ? ঘুম ভেঙে যায় সকলের ? মুহূর্তের মধ্যেই দেখতে পায় প্রচন্ড গর্জনে সমুদ্রের প্রবল উচ্ছ্বাস তীব্র বাতাসের ভেলায় চড়ে দারুণ রুদ্র রোষে ফুলে ফেঁপে উঠে। দিশেহারা সাহসী মানুষগুলো ছুটতে থাকে এদিক সেদিক। অপ্রস্তুত মানুষেরা যে যার সাধ্যমত নিজের শেষ আশ্রয় বাঁচানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। ইতোমধ্যে গাছের ডালপালাসহ ঘরবাড়ি ভাংতে শুরু করেছে, কাগজের মতো উড়ছে ঘরের টিন, অনেকে আহত হচ্ছে, অনেকে মারা যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত সবকিছুকেই পরাজিত করে রাক্ষুসী জলোচ্ছ¡াসের প্রবল আক্রোশে কেড়ে নিয়ে গেল কুতুবদিয়া দ্বীপের বিশ হাজার মানুষের প্রাণ।
কুতুবদিয়া দ্বীপের রাতের দৃশ্য : পুরোদমে ঝড় শুরু হয়েছে রাত ১২টার দিকে, অনেক কাঁচাবাড়ি ভেসে গেছে, অনেক ঘরবাড়ি উড়ে যাচ্ছে। বাতাসের বেগের সাথে মিশে যাচ্ছে মানুষের আর্ত চিৎকার, শিশু-নারী-পুরুষের কান্না। অনেকে বাড়ির অক্ষত স্থানে চালের সাথে মাঁচা ঝুলিয়ে ছেলে- মেয়েদের ঘুমিয়ে রেখে আবাসস্থলকে বাঁচানোর সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে সহায়হীন অবস্থায় সকলের অজান্তে সুউচ্চ ঢেউ নিয়ে তেড়ে আসল সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস। কুতুবদিয়াতে চতুর্দিক থেকে বঙ্গোপসাগরের জল এসে তাৎক্ষণিকভাবে এই দ্বীপকে ডুবিয়ে দিল। প্রায় ৬ ঘন্টার মত এ দ্বীপটি পানির নিচে ছিল। প্রকৃতির গর্জনে অসংখ্য মানুষের লাশ ভেসে আসছে পানিতে, অনেক নর-নারী ভেসে গেছে ঘুমন্ত অবস্থায়, অনেকের জীবন রক্ষার শেষ সংগ্রামকে ব্যর্থ করে দিয়েছে আয়ত্বহীন জলোচ্ছ্বাস, ভেসে যাচ্ছে মানুষ, ভেসে যাচ্ছে ঘরবাড়ি, ঝড় তুফানের গর্জন আর শিশু নারীর কান্নায় একাকার হয়ে যাচ্ছে- শুনার মত কেউ নেই।
দ্বীপের ঝড়ের পরের দৃশ্য: ভোরের দিকে শেষ হয়ে এসেছে ঝড়। সরে গেছে জলোচ্ছ্বাসের পানি, গরু মহিষসহ, শিশু, নারী, পুরুষের লাশ পড়ে আছে যত্রতত্র, বিভিন্ন বাড়ির মূল্যবান পণ্যসামগ্রী এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে উপকূলে। সর্বত্র হাহাকার কেউ কারোর খোঁজ নেয়ার মত মানুষ নেই। সর্বত্র এক প্রকারের অমানবিকতা বিরাজ করছে। উপকূলে সমুদ্র সৈকতে লাশের খোঁজে বেরিয়েছে স্বজনেরা, বাতাসে লাশের গন্ধ, যারা বেঁচে আছেন তারাও আক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে নানা রোগে, কিন্তু কোথাও ঔষধসহ নিত্য-প্রয়োজনীয় দ্রব্য নেই। খোলা আকাশের নিচে বসতি গড়ছে মানুষেরা। কুতুবদিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৪,৮০০ একর কৃষিজমি, ১৮,০০০ পরিবার বা ৮০,০০০ দ্বীপবাসী গৃহহারা হয়েছে। সর্বোপরি স্কুল, কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা বিনাশ হয়ে গেছে। সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয়ে গেছে ৩৭কি.মি দীর্ঘ উপকূলীয় বেড়ী বাঁধ। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে অভ্যন্তরীণ রাস্তা-ঘাট-সেতু কালভার্ট। গাছপালা বলতে তেমন কোন-কিছু অবশিষ্ট ছিলনা। চারদিকে শুধু ধু ধু প্রান্তর আর স্বজনহারাদের আহাজারী।
দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি: দেশের অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা গভীরভাবে পর্যালোচনা করে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের হাত হতে পরিত্রাণ পাওয়ার কিছু প্রস্তাব প্রদান করেছেন।
১. প্রাকৃতিক দুর্যোগকে স্থায়ীভাবে প্রতিরোধকরণ: প্রাকৃতিক দুর্যোগকে স্থায়ীভাবে প্রতিরোধ করতে হলে অত্যাধুনিক সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ, মাটির কিল্লা নির্মাণ, উপকূলীয় অঞ্চলে স্থায়ী ও নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মাটির বাঁধ নির্মাণ, বনায়ন, পাঠ্যসূচিতে দুর্যোগ সংক্রান্ত অধ্যায় সংযোজন, দুর্যোগ প্রতিরোধ অধিদপ্তর গঠন, দুর্গত এলাকাকে জোনে বিভক্ত করণ, এক বা একাধিক ভূ-গর্ভস্থ সংরক্ষণাগার তৈরি করণ, হেলিপোর্ট নির্মাণ।
২. দুর্র্যোগ পূর্বকালীন অবস্থা: রাডারের মাধ্যমে আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা দুর্যোগ সম্পর্কে খবর পাওয়ার সাথে সাথেই সকল চিহ্নিত দুর্যোগ এলাকার জনগণের কাছে দুর্যোগ সম্পর্কে সকল খবরাখবর সরকারি বেসরকারি প্রচারের মাধ্যমে জনগণের নিকট অতিসত্তর পৌঁছে দেয়া উচিত যাতে সকল জনগণ সচেতন হয়।
উপদ্রুত এলাকা যেন কখনো মূল ভূখন্ড বা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগচ্যুত না হয় সে ব্যবস্থা করতে হবে। এ ব্যবস্থার রেড ক্রিসেন্টসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ সমূহকে আধুনিক প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলতে হবে। যার ফলে আগাম সংবাদ প্রচারের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণকে সচেতন করা সহজ হবে।
৩. দুর্যোগের সময় অবস্থা: দুর্যোগের সময় হেলিকপ্টার বা অন্যান্য যানবাহনের মাধ্যমে দুর্যোগ এলাকার জনগণ ও গবাদি পশুকে খুব দ্রুত গতিতে নির্মিত সাইক্লোন শেল্টার, মাটির কিল্লা এবং অন্যান্য এলাকাতে আনতে হবে।
৪. দুর্যোগ পরবর্তী সময়কার অবস্থা:
(ক) দুর্গত এলাকার সকল মৃত দেহকে মাটির নিচে রেখে ঐ এলাকাকে নিরাপদ রাখতে হবে। (খ) দুষিত পানি ও লবণাক্ত পানি দূর করার ব্যবস্থা করা। এমনকি বিশুদ্ধ খাওয়ার পানির সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। (গ) অতিসত্তর বিধ্বস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিকরণসহ বিধ্বস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থাকে যোগাযোগ উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য সহজে বহনযোগ্য ও নির্মাণ যোগ্য সেতুর ব্যবস্থা করতে হবে। (ঘ) মাথা গুজার ঠাঁইয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। (ঙ) জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য সামগ্রী, ঔষধ, ব্যবহারের জন্য কাপড় ও অন্যান্য জিনিসপত্র দুর্গত এলাকার জনগণের নিকট সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। (চ) দুর্যোগ পরবর্তীকালে দুর্যোগ মোকাবিলা করার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনীর, বিমান বাহিনী, বিএনসিসি, রভার স্কাউট ও আনসার বাহিনী কর্তৃক গঠিত ‘দুর্যোগ মোকাবিলা কর্মবাহিনী’ গঠনের মাধ্যমে দুর্গত এলাকার জনগণের মাঝে ত্রাণ সরবরাহের ব্যবস্থা ও অন্যান্য কাজের ব্যবস্থার নিশ্চিত করতে হবে। (ছ) দুর্গত এলাকার জনগণের নিকট সাহায্যের হাত বাড়ানোর জন্য দেশে অথবা বিদেশের সাহায্যের জন্য সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। উল্লেখ্য বিশ্বব্যাপী দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য জাতিসংঘ ১৯৯২ সালে মানবিক বিষয়ে সংক্রান্ত বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেছে।
এক কালে মানুষের ধারণা ছিল প্রকৃতির উপর যে কোন উপায়ে আধিপত্য প্রতিষ্ঠাই সবচাইতে জরুরি। আজ সে ধারণার পরিবর্তন ঘটেছে। কেননা দেখা যাচ্ছে, এই আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্যে বন ধ্বংস করে, নদীর প্রবাহ বন্ধ করে, পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট করে মানুষ নিজের জন্যে সমূহ বিপদ ডেকে এনেছে। তাই আজ প্রকৃতির ওপর আধিপত্য নয়, মানুষ গড়ে তুলতে চাইছে প্রকৃতির সঙ্গে মৈত্রীর সম্বন্ধ। আর চেষ্টা করছে প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রেখে প্রকৃতির সহায়তায় তার নিজের জীবন ধারাকে আগামী দিনের সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
লেখক: শিক্ষাবিদ, গবেষক



