সশস্ত্র লড়াইয়ের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে মিয়ানমারের জান্তাবিরোধীরা

0
সশস্ত্র লড়াইয়ের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে মিয়ানমারের জান্তাবিরোধীরা

 

জঙ্গল সাফ করে বানানো মাঠে কাদার মধ্যে বার্মিজ ভাষায় দেওয়া স্লোগানে ‘জনগণের জন্য’ লড়াই করতে প্রস্তুত শতাধিক তরুণ-তরুণীর ভোরের আলোয় জগিং করার একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে নামার ঘোষণা দেওয়া নতুন একটি বাহিনী। এর প্রতিষ্ঠাতাদের একজন মোন মোন জানিয়েছেন, ইউনাইটেড ডিফেন্স ফোর্স নামের এই বাহিনীটি বানানোই হয়েছে অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভকারীদের নিয়ে, দমনপীড়নের হাত থেকে বাঁচতে যারা পালিয়ে এসেছেন।
দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশটিতে গত ১ ফেব্রূয়ারি সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের পর শুরু হওয়া আন্দোলনে এখন পর্যন্ত কয়েকশ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
বিক্ষোভকারীদের মধ্যে অনেকে যে এখন মিয়ানমারের সীমান্ত এলাকাগুলোতে জাতিগত সশস্ত্র বিভিন্ন বাহিনীর কাছে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রকাশিত একাধিক ছবিতে তা-ই মনে হচ্ছে।
‘আমরা এখানে তিন মাসের সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে এসেছি, আমাদের সবারই একটাই লক্ষ্য, বিপ্লব। এখানে আসা বেশিরভাগেরই বয়স ২০ এর ঘরে, বেশিরভাগই ছাত্র। ৩৫, ৪০ বছরেরও অনেকে আছেন, তবে সবচেয়ে বেশি জেড প্রজন্মের’- বলেছেন মোন মোন।
গত শতকের শেষ দশকের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে চলতি শতকের প্রথম দশকে জন্ম নেওয়াদের অনেক গণমাধ্যমেই ‘জেনারেশন জেড’ বা ‘জেড প্রজন্ম’ ডাকা হয়।
মোন মোন নতুন বাহিনী হিসেবে ইউনাইটেড ডিফেন্স ফোর্সের আত্মপ্রকাশের কথা জানালেও বাহিনীটির কর্মকান্ডের ধরণ স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স। তাৎক্ষণিকভাবে এ প্রসঙ্গে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর প্রতিক্রিয়াও পাওয়া যায়নি।
মোন মোন জানিয়েছেন, এখন তাদের প্রশিক্ষণে ২০ নারীসহ প্রায় আড়াইশ জন অংশ নিচ্ছেন। মিয়ানমারজুড়ে তাদের সংগঠনের সদস্য প্রায় এক হাজার বলেও দাবি করেছেন তিনি।
তাদের এ সশস্ত্র প্রশিক্ষণ কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়ন (কেএনইউ) নিয়ন্ত্রিত একটি এলাকায় হচ্ছে, জানান এ নারী। খবর বিডিনিউজের
মিয়ানমারে বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে দশকের পর দশক ধরে লড়াই চালিয়ে যাওয়া দুই ডজন জাতিগত সশস্ত্র বাহিনীর একটি হচ্ছে কেএনইউ।
তাদের এলাকায় ইউনাইটেড ডিফেন্স ফোর্সের সদস্যদের প্রশিক্ষণ চলছে কিনা, তা স্বীকার বা অস্বীকার কোনোটিই করতে রাজি হননি কেএনইউ’র পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রধান পাদো সাও।
গতকাল মঙ্গলবার থাইল্যান্ডের সীমান্তের কাছে বিদ্রোহীদের সঙ্গে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ব্যাপক লড়াইয়েরও খবর পাওয়া গেছে। কেএনইউ জানিয়েছে, তারা ওই এলাকায় একটি সামরিক চৌকির দখল নিয়েছে। এ বিষয়েও তাৎক্ষণিকভাবে সেনাবাহিনীর কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
মোন মোন জানিয়েছেন, যে তরুণরা সামরিক প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, তাদের অনেকেই অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভের সামনের সারিতে ছিলেন; গুলতি, এয়ারগান আর হাতে বানানো ঢাল নিয়ে লড়েছিলেন যুদ্ধাস্ত্রে সজ্জিত সেনাদের বিরুদ্ধে।
অবশ্য তাদের দেওয়া ভিডিওতে ব্যায়াম ও শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের দৃশ্য থাকলেও অস্ত্র নিয়ে প্রশিক্ষণের কিছু দেখা যায়নি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
ভিডিওতে যুদ্ধের পোশাক পরা একজনকে তরুণদের ব্যায়ামের প্রশিক্ষণ দিতে দেখা গেছে। এসময় বেশিরভাগ প্রশিক্ষণার্থীর পরনেই ছিল কালো পোশাক।
‘কি করছো তোমরা?’ এমন প্রশ্নের জবাবে তরুণদের সম্মিলিতভাবে ‘আমরা প্রশিক্ষণ নিচ্ছি’ বলতে শোনা গেছে। ‘কেন করছো?’, ‘কাদের জন্য?’ এসবের উত্তর এসেছে- ‘যুদ্ধ করতে’, ‘জনগণের জন্য’।
প্রথম যে ১৫ জন এ সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়েছে তাদের মধ্যে নিজের বড় ছেলেও ছিল বলে জানিয়েছেন মোন মোন।
অনেকেই যেন দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে গিয়ে সেনাবাহিনীর ওপর আঘাত হানতে পারে, সেজন্য ১০ দিন থেকে শুরু করে তিন মাস পর্যন্ত নানান স্তরের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
‘১০ দিনে সাধারণ কিছু জিনিসের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তারা একত্রিত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া শিখতে পারবে এবং তিনটি বুলেট ছুড়তে পারবে। দেড় মাসের প্রশিক্ষণের মধ্যে বিস্ফোরক ও গুলির প্রশিক্ষণও আছে’- বলেছেন তিনি।
মোন মোন জানান, তাদের বাহিনীর সদস্য সংখ্যা খুব বেশি না হওয়ায় লড়াইয়ে বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী কিংবা জান্তাবিরোধী ‘জাতীয় ঐক্যের সরকারের’ সহযোগিতা দরকার হবে।
তাৎক্ষণিকভাবে এ প্রসঙ্গে ‘জাতীয় ঐক্য সরকারের’ কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া না গেলেও এর আগে তারা নতুন সেনাবাহিনী বানানোর ইচ্ছার কথা জানিয়েছিল।
‘আমরা এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়তে যাচ্ছি, কোনো দল বা কোনো ব্যক্তির হয়ে নয়’- বলেছেন মোন মোন।
ফেব্রূয়ারিতে মিয়ানমারে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের পর থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনে এখন পর্যন্ত অন্তত সাড়ে সাতশ বেসামরিকের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিকাল প্রিজনার্স।