ব্যাংকিং খাত নিয়ে গুজব থামছে না আস্থা ফেরাতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে

14

সরকারে শীর্ষ পর্যায় থেকে শুরু করে ব্যাংক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাংবাদিক সম্মেলন করে ব্যাংকের অবস্থা স্পষ্ট করার পরও স্যোশাল মিডিয়াগুলোতে গুজব ছড়ানো অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। কোন রকম সঠিক ও গ্রহণযোগ্য তথ্য উপাত্ত ছাড়াই এসব গুজব বা লেখালেখি ব্যাংকিং খাত নিয়ে গ্রাহকের মনে সন্দেহ বাড়িয়ে দিচ্ছে। যা দেশ ও জাতির জন্য মোটেও কল্যাণকর নয়। আমরা লক্ষ করছি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম ইত্যাদিতে ব্যাংকে অর্থ নেই, অনিয়মের মাধ্যমে ঋণ দেয়া হয়েছে, অর্থ সরিয়ে নেয়া হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া হচ্ছে ইত্যাদিতো আছে, অতি সম্প্রতি ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার গুজবও ছড়ানো হচ্ছে। স্থানীয় ও জাতীয় বিভিন্ন দৈনিকে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে এ জাতিয় গুজবের বিষয়ে উল্লেখ করে বলা হয়, স¤প্রতি কয়েকটি ব্যাংকের শত শত কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির খবর প্রকাশ পাওয়ায় ব্যাংকে টাকা জমা রাখা নিয়ে মানুষের মধ্যে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে ব্যাংকে টাকা নেই বা থাকবে না- এমন গুজবে আতঙ্কে ব্যাংক থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন গ্রাহকরা। গুজবের বড় কারণ হচ্ছে মুদ্রাস্ফীতি, তার সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য আকাশচুম্বীর ফলাফলে জীবনযাপনের ক্ষেত্রে একটা অনিশ্চয়তা। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ব্যাংকগুলোকে নিয়েও গুজবকারীরা তৎপর হয়ে উঠেছে। শোনা যাচ্ছে ব্যাংকে টাকা রাখা একেবারে নিরাপদ নয়, ব্যাংক আর টাকা দিতে পারবে না। কেউ কেউ ভয়ে ব্যাংক থেকে টাকাও তুলে নিচ্ছে। গুজবের মাত্রা এবং বাস্তব অবস্থা নিশ্চয়ই কিছুটা আতঙ্কিত হওয়ার মতো। সে কারণে বাংলাদেশ ব্যাংককে এ ব্যাপারে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জনগণকে আশ্বস্ত করার উদ্যোগ নিতে হয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, তেলের দাম বৃদ্ধিসহ বেশকিছু অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। যার প্রভাব পড়েছে দেশের ব্যাংকিং খাতেও। এতে সুযোগ নিচ্ছে একটি কুচক্রী মহল। নানা গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে ওঠেপড়ে লেগেছে ব্যাংকের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের মোট আমানত ১৪ লাখ ৮২ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা, যা আগের মাসের চেয়ে ১১ হাজার ১৫৬ কোটি টাকা বেশি। বর্তমানে মোট তারল্যের পরিমাণ ৪ লাখ ১৫ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা। অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ ১ লাখ ৬৯ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা। ব্যাংক খাতে তারল্যের সংকট নেই। তবে ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের নৈরাজ্য চলে আসছে। এরমধ্যে করোনা ও বৈশ্বিক মন্দার নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় ব্যাংক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তারপরও চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেল কেন- এ প্রশ্নের সদুত্তর খোঁজা জরুরি। সংকট মোকাবিলায় আইএমএফের কাছে সরকারের ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় খেলাপি ঋণের নীতিতে পরিবর্তন আনার তাগিদ দিয়েছে আইএমএফ। জানা গেছে, ১১ দশমিক ৪ শতাংশ খেলাপি ঋণ নিয়ে এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, গত ১০ বছরে দেশে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় সাড়ে চারগুণ। খেলাপি ঋণ না কমে বরং দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণ হলো, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেয়া। ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে বিষয়গুলোর প্রতি নজর দিতে হবে। এ খাতের এসব দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে গুজব প্রতিষ্ঠিত করছে। গুজব অনেক সময় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেও রটানো হয়। বিশেষ করে দেশে যখন একধরনের রাজনৈতিক সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টির প্রয়াস চালানো হচ্ছে, তখন এধরনের গুজব সন্দেহজনক। স্বার্থান্বেষী মহল নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য গুজব রটিয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা করে। আবার মানুষের অজ্ঞতা, অন্ধবিশ্বাস, গোঁড়ামি ইত্যাদি গুজব ছড়াতে সহায়তা করে। যে সমাজের মানুষের মধ্যে সঠিক জিনিসটি উপলব্ধির ক্ষমতা কম সে সমাজে গুজব তত দ্রæত রটে বা ছড়ায়। বিশেষ করে গুজব বর্তমানে দেশের অর্থনীতিকে, বিশেষ করে ব্যাংকের প্রতি মানুষের যে অনাস্থা তৈরি করেছে তার একটা দ্রæত সমাধান প্রয়োজন। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয ব্যাংক ও সরকারের পক্ষ থেকে আরো ব্যাপকভাবে ইতিবাচক প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। মনে রাখা প্রয়োজন মানুষের কষ্টের সঞ্চয় ব্যাংক ছাড়া কোথাও নিরাপদ নয়, একথা সাধারণ মানুষকে বুঝাতে হবে।