এমরান চৌধুরী
গত কয়েক বছর ধরে আমি একটি লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনা করে আসছি। লিটল ম্যাগাজিনের জন্য সবচেয়ে যে জিনিসটি বেশি প্রয়োজন তা হলো বিজ্ঞাপন । তেল ছাড়া যেমন গাড়ি চলে না, রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেলে মানুষের আয়ু যেমন নিমিষে নিঃশেষ হয়ে যায়, তেমনি লিটল ম্যাগাজিনের জন্যেও প্রয়োজন তেল বা রক্ত—সরল কথায় বিজ্ঞাপন। আর সেই বিজ্ঞাপন নামক সোনার হরিণের পিছু ছুটতে গিয়ে অনেক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসার সুযোগ হয়েছে আমার। হয়েছে অনেক অন্তমধুর অভিজ্ঞতা। একদিন সরকারি অফিসের একজন কর্মচারী জানতে পারেন, আমি চট্টগ্রামের একটি দৈনিকে নিয়মিত কলাম লিখে থাকি। এই সুবাদে তিনি আমাকে বললেন, ‘ আপনারা অনেক কিছুই লিখেন, রাস্তা (ফুটপাত) দখল করে এভাবে দোকানদারি সম্পর্কে কিছু লিখেন না কেন?’ আমি বিনয়ের সাথে তাঁকে বললাম, এসব নিয়ে তো হামেশাই সাংবাদিকরা লিখেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। হয়তো কোনো লেখালেখির প্রেক্ষিতে সাময়িকভাবে কোনো এলাকায় দু’একদিন হকার বসল না। কিন্তু সপ্তাহ না ঘুরতেই দেখা যাবে তথৈবচ। 
ভদ্রলোকের কথা রাখতে ২০১৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর এই বিষয়ে লিখেছিলাম। ঐ লেখাটির শিরোনাম ছিল ‘নাগরিকের অবাধ যাতায়াতের জন্য নির্ঝঞ্জাট ফুটপাত জরুরি।’ লিখেছিলাম, ‘চট্টগ্রাম শহরের দু একটা সড়ক ছাড়া এমন কোনো সড়ক নেই যেখানে ফুটপাত অবৈধ দখলে নেই। কোনো কোনো রাস্তায় ফুটপাতের সমস্ত অংশ জুড়ে থাকে হকার আর তার পসরা। শুধু ফুটপাত নয়, ফুটপাত ছাড়িয়ে যানবাহন চলাচলের জায়গায়ও চলে আসে এসব অবৈধ দখল। কোথাও মাছের বাজার, কোথাও তরিতরকারি, কোথাও ফলমূল, কোথাও জামা-কাপড়, কোথাও নেহেরি, কোথাও তেহেরি, কোথাও জুতা-সেন্ডেল, কোথাও শুঁটকি, কোথাও পেঁয়াজ-রসুন, কোথাও চায়ের দোকান। শীতকাল এলে এসবের সাথে যুক্ত হয় মোয়া-মুড়ি, ভাপাপিঠা আরও কত কী! চট্টগ্রাম শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে ফুটপাত থাকে হয় দোকানদারের দখলে, নয়তো হকারের দখলে। প্রশাসন যে এসব দেখেন না কিংবা এসব অবৈধ দখলের ওপর যে তাদের নজরদারি নেই তা বলা যায় না। মাঝে মাঝে এসব দখলদারের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয় উচ্ছেদ অভিযান। তবে তাদের পরিচালিত অভিযানের সুফল নগরবাসী বড়জোর দু’একদিনের বেশি পান না। দিন গড়িয়ে আবার সূর্য ওঠলেই দেখা যায় সে একই হাল হকিকত।
ফুটপাত মানে কী আর রাস্তা মানে কী—এদুটো শব্দের অর্থ বোঝেন না এমন মানুষ বোধ হয় নগরে নেই। ফুটপাত হচ্ছে নাগরিকের হাঁটার পথ আর রাস্তা হচ্ছে যানবাহন চলাচলের পথ। কিন্তু দুঃখের বিষয় আমাদের শহরে আমাদের নগরে ব্যস্ততম সড়কগুলোতে ফুটপাতের চিহ্নও অনেক সময় খুঁজে পাওয়া যায় না। যারা পায়ে হেঁটে স্কুল-কলেজে যায়, কিংবা কর্মস্থলে যাতায়াত করেন তাদের পড়তে হয় নানা অসুবিধায়। ফুটপাত না থাকায় ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের যে কোনো সময় দুর্ঘটনায় পড়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। সে সঙ্গে হাঁটার ধীর গতির কারণে অনেকে সময়মতো স্কুল-কলেজে, বড়রা কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারেন না। একারণে স্কুলের শিক্ষার্থীদের যেমন বকুনি খেতে হয়। তেমনি বড়দেরও কর্মস্থলে কৈফিয়ত তলবের মুখোমুখি হতে হয়। কর্মস্থলে অনেকেই বিলম্বের কারণ হিসেবে যানজটের কথা বলে থাকেন। কিন্তু এই যে যানজট তার জন্য বেশির ভাগই দায়ি ফুটপাত অবৈধ দখলে থাকা। আবার নগরীর বেশির ভাগ কিন্ডারগার্টেন, স্কুল-কলেজ, অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বড় বড় রাস্তার পাশে অবস্থিত। সেগুলো যখন ছুটি হয় কিংবা অফিস-আদালত শুরু বা ছুটির সময় সৃষ্টি হয় অসহনীয় যানজট। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এ অসহনীয় যানজটের মূলে রয়েছে রাস্তার একাংশ এবং ফুটপাতের অবৈধ দখল। ফুটপাতের অবৈধ দখলদারিত্বের কারণে শুধু যে পথচারীদের যাতায়াতে অসুবিধা হয় শুধু তাই নয়। প্রথমত : ফুটপাতে ব্যবসার কারণে মূল দোকানদার, যারা লক্ষ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করে দোকান নিয়েছেন তারা বিষমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকেন। তাদের দোকানে স্বাভাবিকভাবে ক্রেতারা প্রবেশ করতে পারেন না। ক্রেতাদের অবাধ যাতায়াত বিঘ্নিত হওয়ার কারণে অনেক দোকানদার নানাভাবে লোকসানের সম্মুখীন হয়ে থাকেন। দ্বিতীয়ত : অবৈধ দখল থেকে সৃষ্টি হয় যানজট, যানজট থেকে বায়ুদূষণ,শব্দ দূষণ সর্বোপরি কর্মসময়ের অপচয়।’
আগামী ২৭ জানুয়ারি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী, বন্দর নগরী ও বাণিজ্যিক রাজধানী নামে খ্যাত চটগ্রাম মহানগরীর মানুষ তাঁদের নতুন একজন নগর পিতা নির্বাচনের জন্যে ভোট দেবেন। এবারই প্রথম দলীয় প্রতীকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন হচ্ছে। শুধু তাই নয় ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়ায়ও আনা হয়েছে পরিবর্তন। ব্যালেটের পরিবর্তে এসেছে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম)। নারী ও পুরুষ মিলিয়ে এবারের ভোটারের সংখ্যা ১৯ লাখ ৩৮ হাজার ৭০৬ জন। মেয়র পদে প্রধান দুটো দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বাইরে আরও ৫ জন প্রার্থী প্রতিদন্ধিতা করছেন। সরকারি দল আওয়ামী লীগের হয়ে নৌকা প্রতীকে ভোটের লড়াইয়ে আছেন বীরমুক্তিযোদ্ধা এম রেজাউল করিম চৌধুরী, আর ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র প্রার্থী ডা. শাহাদাত হোসেন। আজকের পর মাঝখানে একটা দিন। এই দিন পেরোলেই চট্টগ্রাম মহানগরে বসবাসকারী মানুষেরা পাবেন একজন নগরপিতা। নগরের পিতা। পিতা শব্দটির অর্থ ও তাৎপর্য বহুদূর বিস্তৃত। সঙ্গতকারণে নগরের মানুষের সুখ দুঃখের অংশীদার হয়ে তাঁকে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যেতে হয়। পরশু মধ্য রাতের আগেই মহানগরের মানুষ জেনে যাবেন কে হয়েছেন আগামী পাঁচ বছরের জন্য নতুন নগর পিতা। মহানগরের সচেতন নারী-পুরুষ ভোটাররা যাঁকে যোগ্যতর মনে করবেন তাঁকেই ভোট দেবেন। যিনি সর্বাধিক ভোট পাবেন তিনিই নির্বাচিত হবেন এটাই গণতান্ত্রিক পদ্ধতি। আমরা চাই উৎসবমুখর পরিবেশে স্বাস্থ্যবিধি মেনে মানুষ ভোট কেন্দ্রে গিয়ে নিজ নিজ ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
নতুন মেয়র, নতুন নগর পিতার কাছে এই মহানগরের নানা শ্রেণির, নানা পেশার মানুষের নানা প্রত্যাশা থাকবে, থাকা স্বাভাবিক। মশামুক্ত, পরিস্কার পরিচ্ছন্ন, ঝলমলে আলো আর উন্নত রাস্তাঘাটের একটা মহানগর সবারই প্রত্যাশা। এসব প্রত্যাশার পাশাপাশি একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যাশা শুধু একটাই, তাহলো ফুটপাত দখলমুক্ত একটি মহানগর। আমরা সবাই জানি, ফুটপাত পথচারীদের, ব্যবসা বা অন্য কিছু করার জায়গা নয়। ফুটপাতে অবাধ চলাফেরার সুযোগ নিঃসন্দেহে নাগরিক অধিকার। কোনো অজুহাতেই নাগরিককে এ অধিকার থেকে বঞ্চিত করার সুযোগ নেই। কিন্তু তা করা হচ্ছে প্রতিদিন। যদিও বিষয়টি নতুন নয়, অনেক পুরনো। পুরনো বলেই বিষয়টিকে বার বার সামনে আনা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। কারণ ফুটপাতের নৈরাজ্য আমাদের অনেকের রক্তের সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে। যে মানুষটি যে উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েটি প্রথম শহরে আসছে তার বা তাদের ধারনা হয়ে যাচ্ছে এটাই বুঝি নিয়ম শহরের। এই বুঝি শহর। একদিকে ময়লা আবর্জনার স্তূপ, পাশাপাশি মাছের বাজার। একদিকে কফ থুথু, অন্যদিকে স্বাস্থ্যবিধি মানার নছিহত।
আমরা জানি, ফুটপাতে অবৈধ দখলদারিত্বের সমস্যাটা খুব সহজে সমাধানযোগ্য নয়। কারণ এর শেকড় বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। এক এক এলাকায় ফুটপাতের ব্যবসার সাথে জড়িতদের নেপথ্যে আছে অনেক দলীয় লোকজন, দলের নাম ভাঙানো মাস্তান, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অনেক অসাধু সদস্য। অনেক দোকানদারও নিজের লাভের স্বার্থে দৈনিক একটি নির্দিষ্ট অংকের বিনিময়ে অনেক হকার বসিয়ে থাকেন। তবে জনসাধারণের চলাচলে বাধার সৃষ্টি করে ব্যবসা করা নিঃসন্দেহে অনৈতিক। এই অনৈতিকতাকে প্রশ্রয় দেওয়া মোটের ওপর উচিত নয়। তাই আমরা আশা করব নতুন নগর পিতা এই বিষয়টার ওপর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নজর দেবেন। ফুটপাত দখলমুক্ত করে অবাধ চলাচলের ব্যবস্থা করতে নিজের আন্তরিকতার সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটাবেন। সেই সঙ্গে নির্বাচিত কাউন্সিলরদের স্ব স্ব এলাকায় ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে তাঁদের সর্বোচ্চ শক্তি ও সদিচ্ছার প্রতিফলন ঘটানোর নির্দেশনা দেবেন। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও সদিচ্ছা থাকলে কাজটি যতই কঠিন হোক তাতে এক সময় সুফল আসবেই।
লেখক : শিশুসাহিত্যিক ও কলামিস্ট



