নিজস্ব প্রতিবেদক
রেলে ৩০ বছর সেবার লক্ষ্যে চীন থেকে আমদানি করা হয় ২০টি ডিজেল মাল্টিপল ইউনিট (ডেমু) ট্রেন। কয়েক মাসের মাথায় বিকল হতে থাকে ডেমু ট্রেন। গত চার বছর আগে ট্রেনগুলো পুরোপুরি অকেজো। একইভাবে যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনের লক্ষ্যে ১২৫টি লাগেজ ভ্যান কেনা হয়। খরচের তুলনায় আয় কম হওয়ায় লাগেজ ভ্যানগুলো এখন আর চলে না।
৩০০০ সিরিজের ৩০ ইঞ্জিন কেনা নিয়ে তো রেলে সবচেয়ে বড় দুর্নীতিই হয়েছে। ২০টির মতো ইঞ্জিন অকেজো রয়েছে। বাকি ১০টি ইঞ্জিন চালু থাকলেও প্রায়সময় পথিমধ্যে বিকল হয়। গত এক যুগে রেল বহরে যুক্ত হওয়া ডেমু ট্রেন, লাগেজ ভ্যান ও ইঞ্জিন কেনা তিন ‘অকেজো প্রকল্পে’ রেলের তছরুপ হয়েছে দুই হাজার ১৬০ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপযোগিতা না থাকার পরও শুধু ব্যক্তির লাভের আশায় ডেমু প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। সরবরাহকারীদের সুবিধা দিতে এরকম অনেক কেনাকাটা হয়। ইঞ্জিন ও লাগেজ ভ্যান কেনার আগে উপযোগিতা যাচাই করা হয়নি। রেল বহর সমৃদ্ধ করার নামে এই প্রকল্পগুলোতে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম ঘটেছে। তছরুপ হয়েছে হাজার কোটি টাকা।
রেলওয়ে মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘ডেমু মেরামতের সক্ষমতা না থাকায় সেগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। যে কারণে ট্রেনগুলো নিলামে বিক্রির পরিকল্পনা চলছে। লাগেজ ভ্যানগুলো মূলত মেইল ও লোকাল ট্রেনে চলত। রোলিং স্টক সংকটে সেসব ট্রেনের অনেগুলো এখন বন্ধ। ভ্যানগুলোর ব্যবহার ও আয় বাড়াতে আমরা কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করছি। রেলে সর্বশেষ যুক্ত হওয়া ইঞ্জিনগুলো নিয়ে সংকট রয়েছে। যন্ত্রপাতি সরবরাহ যথাসময়ে না হওয়া সমস্যা হচ্ছে। তবে নতুন ইঞ্জিন যুক্ত হলে সংকট কেটে যাবে।’
১০ বছরও চলেনি ডেমু ট্রেন : ২০১৩ সালে রেল বহরে যুক্ত হয় ২০ সেট ডেমু ট্রেন। ৬৫৪ কোটি টাকা ব্যয়ে চীন থেকে ট্রেনগুলো আমদানি করা হয়। কমপক্ষে ৩০ বছর যাত্রীসেবা দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে বলে এসব ট্রেন বাংলাদেশে আনা হয়। কয়েক মাস যেতে না যেতেই ডেমু বিকল হওয়া শুরু হয়। নতুন প্রযুক্তির ট্রেনগুলো মেরামতে হিমশিম খায় ওয়ার্কশপ কর্মচারীরা। এখন স্থায়ীভাবে বিকল হয়ে গেছে ডেমু ট্রেন। ট্রেনগুলো নিলামে বিক্রি করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে রেল। বর্তমানে পাহাড়তলী লোকোশেডে ১০ সেট, কমলাপুর লোকোশেডে আট সেট, পার্বতীপুর লোকোশেডে দুই সেট ডেমু ট্রেন পড়ে আছে।
রেলওয়ে কর্মকর্তারা-কর্মচারীরা জানান, ইঞ্জিনে অস্বাভাবিক শব্দ, অতিরিক্ত কালো ধোঁয়া বের হওয়া, গরম হয়ে যাওয়া, লোডসহ নানা সমস্যা দেখা দেয়ায় প্রায়সময় বসে থাকতো ডেমু ট্রেন। পরবর্তীতে যন্ত্রপাতি অভাব ও অনভিজ্ঞতার কারণে দীর্ঘসময় ট্রেনগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। যে কারনে ট্রেনগুলো বিকল হয়ে গেছে। অথচ এগুলোর কেনার সময় যে যুক্তিগুলো দেয়া হয়েছিল কোনটিই ছিল না। স্বল্প দূরুত্বের জন্য ডেমু ট্রেন উপযোগী। কিন্তু ট্রেনগুলো দূরপাল্লার রুটে চালানো হয়েছে। যে কারণে ঘন ঘন বিকল হয়েছে।
‘ডেমু ট্রেন মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা’ শীর্ষক রেলওয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ডেমু ট্রেনে উচ্চপ্রযুক্তির সফটওয়্যার নির্ভর মডিউলসহ ইলেকট্রিক যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এ সম্পর্কে বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মীদের কোনো ধারণা ছিল না। এমনকি এসব মডিউল, যন্ত্রাংশ দেশের বাজারে পাওয়া যায় না। মূল নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তা সংগ্রহ ও সফটওয়্যার প্রোগ্রাম করে ডেমুতে সংযোজন করার প্রয়োজন হয়, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। নষ্ট হয়ে গেলেও ইলেকট্রনিক এসব যন্ত্রাংশ বিশেষ করে মডিউলগুলো সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। একপর্যায়ে ডেমু ট্রেন রক্ষণাবেক্ষণ ও অপারেশন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়ে পড়ে।
অচল লাগেজ ভ্যান : যাত্রী পরিবহনের পাশাপাশি লাভজনক হওয়ার লক্ষ্যে পণ্য পরিবহনের জোর দেয় রেলওয়ে। এজন্য ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে রেলবহরে যুক্ত হয় ১২৫টি লাগেজ ভ্যান। ৩৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে লাগেজ ভ্যানগুলো কেনা হলেও এখন মাত্র ৫ শতাংশ ঠিক আছে। আয়ের চেয়ে খরচ বেশি ও নানামুখী সমস্যার কারণে এসব লাগেজ ভ্যান বন্ধ আছে।
রেলওয়ের তথ্যমতে, ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের রোলিং অপারেশন উন্নয়ন কারিগরি সহায়তা’ প্রকল্পের আওতায় ২০২০ সালের ৩১ আগস্ট চীনের একটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মোট ৩৫৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকার চুক্তি করে রেলওয়ে। সে হিসেবে ২০২৩ সালের শেষের দিকে ৭৫টি মিটারগেজ ও ৫০টি ব্রডগেজ লাগেজ ভ্যান কেনা হয়। এরমধ্যে ২৫টি রেফ্রিজারেটর লাগেজ ভ্যান আছে। রেল বহরে থাকা নতুন ১২৫টি ও পুরনো ৫০টি মিলিয়ে মোট ১৪৩টি লাগেজ ভ্যানের মধ্যে বর্তমানে সচল ভ্যান আছে মাত্র ৬৩টি। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলে চলছে ২১টি এবং পশ্চিমাঞ্চলে চলছে ২৪টি।
সম্প্রতি লাগেজ ভ্যানগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে রেলভবনে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সভায় রেলের যুগ্ম মহাপরিচালক এ এম সালাহ উদ্দীন বলেন, ‘রেলে যে লাগেজ ভ্যান রয়েছে, তার মাত্র ৫ শতাংশ ব্যবহৃত হচ্ছে। নীতিমালা করে বেসরকারি খাতে লাগেজ ভ্যান ইজারা বা ভাড়া দিলে রাজস্ব বৃদ্ধি সম্ভব হবে।’
পুরানো ট্রাকে ভারী ইঞ্জিন : দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম কোম্পানি থেকে দুটি প্রকল্পে ৩০টি ইঞ্জিন ক্রয় করা হয়। এক হাজার ১৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা ইঞ্জিনগুলো প্রায়সময় বিকল থাকে। বর্তমানে ২০টি ইঞ্জিন বিভিন্ন কারখানায় বিকল অবস্থায় পড়ে আছে। ১০টি ইঞ্জিন চালু থাকলেও সেগুলোও পথিমধ্যে বিকল হয়ে যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, ২০১৮ সালে ইঞ্জিনগুলো কিনতে দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেমের সঙ্গে চুক্তি করে রেল মন্ত্রণালয়। কোরিয়ান এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়নে প্রথম ধাপে ২০২১ সালের আগস্ট মাসে ১০টি লোকোমোটিভ (ইঞ্জিন) আসে। পরে আরেকটি প্রকল্পে আরো ২০টি লোকোমোটিভ কেনা হয়। যেগুলোর সিরিজ নির্ধারণ হয় ৩০০১-৩০৩০। পুরোনো ভারী ইঞ্জিনগুলোর গড় ওজন প্রতি এক্সেলে ১১ দশমিক ৯৬ লোডের হিসাবে ৭০ থেকে ৭২ টন। সর্বশেষ আমদানি হওয়া ইঞ্জিনগুলোর গড় ওজন ৯০-৯৫ টনেরও বেশি। অধিক ওজনের কারণে রেলের পুরোনো ট্র্যাক এবং শতবর্ষী সেতুগুলোতে এই ভারী ইঞ্জিনগুলো চলতে পারছে না। যে কারনে চলতি পথে প্রায়সময় বিকল হচ্ছে।
তিন প্রকল্পে দুদকের নজর : অবশেষে বিগত সরকারের শীর্ষ মহলের ইচ্ছায় বাস্তবায়িত হওয়া ডেমু ট্রেন, লাগেজ ভ্যান ও ইঞ্জিন ক্রয় প্রকল্পগুলোর দুর্নীতি অনুসন্ধানে সরব হয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত জুলাই মাস থেকে লাগেজ ভ্যান প্রকল্পের অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। গত এক সপ্তাহে ডেমু ট্রেন ও ইঞ্জিন কেনা নিয়ে দুটি মামলা করেছে দুদক। মামলায় প্রকল্প সংশ্লিষ্ট রেল কর্মকর্তাদের আসামি করা হয়েছে।
দুদক সূত্র জানায়, গত জুলাই মাসে রেলওয়ের ‘লাগেজ ভ্যান প্রকল্পে’ সরকারি অর্থের অপচয় এবং যাত্রীসেবায় অনিয়মের অভিযোগে অভিযান চালিয়েছে দুদক। এ অভিযানে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের দরপত্র ও কেনাকাটার বিভিন্ন নথিপত্র সংগ্রহ করা হয়। এছাড়াও প্রথম ধাপে কেনা রেলওয়ের ১০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ ইঞ্জিন ক্রয়ে অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারের ৩২২ কোটি টাকার ক্ষতির অভিযোগে সাবেক মহাপরিচালকসহ রেলওওয়ের তিন শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
মামলার এজাহারে বলা হয়, আসামিরা যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার, অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে নিজেদের এবং অন্যদের লাভবান করার উদ্দেশ্যে ইঞ্জিন ক্রয়ের ক্ষেত্রে চুক্তি ও টেন্ডারের স্পেসিফিকেশন পরিবর্তন করেন। মামলার আসামিরা হলেন, রেলওয়ের সাবেক মহাপরিচালক মো. শামসুজ্জামান, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মফুরুল আলম চৌধুরী, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ হাসান মনসুর।
অকার্যকর ও অনুপযোগী ডেমু ট্রেন ক্রয় প্রকল্পের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষতি সাধনের অভিযোগে বাংলাদেশ রেলওয়ের সাবেক মহাপরিচালকসহ সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
গত বুধবার ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক রাজু আহমেদ বাদি হয়ে মামলাদি দায়ের করেন। মামলার আসামিরা হলেন- রেলওয়ের সাবেক মহাপরিচালক মো. তৌহিদুল আনোয়ার চৌধুরী, প্রকল্প পরিচালক ও সাবেক প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী (উন্নয়ন) মো. ইফতিখার হোসেন, সাবেক প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী (পূর্ব) মো. আক্তারুজ্জামান হায়দার, পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক উপসচিব বেনজামিন হেমক্রম, রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপপ্রধান অঞ্জন কুমার বিশ্বাস, মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপসচিব আশরাফুজ্জামান এবং বাস্তবায়ন, নিরীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সাবেক উপ-পরিচালক মো. মুমিতুর রহমান।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, আসামিরা সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় পরস্পর যোগসাজশে প্রতারণা ও জালিয়াতির আশ্রয় নেন। কোনো ধরনের সঠিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বা বাস্তবায়নযোগ্যতা যাচাই না করেই ডেমু ট্রেন ক্রয় প্রকল্পের অনুমোদন নেন। যেখানে অকার্যকর, লোকসানি এবং বাংলাদেশের রেল অবকাঠামো ও প্রযুক্তিতে অনুপযোগী ট্রেন ক্রয় করে নিজেদের আর্থিকভাবে লাভবান এবং অন্যদের সুবিধা দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থের অপব্যবহার করা হয়।



