গোড়ায় গলদ রেখে দেশ বদলানো যাবে কি?

2

‘শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড’ এ চিরায়ত বচনটির কথনে ব্যবহারে যত আধিক্য, কার্যত এর কোন গুরুত্বই যে একটি রাষ্ট্রের নেই তা বিগত ৫৪ বছরে পদে পদে টের পেয়েছে দেশের মানুষ। একটি স্বাধীন স্বার্বভৌম দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির মূল চাবিকাটি শিক্ষা। আমাদের সংবিধানে মৌলিক অধিকার হিসেবে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান ও স্বাস্থ্যের সাথে শিক্ষাও রয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য সেই শিক্ষা আজ দারুণভাবে রাষ্ট্র কর্তৃক উপেক্ষিত। স্বাধিনতার পর থেকে বিগত পাঁচ দশকে যত সরকার ক্ষমতায় আসছে, সবায় শিক্ষার কারিকুলাম ও নীতিমালা করেছে নিজেদের মত করে। অনেকটা নিজেদের দলীয় ধ্যানধারণায় সাজানোর চেষ্টা করা হয়েছে। একে সরকার এসেছে, নীতিমালা পরিবর্তন করেছে, কারিকুলাম পরিবর্তন করেছে আর পরীক্ষা পদ্ধতি এমনভাবে পরিবর্তন করা হয়েচে-এখানে শিক্ষার্থীদের একধরনের গিনিপিক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বিগত আওয়ামীলীগ সরকার কারিকুলাম পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে যে জগাকিছুড়ি অবস্থার সৃষ্টি করেছিল তাতে দেশের সচেতন মানুষ চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের পক্ষ থেকে বারবার দাবি ওঠেছিল ওই কারিকুলাম ও পরীক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তনের। এরমধ্যেই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকারের পতন হলো। গঠিত হয়েছিল নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার। এ সরকার শিক্ষাসহ মৌলিক বিষয়গুলো সংস্কার করবে, জনগণ যেন সঠিক অধিকার ভোগ করতে পারে। কিন্তু বিগত ষোল বছরে সরকার অনেকগুলো সংস্কার নিয়ে কাজ করলেও শিক্ষা সংস্কার নিয়ে আদৌ কোন উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ নেয়া হয়েছে কিনা, তা নিয়ে কোন তথ্য আমাদের নজরে আসেনি। অথচ আধুনিক বিশ্বে শিক্ষা ও গবেষণা ছাড়া অন্যান্য মৌলিক চাহিদা, অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপাত্তার কথা চিন্তা করাও অন্যায়। এ বছর ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের মাঝে, ইরানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা একটা মূল্যবান কথা বলেছেন, বোমা হামলায় জ্ঞান ধ্বংস হয় না।’ একটা জাতিকে গড়তে হলে সবার আগে তার শিক্ষা ব্যবস্থার গঠন দরকার এবং ধ্বংস করতে হলেও সর্বপ্রথম শিক্ষা ব্যবস্থাকেই নষ্ট করতে হবে- এটা সত্য।
আমাদের স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কী পড়ানো হয়, কীভাবে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়, কিন্ডারগার্টেন নামে স্কুল খুলে, নুরানি মাদ্রাসা ও হিফজখানা নামে যেসব অনিবন্ধিত শিশু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার কোন হিসাব শিক্ষা সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে আছে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, এসব শিক্ষার নামে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে কোমলমতি শিশুদের কি পরিমাণ মানসিক চাপে রাখা হয় তা সংবাদপত্রগুলোতে চোখ রাখলেই বুঝা যায়। সবচেয়ে বড় কথা দেশে কত প্রকারের স্কুল, কলেজ ও মাদরাসা রয়েছে, এগুলোতে কত ধরণের সিলেবাসে শিক্ষা দেয়া হয় তা জানার কোন সুযোগ নেই। একটি জাতীয় দৈনিকে কিছুদিন আগে প্রকাশিত একটি প্রবন্ধে বলা হয়, মূলত এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানতে ব্যাপক গবেষণা দরকার। প্রবন্ধকার বলেছেন, শিক্ষার বহুধারা যে দেশে চলমান সেই দেশ আর যাই হোক, সুশৃঙ্খল হতে পারে না। কিন্তু আমরা বর্তমান সরকার কেন শিক্ষার মত মৌলিক বিষয়টির প্রতি তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেনা তা বোধগম্য নয়। আমরা লক্ষ করছি, সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বিগত সরকারের আমলে পরীক্ষা পদ্ধতি নিয়ে যে বিতর্ক ছিল তা প্রশমনের চেষ্টা করেছে বটে, কারিকুলাম পরিবর্তন না করে। শুধু পরীক্ষা পদ্ধতি, প্রশ্নের কাঠামো ও মানবন্টন পরিবর্তন করেছে মাত্র। এছাড়া সম্প্রতি পাঠ্য বই-এ কিছ অধ্যায়ের পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করা হয়েছে বা হচ্ছে অধ্যাদেশের মাধ্যমে। স্কুল কলেজ পরিচালনা কমিটি নিয়ে কমপক্ষে পাঁচবার পাঁচ রকমের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে শিক্ষা বিভাগ থেকে। এখানে আগের সরকারগুলোর নীতির কোন পরিবর্তন হচ্ছে বলে আমাদের মনে হয় না। অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করছেন এমন অনেক অধ্যায় সংযোজন হতে যাচ্ছে, যাতে রাজনৈতিক বিদ্ধেষ ও প্রতিহিংসার বিস্তার ঘটতে পারে। অতীতে যেমনটি হয়েছে। অথচ আমাদের শিক্ষার মূল বিষয় হওয়া উচিৎ দেশপ্রেম, স্বাধীনতা, বিজ্ঞান, তথ্য প্রযুক্তির উৎকর্ষ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, মার্কেটিং, উৎপাদান, ধর্ম ও নৈতিকতা ও মানবিকতার বিকাশ সাধন। কিন্তু সেই দিকে কারো মনোযোগ আছে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এছাড়া স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মূল পার্থক্য হল: স্কুল-কলেজ শুধু জ্ঞান বিতরণ করে আর বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞান তৈরি করে ও বিতরণ করে। গবেষণা করে জ্ঞান তৈরি করাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রধান কাজ। শিক্ষক ও মাস্টার-পিএইচডি লেভেলের শিক্ষার্থীদের গবেষণায় নিয়োজিত থাকার কথা। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক নিয়োগে কোন গবেষণা পত্র ছাড়াই যে একাডেমিক নম্বরকে গুরুত্ব দেয়া হয় তাতে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা শুধু নোট আর বই দেখে পাঠদান করা ছাড়া আর কিছুই তেমন করতে অভ্যস্ত হন বলে আমাদের মনে হয় না। আমরা মনে করি, দেশে আর যাই সংস্কার হোক বা না হোক, শিক্ষা ক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কার অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে। মূলে গলদ রেখে শাখা প্রশাখা নিয়ে দৌড়ালে তার কোন টেকসই ফল পাওয়া যাবেনা, একথা বলার আরে কোন অবকাশ নেই। সরকার এক্ষেত্রে মনোযোগ দিবে-এমনটি প্রত্যাশা আমাদের।