নিজস্ব প্রতিবেদক
আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনিতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসবাসের জন্য ৯টি ২০তলা ভবন নির্মাণ করেছে গণপূর্ত। ভবনগুলো নির্মাণে কার্যাদেশ পান আওয়ামী লীগপন্থি তিন ঠিকাদার। ভবনগুলো নির্মাণে ঠিকাদার ও প্রকৌশলীরা পরস্পর যোগসাজশে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার ও ব্যাপক অর্থ লোপাট করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর ভবনগুলো পরিমাপ করে পুরোদমে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুদক। বেসরকারি আবাসন কোম্পানি যে দামে ফ্ল্যাট বিক্রি করে জমির মূল্য বাদেই গণপূর্তের এসব ফ্ল্যাট নির্মাণে তার কাছাকাছি খরচ পড়েছে বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রমাণ পেয়েছে দুদক। প্রকল্পে ৯টি ভবন নির্মাণে প্রায় ৩৯৫ কোটি ব্যয় হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন চট্টগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়-২ এর উপ-পরিচালক রিয়াজ উদ্দিন পূর্বদেশকে বলেন, ‘গণপূর্তের আবাসন প্রকল্পে দুর্নীতি অনুসন্ধান চলছে। ইতোমধ্যে ভবনগুলো পরিমাপ করেছি। অনুসন্ধান শেষ হলেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।’
জানা যায়, ২০১৮ সালের ২৬ জুন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ৯টি ভবন নির্মাণে প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন হয়। একই বছরের ৮ সেপ্টেম্বর নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয় এবং ২০১৯ সালে ভবনের মূল অবকাঠামো নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ২০২৩ সালের ১৪ নভেম্বর ভবনগুলো নির্মাণ শেষে উদ্বোধন হয়। ভবনগুলোতে বর্তমানে ৯ম থেকে ১২তম গ্রেডের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বসবাস করছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনির ভেতরে এক জায়গায় ৯টি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। নদীর নামে নাফ, কাসালং, রানখিয়াং, সাঙ্গু, মাতামুহুরি, ইছামতি, হালদা, কর্ণফুলী, বাঁকখালী নাম দেয়া হয়েছে ভবনগুলোর। দুইপাশে যাতায়াতের জন্য ৯টি ভবনের মাঝখানে দুটি রাস্তা রাখা হয়েছে। অধিকাংশ ভবনেই বরাদ্দ পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বসবাস করছেন। ভবনের একজন নিরাপত্তারক্ষী বলেন, ‘বহিরাগত কেউ ভবনে উঠতে পারে না। এক হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাটগুলোতে তিনটি বেডরুম, ড্রয়িং-ডাইনিং, তিনটি ব্যালকনি এবং ওয়াশরুম আছে। ভবন নির্মাণে দুর্নীতি হয়েছে জানিয়ে কিছুদিন আগে দুদক এসে তদন্ত করেছে।’
গণপূর্ত সূত্র জানায়, ‘আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনিতে জরাজীর্ণ ১১টি ভবনের স্থলে ৯টি বহুতল আবাসিক ভবনে সরকারি কর্মকর্তা/কর্মচারীদের জন্য ৬৮৪টি ফ্ল্যাট নির্মাণ’ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে গণপূর্ত বিভাগ-৪। ৩৯৫ কোটি ৪৩ লাখ ৪৭ হাজার ৯২৭ টাকায় ভবনগুলোর নির্মাণ কাজ করেছে রয়েল এসোসিয়েট, ফ্রেন্ডস এসোসিয়েট ও জামাল এন্টারপ্রাইজ নামে তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তিনটি প্যাকেজে প্রতিটিতে তিনটি করে ভবন রাখা হয়েছে। ৯টি ভবনে ৬৫০ বর্গফুটের ১৫২টি ফ্ল্যাট, ৮৫০ বর্গফুটের ৩০৪টি ফ্ল্যাট এবং ১ হাজার বর্গফুটের ২২৮টি ফ্ল্যাট রয়েছে। প্রকল্পটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছেন চট্টগ্রাম গণপূর্ত বিভাগের বর্তমান তত্ত¡াবধায়ক প্রকৌশলী মুহম্মদ আশিফ ইমরোজ ও গণপূর্ত বিভাগ-৩ এর নির্বাহী প্রকৌশলী জহির উদ্দিন আহমেদ। এক হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাটের তিনটি ভবনের প্রত্যেকটি একই ডিজাইন ও মাপের। ২০ তলা বিশিষ্ট ভবনের প্রত্যেকটি ফ্লোরের আয়তন ৬ হাজার ৮শ বর্গফুট। সেই হিসেবে প্রতি প্যাকেজে ৩টি ভবনে ফ্লোরের আয়তন দাঁড়ায় ৪ লক্ষ ৮ হাজার বর্গফুট।
গণপূর্তের দুইজন ঠিকাদার জানান, তিনটি করে ভবন নিয়ে তিনটি প্যাকেজ করার কারণে এই ভবন নির্মাণে প্যাকেজ মূল্য বেড়ে যায়। প্যাকেজ মূল্যের কারণে সেসময় অনেক অভিজ্ঞ ঠিকাদার টেন্ডারে অংশ নিতে পারেননি। চট্টগ্রামের বিভিন্ন দপ্তর নিয়ন্ত্রণ করা একটি ঠিকাদারি সিন্ডিকেটকে সুবিধা দিতেই মূলত গণপূর্তের প্রকৌশলীরা প্যাকেজ মূল্য বড় করেছিলেন। মূলত ঠিকাদার ও প্রকৌশলীরা মিলে এই প্রকল্পটির অর্থ লোপাট করেছেন। প্রকল্পের কাজ করা তিনজন ঠিকাদারই আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলেন। ভবন নির্মাণে প্রতি বর্গফুটে যে ব্যয় দেখানো হয়েছে তা অনেক বেশি। বেসরকারি আবাসন কোম্পানি জমিসহ ফ্ল্যাট বিক্রিতে যে দাম ধরে জমির মূল্য ছাড়াই ফ্ল্যাট নির্মাণে তার চেয়ে বেশি ব্যয় করেছে গণপূর্ত বিভাগ।
চট্টগ্রাম গণপূর্ত সার্কেল-২ এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহম্মদ আশিফ ইমরোজ পূর্বদেশকে বলেন, ‘৯টি ভবন নির্মাণে কোন অনিয়ম হয়নি। সেখানে ইতোমধ্যে বরাদ্দ পাওয়া লোকজন বসবাস করছে। দুদক যাচাই করে দেখতেই পারে।’
দুদক সূত্র জানায়, নির্মাণ কাজ শুরুর এক বছরের মধ্যে অনিয়মের অভিযোগ উঠে। ২০২০ সালে প্রকল্পটির অনিয়ম তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুসন্ধান কর্মকর্তাও নিয়োগ দেয় দুদক। করোনার পরপরই অনুসন্ধান শুরু করেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। সেসময় প্রকল্পের যাবতীয় তথ্য চেয়ে গণপূর্তের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীকেও চিঠি দেয় দুদক। কিন্তু দুদকের এ অনুসন্ধান থেমে যায়। গত বছর আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর প্রকল্পটির দুর্নীতি অনুসন্ধানে আবারো মাঠে নামে দুদক। গত ৯ সেপ্টেম্বর প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন এবং ভবনের বিভিন্ন অবকাঠামো পরিমাপ করে দুদক। প্রাথমিক তদন্তে দুদক অনিয়মের সত্যতা পেয়েছে। ঠিকাদার ও প্রকৌশলীরা যোগসাজশ করেই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসবাসের জন্য নির্মিত ৯টি ভবন নির্মাণে বড় ধরনের দুর্নীতি করেছেন।
গণপূর্ত চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী-৩ জহির উদ্দিন আহমেদ পূর্বদেশকে বলেন, ‘ভবনগুলো নির্মাণে কোন দুর্নীতি হয়নি। দুদক পরিমাপ করে এখনো আমাদের কিছুই বলেনি। সেখানে ইতোমধ্যে অনেকেই বসবাস করছে।কাগজপত্রগুলো দেখলে আপনি নিজেও বুঝবেন। আমার অফিসে এসে একটু দেখে যাবেন।’










