৮ বছর বন্ধ, এখন ব্যবহার অনুপযোগী ৫ ছাত্রাবাস

37

আসাদুজ্জামান রিপন

ঐতিহ্যবাহী চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের ৫টি ছাত্রাবাস গত ৮ বছর ধরে বন্ধ। এ কারণে ছাত্রাবাসগুলোর আসবাবপত্র থেকে শুরু করে অবকাঠামোগত সবকিছুই প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে। এ অবস্থায় ছাত্রাবাসগুলো পুনরায় চালু করা যাচ্ছে না। কলেজ কর্তৃপক্ষ বলছে, সেগুলো প্রয়োজনীয় সংস্কারের পর আগামী ফেব্রুয়ারি মাস নাগাদ চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ডিসেম্বরের দুই ছাত্র সংগঠনের সংঘর্ষের জেরে ছাত্রাবাসগুলো (হোস্টেল) বন্ধ করে দিয়েছিল কলেজ কর্তৃপক্ষ।
সরেজমিন দেখা যায়, বাইরে থেকে শত বছরের পুরনো রাজা-বাদশার পরিত্যক্ত প্রাসাদ মনে হয়। শৈল্পিক নির্মাণ শৈলীর এসব ভবনে মাকড়শার জাল ভেদ করে ভিতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে বারান্দায় ময়লায় স্ত‚প। ভবনের সামনের মাঠে পূর্ব অংশে সবজি চাষের বড় মাচাং। দেয়ালের রং উঠে শ্যাওলা জমেছে, ভিতরে একপ্রকার ভুতুড়ে পরিবেশ-এ চিত্র চট্টগ্রাম কলেজের সোহরাওয়ার্দী ছাত্রাবাসের।
শুধু সোহরাওয়ার্দী ছাত্রাবাস নয়, কলেজের সবকটি ছাত্রবাসের চিত্র এমনই। এর মাঝেই আগামী ফেব্রয়ারি মাস নাগাদ দুটি ছাত্রাবাস ও একটি ছাত্রীনিবাস চালুর পরিকল্পনা করেছে কলেজ প্রশাসন। জরাজীর্ণ এসব ছাত্রাবাসের প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে আদৌ চালু হবে কি না, এ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তবে অধ্যক্ষের দাবি, এ সময়ের মধ্যেই সংস্কার কাজ শেষ করে ছাত্রাবাসগুলো চালু করতে পারবেন।
জানা গেছে, ২০১৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসকে কেন্দ্র করে ছাত্রশিবির ও ছাত্রলীগের সংঘর্ষের পর ৪টি ছাত্রাবাস ও ১টি ছাত্রীনিবাস বন্ধ ঘোষণা করে কলেজ কর্তৃপক্ষ। এরপর থেকে কার্যত পরিত্যক্ত চট্টগ্রাম কলেজের ৫ ছাত্রাবাস।
এদিকে ২০১৮ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রীনিবাস নামে আরও একটি ছাত্রীনিবাস নির্মাণ করে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর। ৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০০ আসন বিশিষ্ট এ ছাত্রীনিবাসটি নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে এটি চালু রয়েছে এবং ৩৭ জন ছাত্রী এখানে আছেন।
কলেজ প্রশাসনের সাথে কথা বলে জানা যায়, চট্টগ্রাম কলেজের চারটি ছাত্রাবাস ও দুইটি ছাত্রী নিবাস রয়েছে। ছাত্রদের জন্য শেরে বাংলা, আব্দুস সবুর, সোহরাওয়ার্দী ও ৭ মার্চ ছাত্রাবাস। এগুলোর মধ্যে আব্দুস সবুর ছাত্রাবাস স্নাতকোত্তর ছাত্রদের জন্য, বাকিগুলো উচ্চ মাধ্যামিক ও স্নাতক শ্রেণির ছাত্রদের জন্য বরাদ্দ।
ছাত্রীদের জন্য জননেত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রীনিবাস ও খদিজাতুল কুবরা (রা.) ছাত্রীনিবাস। ২০১৮ সালে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রীদের জননেত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রীনিবাসটি নির্মাণ করে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর।
সরেজমিন দেখা যায়, হোস্টেল ভবনগুলোর দরজা-জানালা ভেঙে গেছে, ভেতরে পড়ে আছে বই, তোষক, পড়ার টেবিল, চেয়ার। সিলগালা করা ছাত্রাবাসের অনেক কক্ষের দরজা ভাঙা, কোন কোন কক্ষের দরজা জানালা একেবারেই উধাও হয়ে গেছে। এসব কক্ষের সামনে ভিতরে শ্যাওলা জমেছে। কোন কোন রুমে এখনও মশারি টাঙানো। এর উপর গড়ে উঠেছে পোকা-মাকড়ের ঘরবসতি। একটি ভবনের পূর্বপাশে করলা ক্ষেত করেছে কলেজের কর্মচারীরা। ক্ষেতের মাচাংয়ে ঝুলছে করলা। ছাত্রাবাসের সামনে বৈঠকখানায় পরগাছা জন্মে এক প্রকার ভুতুড়ে পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
চট্টগ্রাম কলেজে ইংরেজি বিভাগের ২য় র্বষের শিক্ষার্থী আব্দুল মালেক জানায়, হোস্টেল বন্ধ থাকায় বাধ্য হয়ে ব্যাচেলর থাকতে হচ্ছে। এর কারণে প্রতিমাসে ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। ফলে মাস শেষে টাকার চিন্তা করতে হয়, পড়াশোনায় বিঘœ ঘটে। হোস্টেল চালু থাকলে খরচ কম হত। এর পাশাপাশি পড়াশুনায় আরও মনযোগ বাড়ত।
সমাজাবিজ্ঞান বিভাগের ৪র্থ বর্ষের ছাত্র জমির উদ্দিন বলেন, ২০১৮ সালে কলেজ প্রশাসন হোস্টেল খোলার উদ্যোগ নিয়েছিল। অজ্ঞাত কারণে তা আলোরমুখ দেখেনি।
দ্বাদশ শ্রেণির এক শিক্ষার্থী পূর্বদেশকে বলেন, আমার বাড়ি পটিয়ায়। সেখান থেকে এসে প্রতিদিন ক্লাস করি। ক্লাস শেষ হতে বিকেল হয়ে যায়, আর বাড়ি যেতে যেতে সন্ধ্যা। হোস্টেল চালু হলে এ দুর্ভোগ থেকে রক্ষা পাব।
হোস্টেল খোলার ব্যাপারে জানতে চাইলে ছাত্রলীগ কলেজ শাখার সভাপতি মাহমুদুল করিম বলেন, সাধারণ শিক্ষার্থীদের মত আমরাও চাই হোস্টেল চালু হোক। এরপরও শঙ্কা থেকে যায়, হোস্টেল চালু হলে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। সিট বরাদ্দের সময় যাতে কোন প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী হোস্টেলে উঠতে না পারে, সে বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে।
ছাত্রলীগের কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক সুভাষ মল্লিক সবুজ বলেন, হোস্টেল চালু হোক, সেটা আমরাও চাই। হোস্টেল বন্ধ থাকায় অনেক গরীব ও দূর-দূরান্ত থেকে পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের কষ্ট হচ্ছে, আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। হোস্টেল চালু হলে জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীর সমর্থকরা যাতে আস্তানা বানাতে না পারে, সেদিকে নজর রাখতে হবে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মাদ মোজাহেদুল ইসলাম পূর্বদেশকে বলেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় ছাত্রাবাসগুলো ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ২০১৮ সালে তৎকালীন কলেজ প্রশাসন ছাত্রাবাসগুলো চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল। পরে বিভিন্ন কারণে চালু করা যায়নি। এবার জোরালো ভ‚মিকা নিয়ে শেখ হাসিনা ছাত্রীনিবাস চালু করেছি। শেরে বাংলা ছাত্রাবাস বর্তমানে একদম ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে গেছে। এটি ভেঙে নতুনভাবে করতে হবে। ইতিমধ্যে শেরে বাংলা ছাত্রাবাসে নতুন বহুতল ভবন নির্মানের একটি প্রকল্প তৈরির কাজ চলমান।
তিনি আরও বলেন, ইতিমধ্যে খদিজাতুল কুবরা (র.) ছাত্রনিবাস, সবুর ছাত্রাবাস ও সোহরাওয়ার্দী ছাত্রাবাস সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছি। ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে সোহরাওয়ার্দী ছাত্রাবাসের সুপারের বাসভবন সংস্কার কাজ শেষ হয়েছে। শীঘ্রই ছাত্রাবাসগুলোর সংস্কার কাজ শুরু হবে। একাডেমিক কাউন্সিলে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েছে। আশা করছি, ইলেকশনের পরপরই আমরা সবুর হোস্টেল ও সোহরাওয়ার্দী হোস্টেল চালু করতে পারব।