৩ খুনের রহস্য অজানা

18

তুষার দেব

আট বছর আগে ২০১৫ সালের শুরুতেই মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে নগরীতে পৃথক তিনটি খুনের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে একটি খুনের ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকশ’ গজ দূর থেকে ওই হত্যাকান্ড প্রত্যক্ষ করেন। খুনের শিকার হয়েছিলেন একজন জ্যেষ্ঠ কলেজ শিক্ষিকা। কিলিং মিশনে অংশ নেয়া মুখোশধারী পাঁচ খুনির একজন পাহারায় থেকে বাকি চারজন ধারালো চাপাতি দিয়ে ওই শিক্ষিকাকে উপর্যূপরি কুপিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।
বাকি দু’টি হত্যাকান্ডের শিকার হওয়াদের মধ্যে একজন কলেজছাত্র; অন্যজন প্রকৌশলী। কাছে কিংবা দূরে দাঁড়িয়ে এ দুটি খুনের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন-এমন কাউকে পাওয়া না গেলেও তারা যে খুনের শিকার হয়েছেন সেটা একপ্রকার নিশ্চিত। পুলিশের অভিধানে-‘টোটালি ক্লু-লেস’। নার্সিং কলেজের জ্যেষ্ঠ শিক্ষিকা অঞ্জলী দেবী (৫২), সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসীন কলেজের শিক্ষার্থী মিশন বিশ্বাস (২৩) এবং প্রকৌশলী জ্যোতির্ময় সরকার (৫০) হত্যাকাÐের সাত বছর পরেও পুলিশ খুনের রহস্যভেদ করতে পারেনি।
হত্যার শিকার হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, পুলিশের তদন্তে এখন পর্যন্ত খুনের রহস্য যেমন জানা যায়নি তেমনি খুনিরাও শনাক্ত হয়নি। রহস্যের ঘেরাটোপে থমকে আছে খুনের মামলার তদন্ত। পুলিশের নির্লিপ্ততায় পরিবারের সদস্যরা হত্যাকান্ডের বিচার প্রাপ্তির আশা হারিয়েছেন।
নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার আ স ম মাহতাব উদ্দিন মামলার তদন্ত কার্যক্রমকে একটি অব্যাহত প্রক্রিয়া উল্লেখ করে পূর্বদেশকে বলেন, যে খুনের মামলাগুলোর কথা বলছেন সেগুলো বেশ কয়েকবছর আগের। আমি মামলাগুলোর তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করবো। আসলে পুলিশ নির্লিপ্ত-একথা বলার সুযোগ নেই। নিশ্চয়ই পুলিশ মামলাগুলোর রহস্যভেদ করতে সক্ষম হবে।

নার্সিং কলেজ শিক্ষিকা অঞ্জলী হত্যা মামলা
বিগত ২০১৫ সালের ১০ জানুয়ারি শীতের সকালে কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বেরিয়ে কয়েক কদম এগুতেই নগরীর চকবাজার তেলিপট্টির মোড় এলাকায় মুখোশধারী সশস্ত্র চার যুবকের হামলার শিকার হন নার্সিং কলেজের জ্যেষ্ঠ শিক্ষিকা অঞ্জলী দেবী। ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার ঘাঁড়, মাথা ও পিঠসহ শরীরের বিভিন্নস্থানে এলোপাথারি কোপানো হয়। মুমূর্ষ অবস্থায় তাকে চমেক হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আধঘন্টা পর তিনি মারা যান। ওইদিন বিকালেই তার স্বামী ডা. রাজেন্দ্র চৌধুরী বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে পাঁচলাইশ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। আলোচিত এ হত্যাকান্ডের পর পাঁচলাইশ থানা পুলিশের পাশাপাশি নগর গোয়েন্দা পুলিশও মামলার তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে।
পুলিশ কর্মকর্তারা প্রত্যক্ষদর্শী ও কর্মস্থলের সহকর্মীসহ বিভিন্ন জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে কিলিং মিশনে ক’জন ছিল তা নিশ্চিত হতে পারলেও খুনিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করতে পারেননি।

কলেজছাত্র মিশন হত্যা মামলা
এ হত্যাকান্ডের দু’দিন পর একই বছরের ১২ জানুয়ারি কর্ণফুলী নদীর সদরঘাট নারিকেলতলা এলাকা থেকে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করা হয় সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসীন কলেজের বিকম পরীক্ষার্থী মিশন বিশ্বাস (২৩) এর লাশ। এ ঘটনায় তার বাবা রতন বিশ্বাস কোতোয়ালী থানায় মামলা করার পর পুলিশ ওই রাতেই বাবুল নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে আশাব্যঞ্জক কোনো তথ্য পাননি তদন্তকারী কর্মকর্তা কোতোয়ালী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. জহিরুল ইসলাম। এরপর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বদল হলেও তদন্ত আর এগোয়নি। মোবাইল ফোনে বন্ধুর সাথে আলাপের পর জিইসি মোড়ে যাওয়ার কথা বলে মিশন আছদগঞ্জের রামজয় মহাজন লেনের বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর তার ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ওই রাতে কোতোয়ালী থানায় জিডি করার পর মোবাইল ফোনের কললিস্টে সর্বশেষ ফিশারীঘাটে তার অবস্থান সম্পর্কে জানা যায়। পরিবারের সন্দেহ, বন্ধুদের কেউ শত্রুতাবশত তাকে হত্যা করে কর্ণফুলী নদীতে লাশ ফেলে দিয়েছে।

প্রকৌশলী জ্যোতির্ময় সরকার হত্যা মামলা
একই বছরের ১৫ জানুয়ারি সকাল নয়টার দিকে প্রকৌশলী জ্যোতির্ময় সরকার (৫০) আগ্রাবাদ সিডিএ ১৩ নম্বর সড়কের বাসা থেকে পতেঙ্গায় কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে বের হন। কিন্তু সন্ধ্যায় অফিস থেকে বাসায় ফিরে না আসায় তার মোবাইলে ফোন দিয়ে তা বন্ধ পাওয়া যায়। সম্ভাব্য সব জায়গায় খবর নিয়েও তার খোঁজ না পেয়ে পতেঙ্গা থানায় একটি জিডি করা হয়। একই দিন দুপুরে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের অদূরে সড়কের পাশ থেকে অজ্ঞান অবস্থায় জ্যোতির্ময়কে উদ্ধার করে এনে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করে স্থানীয় লোকজন। ওই দিন সন্ধ্যায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তার নাম-পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে কেউ নিশ্চিত করতে না পারায় সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে দু’দিন ধরে লাশ চমেক হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়। পরে জিডির সূত্র ধরে পতেঙ্গা থানা পুলিশের কাছ থেকে খবর পেয়ে তার স্ত্রী মর্গে গিয়ে লাশ শনাক্ত করেন। নিহত জ্যোতির্ময় নগরীর পতেঙ্গায় এমজেএল বাংলাদেশ লিমিটেড নামের একটি মবিল পরিশোধন কারখানায় ব্যবস্থাপক পদে কাজ করতেন। এ ঘটনায় পতেঙ্গা থানায় মামলা হলেও পুলিশ এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি কেন কী কারণে প্রকৌশলী জ্যোতির্ময়কে হত্যা করেছে। প্রাথমিকভাবে তিনি মলম পার্টির খপ্পরে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন বলে পুলিশ ধারণা করেছিল। এখনও সেই ধারণাতেই ঝুলে আছে মামলার তদন্ত।