৩০ মিনিটের তান্ডব

38

নিজস্ব প্রতিবেদক

চলতি মৌসুমে কালবৈশাখীর রুদ্র রূপ এবার দেখেছে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা। গতকাল শনিবার মধ্য রাত থেকে আকাশে বিদ্যুৎ চমকানো ও মেঘের গর্জনের সাথে হালকা বৃষ্টির পর সাতসকালে হঠাৎ করেই তুমুল বৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যায়। সকাল সাড়ে আটটা থেকে তীব্র বেগে ঝড়ো হাওয়া আকারে শুরু হওয়া এই কালবৈশাখী ঝড় নয়টা পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। এতে গাছপালার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নষ্ট হয়েছে ক্ষেতের ফসল। কোথাও কোথাও বিচ্ছিন্ন হয়েছে বিদ্যুৎ সংযোগ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তীব্র বেগে কালবৈশাখী ঝড় চলাকালে সমুদ্রকন্যা কক্সবাজার জেলার চকরিয়ায় গাছ ভেঙে পড়ে যুবকের মৃত্যু হয়েছে। ওই অঞ্চলের মহেশখালীতে স্কুলের টিনের চালা উড়ে গিয়ে সাত শিক্ষার্থী কমবেশি আহত হওয়ার খবর মিলেছে। বিভিন্ন স্থানে গাছ উপড়ে পড়ার কারণে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়কে দুই ঘন্টা যানবাহন চলাচল ছিল বন্ধ। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায়ও।

নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা
বান্দরবানের নাইক্ষংছড়ি উপজেলার বাইশারীতে ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে লন্ডভন্ড হয়ে গেছে পুরো নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলাসহ বাইশারীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বসতঘর, বিভিন্ন ফলের বাগান, রাবার বাগান, সৃজিত গাছের বাগান ও ফসলের ক্ষেত। বজ্রপাত ও শিলা বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিভিন্ন এলাকার জনবসতি, গাছপালা পোল্ট্রি খামার, উপড়ে গেছে বৈদ্যুতিক খুঁটিও। ফলে পুরো এলাকায় ১২ থেকে ২৪ ঘন্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্টরা।
গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে দশটার দিকে হঠাৎ প্রচন্ড বাতাস ও প্রবল বৃষ্টিতে বাইশারী ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের আলী মিয়া পাড়া দারুল ইহসান নুরানি এবতেদায়ী মাদ্রাসাটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। মাদ্রাসাটির শিক্ষা পরিচালক মাওলানা আবদুল মাবুদ জানান, সকাল সাড়ে দশটার দিকে ক্লাস চলাকালীন সময়ে প্রচন্ড বাতাস ও বৃষ্টিতে কিছু বুঝার আগেই মাদ্রাসার টিনের চাল বেড়া উপড়ে নিয়ে যায়। ঐ সময় প্রাল রক্ষার জন্য ছাত্র ও শিক্ষকরা কোনো রকমে রক্ষা পায়। এসময় ৩ শিক্ষার্থী আহত হয় বলে জানান তিনি। আহতরা হলো আমেনা খাতুন (১২), সাইফুল ইসলাম (১০) ও নুরনবী (১১)। এরা সবাই ৮নং ওয়ার্ডের আলী মিয়া পাড়ার বাসিন্দা। আহতদের স্থানীয় বাজারে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
বাইশারী ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. আবু তাহের জানান, গাছপালা উপড়ে ও ভেঙে গিয়ে নারিচবুনিয়া-বাইশারী সড়ক বন্ধ হয়ে গেছে।
বাইশারী ইউপি চেয়ারম্যান মো. আলম কোম্পানি বলেন, আমি ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি প্রশাসনকে অবগত করেছি। ওয়ার্ড মেম্বারদের ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করার জন্য পরামর্শ দিয়েছি।

চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়ক সড়ক
৩০ মিনিটের কালবৈশাখী ঝড়ের তান্ডবে লন্ডভন্ড অবস্থা হয়েছে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়কে। ঝড়ে গুইমারা উপজেলার ডাক্তারটিলা ও জালিয়াপাড়া এলাকায় বড় গাছ উপড়ে পড়ার কারণে খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম সড়কের যানবাহন চলাচল প্রায় দুই ঘণ্টা বন্ধ থাকে। ঝড়ের বেগ কমে এলে দুই ঘণ্টার চেষ্টায় সড়ক যোগাযোগ সচল করে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মীরা। সেময়ও পুরো গুইমারা উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহও বন্ধ হয়ে যায়।
অপরদিকে, কালবৈশাখী ঝড়ের তান্ডবে খাগড়াছড়ি-চট্টগ্রাম ও ঢাকা আঞ্চলিক সড়কের আলুটিলা ও গুইমারা এবং খাগড়াছড়ি-রাঙামাটি সড়কের টিটিসি খাগড়াছড়ি-পানছড়ি সড়কে বৈদ্যুতিক খুঁটি ও গাছ ভেঙ্গে পড়ে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও রেড ক্রিসেন্টের সদস্যদের চেষ্টায় দুই ঘণ্টা পর সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল হলেও অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল দিনের অধিকাংশ সময়।
খাগড়াছড়ি ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক শাহরিয়ার চৌধুরী বলেন, কালবৈশাখী ঝড়ে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়কের উপর বিদ্যুতের খুঁটি ও গাছপালা ভেঙে পড়ে। খবর পেয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে সড়ক থেকে খুঁটি ও গাছপালা সরিয়ে যানবাহন চলাচলের উপযোগী করা হয়।

মহেশখালীতে স্কুলের চালা উড়ে গিয়ে শিক্ষার্থী আহত
সীমান্তবর্তী কক্সবাজার জেলার সমুদ্র উপক‚লীয় উপজেলা মহেশখালীতে কালবৈশাখী ঝড়ে পূর্ব হরিয়ারছড়া বঙ্গবন্ধু বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নামে এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সেমিপাকা স্কুল ঘরের টিনের চালা উড়ে গিয়ে অন্তত সাত শিক্ষার্থী কমবেশি আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এসময় ওই স্কুলে প্রতিদিনের মত শ্রেণি কার্যক্রম চলছিল। আহতদের মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির শিক্ষার্থী মুনতাহা মাথায় আঘাত পেয়ে অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। বাকি শিক্ষার্থীদের স্থানীয়ভাবে ও মহেশখালী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রহমত উল্লাহ জানান, বিদ্যালয়ে প্রতিদিনের মত ক্লাস চলাকালে সকাল বেলা হঠাৎ কালবৈশাখী ঝড়ে স্কুলঘরটির টিনের চালা উড়ে যায়। সেমিপাকা দেয়ালেও বেশ কিছু অংশ ধসে পড়ে। এতে সাত শিশু শিক্ষার্থী আহত হয়। মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়া শিক্ষার্থী মুনতাহা স্থানীয় হরিয়ার ছড়ার আলম সওদাগরের মেয়ে।
এদিকে খবর পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত স্কুলঘরটি পরিদর্শন করেছেন মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ ইয়াছিন। স্কুল ঘর ভেঙে শিক্ষার্থী আহতের ঘটনায় স্থানীয় সাংসদ আশেক উল্লাহ রফিক তা মেরামতের জন্য নগদ লাখ টাকা অনুদান ও আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়ার ঘোষণা দেন।

চকরিয়ায় গাছ চাপা পড়ে যুবকের মৃত্যু
কালবৈশাখীর তান্ডব চলাকালে কক্সবাজারের চকরিয়ায় গাছ চাপা পড়ে আব্দুস শুক্কুর (৩৮) নামের এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। সকালে উপজেলার হারবাং ইউনিয়নের দুই নম্বর ওয়ার্ডের শান্তিনগর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত আব্দুস শুক্কুর ওই এলাকার নুরুল হোসাইনের ছেলে।
আব্দুস শুক্কুরের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে হারবাং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মেহরাজ উদ্দিন মিরাজ জানান, শনিবার সকালের দিকে প্রচন্ড গতিবেগে কালবৈশাখীর ঝড়ো হাওয়া শুরু হয়। এমন সময় বাইরে কাজ করছিলেন আব্দুস শুক্কুর। বাতাসের তোড়ে হঠাৎ উঠানের একটি গাছ ভেঙে তার ওপর পড়ে। এতে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান। বিষয়টি প্রশাসনকে জানিয়ে পরিবারের কাছে লাশ হন্তান্তর করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, এর আগে গত ২০ এপ্রিল সারাদেশের বেশ কয়েকটি জেলার সাথে চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপর দিয়েও প্রথম দফায় কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যায়। এতে কোথাও কোথাও গাছপালা ও ঘরবাড়ির ক্ষতি হয়। বিদ্যুৎ সংযোগ লন্ডভন্ড হয়ে যায়। ওই দফায় মিরসরাই সদর ইউনিয়নে বোরো ধান, ডাল, সবজি ফসলের বেশি ক্ষতি হয়েছে। বাতাসের তীব্র বেগে ধুম ইউনিয়ন, কাটাছড়া ইউনিয়ন, হাইতকান্দি ইউনিয়ন, ওয়াহেদপুর ইউনিয়ন, ইছাখালী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় গাছ ভেঙে পড়ে বিদ্যুতের লাইন, খুঁটি ও মিটার সংযোগের ব্যাপক ক্ষতি হয়। একইসময়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামের লোহাগাড়াতেও কালবৈশাখী ঝড়ের সাথে শিলাবৃষ্টি হতে দেখা গেছে। শিলা বৃষ্টি ও প্রবল বাতাসে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেশ কিছু ঘরবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। নষ্ট হয় বিভিন্ন ফসল ও শাক সবজির ক্ষেত। ওইদিনের কালবৈশাখীর তান্ডব সকাল সাড়ে আটটায় শুরু হয়ে ২০ মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী ছিল।