২৬ হাজার গাছের ‘নিধনযজ্ঞের’ ভয়

41

রাহুল দাশ নয়ন

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সদরদপ্তর সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণ হলে গাছ কাটা পড়বে। এতে পরিবেশ বিপন্ন হবে। মানুষের শ্বাস নেয়ার জায়গাটুকুই হারিয়ে যাবে। যে কারণে ‘সিআরবিতে হাসপাতাল নয়’ ইস্যুতে উত্তাল চট্টগ্রাম। সেখানে থাকা ছোটবড় গাছ কেটে পরিবেশ বিনষ্ট করে হাসপাতাল নির্মাণের বিরোধিতা করছে চট্টগ্রামবাসী। হাসপাতাল হলে কতগুলো গাছ কাটা হবে তার হিসেব না মিললেও এই সিআরবিতে কত গাছ আছে তার আংশিক ধারণা মিলেছে বন বিভাগের তথ্যে। যার বৃহৎ অংশটিই শিরিষ গাছ। বন বিভাগ সূত্র জানায়, রেল বিভাগের টাইগারপাস সংলগ্ন পাহাড় ও সিআরবিতে ২০০৭-০৮ সালে ১০.৫০ হেক্টর এলাকায় ২৬ হাজার ২৫০টি গাছ রোপণ করা হয়। এ গাছগুলোর বয়স এখনো ১২ বছর পূর্ণ হয়নি। তারো আগে ১৯৯৩-৯৭ সাল পর্যন্ত টাইগারপাস, সিআরবি ও পাহাড়তলী এলাকায় একত্রে ২৭.৬২ হেক্টর জমিতেও গাছ রোপণ করা হয়। সবমিলিয়ে সিআরবি ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ৩৮.১২ হেক্টর বা ৯৪ একর জমিতে গাছ রোপণ করেছে বন বিভাগ। তারো আগে শতবর্ষী শিরীষ গাছের অস্তিত্ব ছিল। যেগুলো এখনো আছে।
সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণের জন্য উদ্যোগ নেয়া হলেও এখনো পর্যন্ত বন বিভাগের পক্ষ থেকে কোনোরূপ অনুমোদন নেয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রামের বন সংরক্ষক মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল সরকার। তিনি জানান, ‘সিআরবিতে বৃক্ষ কাটার বিষয়ে আমাদের সাথে কেউ যোগাযোগ করেনি। তবে অন্য সংস্থার ক্ষেত্রে গাছ কর্তনের জন্য আমাদের কাছে আসতে হবে এমন একটি রুল আছে। তখন আমরা রুল অনুযায়ী যাচাইবাছাইয়ের পর গাছ কর্তনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিই। এক্ষেত্রে কিছু সংস্থার নিজস্ব কিছু রুলও থাকে। যেগুলোর আলোকে আমাদের কাছে অনেক সংস্থাই আসে না। সিআরবিতে গাছ রোপণ হলেও অনেক আগে হয়েছে। যা আমার জানার কথা না। সেখানে যদি গাছ রোপণ হয়ে থাকে তা জানবে উত্তর বন বিভাগ।’
এ বিষয়ে জানতে উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোজাম্মেল হক শাহ চৌধুরী মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার কল দেয়া হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে উত্তর বন বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘২০০৭-০৮ অর্থ বছরে ভূমিধস রোধে চট্টগ্রামের বিভিন্ন পাহাড়ে গাছ রোপণ করা হয়। সেসময় সিআরবি ও আশপাশের এলাকাতেই ২৬ হাজারের অধিক গাছ রোপণ করা হয়। যা এখনো আছে। এসব গাছের অধিকাংশই ছিল শিরীষ শ্রেণির গাছ। সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণ হলে শতবর্ষী গাছগুলোর পাশাপাশি এই ২৬ হাজার গাছের অকাল মৃত্যু ঘটবে।’
জানা যায়, ২০০৬-০৯ পর্যন্ত এই তিন বছরে নগরীতে ভূমিধসের সম্ভাবনা আছে এমন ঝুঁকিপূর্ণ ৫৬ হেক্টর জমিতে এক লক্ষ ৪০ হাজার ১০০টি চারা রোপণ করা হয়। এরমধ্যে লেবু বাগান ও কাইচ্চাঘোনায় ১২ হাজার ৬০০টি, পরিবেশ অধিদপ্তর অফিস কম্পাউন্ড ও সংলগ্ন পাহাড়ে ৫০০টি, রেল বিভাগের টাইগারপাস সংলগ্ন পাহাড়, সিআরবি এলাকায় ২৬ হাজার ২৫০টি, বাটালি হিলে সাত হাজার, চসিকের মালিকানাধীন বাটালি হিলে (মতিঝর্ণার উপরে) তিন হাজার ৭৫০টি, সেকান্দর কলোনিতে ১২ হাজার ৫০০টি, চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট, ভাটিয়ারী এলাকায় ৫০ হাজার, পাঁচলাইশ হিলভিউতে দুই হাজার ৫০০টি ও মতিঝর্ণা, চসিকের কবরস্থান সংলগ্ন পাহাড়ে ২৫ হাজার চারা রোপণ করা হয়। এছাড়াও প্রতিষ্ঠান বনায়নের আওতায় প্রায় ২০ হাজার চারা রোপণ করা হয়।
১৯৯৩-৯৫ সাল পর্যন্ত নগর বনায়ন প্রকল্পের আওতায় ফয়’স লেক, চট্টগ্রাম সেনানিবাস, সিআরবি, চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা, কাস্টম একাডেমি (বিসিএসআইআর) ৩২০ হেক্টর জমিতে বøগ বাগান সৃজিত হয়। এছাড়াও ১৯৯৩-৯৭ সাল পর্যন্ত সিটি কর্পোরেশন ও মহানগর এলাকার ৯৩.৫ কিলোমিটার সড়কে বনায়নের আওতায় আনা হয়। শহরজুড়ে রোপিত এত গাছ গেল কোথায়?
রোপিত এসব গাছ উন্নয়নের নামে বিভিন্ন সময় কাটা হলেও এখনো ভাটিয়ারী, চট্টগ্রাম সেনানিবাস, পাহাড়তলী ও সিআরবিতে কিছু গাছের অস্তিত্ব আছে। সিআরবিতে রোপিত গাছগুলোও একই ধারায় কাটার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এক জায়গায় প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও পুরো সিআরবিজুড়েই এখন গাছ কাটা আতঙ্ক।
সিআরবিতে নাগরিক সমাজের সভায় বক্তব্যকালে মুক্তিযোদ্ধা গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘নগরের মধ্যে ঘুরলে শুধু সিআরবিতেই কিছু গাছ দেখা যায়। যে কারণে এটি নগরবাসীর হৃদপিন্ডে পরিণত হয়েছে। এখানে হাসপাতাল নির্মাণ হলে প্রচুর গাছ কাটা পড়বে। সিআরবির যে এলাকায় হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে সেখানে আমি হেঁটে গাছ গুনেছি। ২৭০টি পর্যন্ত গাছ আমি গুনেছি। হয়তো ফাঁকফোকরে আরো কিছু গাছ থাকতে পারে। এ গাছগুলো কাটা হলে মানুষের শ্বাস নিতে কষ্ট হবে।’