হ্যাক নাকি পাসওয়ার্ড বেহাত?

18

নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) পাঁচটি ওয়ার্ড থেকে অবৈধভাবে জন্মনিবন্ধন সনদ ইস্যু করার ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। চক্রটি ৫ হাজার জন্মসনদ তৈরি করেছে বলে দাবি পুলিশের। অন্যদিকে চসিক বলছে- গত দুই সপ্তাহ ধরে ৫৪৭টি সনদ ইস্যু করেছে চক্রটি। সংখ্যা অমিল হলেও প্রশ্ন উঠেছে, হ্যাকের মাধ্যমে নাকি কাউন্সিলরের আইডি-পাসওয়ার্ড বেহাত হওয়ায় এমন জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে অধিকতর তদন্তের দাবি তুলে পুলিশ সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা না দিলেও কাউন্সিলর কার্যালয়ের যোগসূত্র খতিয়ে দেখতে মাঠে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
গতকাল চসিকের ১৩নং পাহাড়তলী ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়ে এ অভিযান পরিচালনা করে সংস্থাটি। অভিযানে কাউকে গ্রেপ্তার করা না হলেও কাউন্সিলর কার্যালয়ের বিভিন্ন নথি সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দুদক চট্টগ্রাম-১ এর সহকারী পরিচালক ফয়সাল কাদের।
চসিকের আইটি শাখা জানায়, গত ৮ জানুয়ারি ৩৮নং দক্ষিণ-মধ্যম হালিশহর ওয়ার্ডেই প্রথম এ সমস্যা দেখা দেয়। পরে ১১ জানুয়ারি জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয়ে চিঠি দেয় চসিক। ওইদিন থেকে ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত একই সমস্যা পাঁচটি ওয়ার্ডে দেখা মেলে। ওয়ার্ডগুলো হলো নগরীর ১১নং দক্ষিণ কাট্টলি, ১৩নং পাহাড়তলী, ৩২নং আন্দরকিল্লা, ৩৮নং দক্ষিণ মধ্যম হালিশহর, ৪০নং উত্তর পতেঙ্গা ওয়ার্ড। এসব ওয়ার্ড থেকে ৫৪৭টি জন্মসনদ জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে থানায় সাধারণ ডায়েরি, মামলা পর ছায়া তদন্ত শুরু করে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। এরপরেই মূলত চক্রের চার সদস্য ধরা পড়ে। একইসাথে আপদকালীন প্রতিরোধ হিসেবে আক্রান্ত পাঁচটি ওয়ার্ডের জন্মনিবন্ধন আইডি বøক করে রেখেছে সিটি কর্পোরেশন। বাকি ওয়ার্ডগুলোতেও সতর্কতার সাথে কাজ করার পাশাপাশি আইডি-পাসওয়ার্ড পরিবর্তনের নির্দেশ দিয়েছে চসিক।
অন্যদিকে ঢাকা থেকে নির্দেশনা আসাঅবধি পাঁচ ওয়ার্ডের জন্মনিবন্ধন প্রক্রিয়া বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সনদ জালিয়াত চক্রের গ্রেপ্তার বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন সিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের উপ-কমিশনার ডা. মঞ্জুর মোর্শেদ। এসময় অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আসিফ মহিউদ্দীন, সহকারী কমিশনার দেলোয়ার হোসেন, পরিদর্শক সঞ্জয় সিনহাসহ ইউনিটের কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে ডা. মঞ্জুর মোর্শেদ বলেন, জন্মসনদ ইস্যুর ঘটনায় আটককৃত চক্রটিসহ আরও একাধিক গ্রæপ জালিয়াতি কার্যক্রম দীর্ঘদিন যাবৎ সক্রিয়। এ পর্যন্ত তারা ৫ হাজারেরও অধিক জন্ম নিবন্ধন সনদ ইস্যু ও বিতরণ করেছে। সারাদেশে সক্রিয়ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তাদের মতো এমন একাধিক জন্মসনদ জালিয়াত চক্রের সন্ধান আমরা পেয়েছি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ‘জন্ম নিবন্ধন সেবা’ ‘জন্মনিবন্ধন সংশোধন সেবা’ ‘জন্ম নিবন্ধন হেল্প সেন্টার’ ইত্যাদি নামে বেনামে গ্রুপ খুলে তাতে স্বল্প সময়ে ও স্বল্পমূল্যে জন্মসনদ প্রদানের পোস্ট করেন জালিয়াত চক্রের সদস্যরা।
আটক চক্রটি তাদের অপরাধ স্বীকার করেছে জানিয়ে অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আসিফ মহিউদ্দীন বলেন, আটক চারজনের একজন ১৬ বছরের কিশোর জহির আলম। করোনায় টিকা দিতে গিয়ে তার মায়ের জন্ম সনদে ভুল পায়। ফেসবুক গ্রুপের সহযোগিতায় সে তার মায়ের জন্ম নিবন্ধনের ভুল সংশোধন করে। পরে ফেসবুক ভিত্তিক এমন গ্রুপে জড়িয়েছে নিজেই। সাথে ছিল তার আপন দুলাভাই মোস্তাকিম। শালা-দুলাভাইয়ের সাথে অটক অপর দুই জন হলো দেলোয়ার হোসাইন সাইমন, আব্দুর রহমান আরিফ। তাদের দুইজনের কম্পিউটার সংক্রান্ত টাইপ, প্রিন্টের ব্যবসা রয়েছে।
গ্রেপ্তাকৃতরা হলেন মো. জহির আলম (১৬), মোস্তাকিম (২২), দেলোয়ার হোসাইন সাইমন (২৩) ও মো. আব্দুর রহমান আরিফ (৩৫)। অভিযানের সময় তাদের কাছ থেকে সিপিইউ, ৩টি মনিটর, ১টি স্ক্যানার কাম প্রিন্টার, ১টি প্রিন্টার এবং ৪টি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়।
হ্যাকের চেয়ে কাউন্সিলর কার্যালয় থেকে পাসওয়ার্ড বেহাত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে দাবী সংশ্লিষ্ট অনেকের। কেননা সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলরের জন্য নির্দিষ্ট আইডি থাকলেও অনেক সময় তা তাদের ব্যক্তিগত সহকারী ও জন্মনিবন্ধন সহকারীরা ব্যবহার করে থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ওয়ার্ড কাউন্সিলরের আইডির পাসওয়ার্ড তাদের ব্যক্তিগত সহকারী ও জন্মনিবন্ধন সহকারীর কাছে থাকে। সিটি কর্পোরেশনের এক কর্মকর্তা মনে করেন। এই কারণে আইডি হ্যাকের ঝুঁকি তৈরি হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, পাঁচটি ওয়ার্ডে জন্মনিবন্ধন সনদ নিয়ে জালিয়াতির ঘটনার পর সব ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেটি হচ্ছে- তারা যেন তাদের ব্যক্তিগত আইডির পাসওয়ার্ড ব্যক্তিগত সহকারী বা জন্মনিবন্ধন সহকারীকে না দেন।
অনেকটা এরকম ইঙ্গিত দিয়ে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. রাশেদুল হাসান পূর্বদেশকে বলেন, আমার মূল ওয়েবসাইটি দেশ ছাড়াও পুরো পৃথিবীজুড়ে চলছে। সাইট হ্যাক হয়নি। সবমিলিয়ে প্রায় ১২ হাজার ইউজার আইডি-পাসওয়ার্ড রয়েছে। দেশের বাইরে এম্বাসিগুলোতে শিক্ষিত লোকজন করে তাই কোনো সমস্যা হয় না। দেশেরগুলোতে সমস্যা হওয়ার কারণ হলো জনপ্রতিনিধি ও জন্মনিবন্ধন সহকারী নিজেরা কম্পিউটার বুঝে না। তাই অন্যের সহায়তা নিয়ে এসব করে থাকে। গ্রাম পর্যায়ে তো উদ্যোক্তার নামে সম্পূর্ণ তৃতীয় ব্যক্তিকে এসব আইডি-পাসওয়ার্ড হস্তান্তর করা হয়। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের যে গত ১১ তারিখ থেকে এ সমস্যা চলছে তা আমাকে জানায়নি। আমি জেনেছি গতকাল (সোমবার) রাতেই। জানার পরই তালিকা অনুসারে ৫৪৭টি জন্মসনদ বাতিল করার কাজ চলছে। একইসাথে আমরা তদন্ত করে দেখছি, কিভাবে আইডি-পাসওয়ার্ড প্রতারক চক্রের হাতে গেল। বের করা কঠিন কিছু হবে না। কেননা যারা জন্মনিবন্ধন করেছে তারা জানে কাদের মাধ্যমে করিয়েছে। সূত্র ধরে টান দিলে সহজে বেরিয়ে আসবে বলে মন্তব্য করেন রেজিস্ট্রার জেনারেল মো. রাশেদুল হাসান।
চসিক ছাড়া দেশের অন্যত্র কোথাও এমন ঘটনা ঘটেছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ সময়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ছাড়া কোথাও এমন ঘটনা ঘটেনি। মাঝে মাঝে অভিযোগ পাই, তবে হাতে গোনা কয়েকটি। এগুলো আমরা সাথে সাথে বাতিল করি এবং ইউজার পাসওয়ার্ড চ্যাঞ্জ করলে ঠিক হয়ে যায়। পুলিশ ৫ হাজার বলছে, এতগুলো হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। তবুও তালিকা দিলে আমরা সাথে সাথে সনদগুলো সরানোর ব্যবস্থা নিব’।