হৃদ ক্যানভাসে আজো ভাসে শৈশবের ১০ মাঘ

18

 

একি চমৎকার, / ভান্ডারেতে আজগবি কারবার,
মানুষ ধরার কল বসাইল/ দেখবি গেলে মাইজভান্ডার,
ভান্ডারেতে আজগবি কারবার,
কিংবা
কে তুমি হে সখা, আড়ালে থাকিয়া
হরিলে আমারি প্রাণ,
ছলনা কৌশলে, জগৎ মজালে
এমন মোহিনী জান।
চট্টগ্রাম তথা সারাবিশ্বের আধ্যাত্বিক সাধক পুরুষ হযরত সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (ক.) মাইজভাÐারি ও তদ্বীয় ভাতুষ্পুত্র সৈয়দ গোলামুর রহমান (ক.) মাইজভান্ডারিকে নিয়ে কবিয়াল রমেশ শীলসহ অসংখ্য লেখকের লেখা এমন মাইজভান্ডারি গানের সাথে আমাদের পরিচয় শৈশব থেকেই। আমাদের গ্রামের বাড়ি ফটিকছড়ি ধর্মপুর গ্রামের যোগীরহাট পরবর্তীতে আজাদীবাজার সংলগ্ন মুন্দার বাড়ি। মাইজভান্ডার দরবার শরীফ থেকে মাইলচারেক দূরের পথ। সংগত, কারণেই মাইজভাÐার শরীফের নানা ওরস খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে আমার।ওরসকে কেন্দ্র করে বাড়ির সামনের পথ দিয়ে দূরদূরান্ত থেকে লোকজন বর্ণিল পতাকা আর ঢোলের তালে তালে মাইজভান্ডার দরবার শরীফে নিয়ে যেতো মহিষ, গয়াল, গরু, ছাগল আরো কতো কি। আমরা তন্ময় হয়ে দেখতাম কালো কালো বিশালাকার মহিষ, গয়াল ইত্যাদি নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য। এসব পশুর গায়ে লাল রঙের কাপড়, জড়ি ইত্যাদি সাজানো হতো দারুনভাবে। দেখে মনে হতো এই বুঝি তেড়ে এলো ওরা। ঢোলের তালে তালে কতদূর যে পেছন পেছন গিয়েছি তার হিসেব কে রাখে।
যখন একটু বড় হলাম তখন ওরসে যাবার জন্য প্রস্তুতি নিতাম নানাভাবে। তখনো আমরা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থী। ওরসে যাওয়ার পেছনে প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ওরসকে কেন্দ্র করে দরবার শরীফের চারপাশে বসা বিশাল মেলা। যেখানে পাওয়া যেতো নানারকম মন্ডামিঠাই, মুড়িমুড়কি, বাতাসা, মিহিদানা, টাট্টুঘোড়া, তালপাতার সেপাই, বেতের শীতল পাটি, হাতপাখা, নাগরদোলা আরো কতো কি।
কিন্তু এসব থাকলেতো হবে না হাতে থাকা চাই পয়সা। নয়তো এসব কিনবো কেমন করে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে টাকা দেবে কে ? সে সময় বাবা-মায়ের কাছে চাইলেই পয়সা জুটতো না। সুতরাং নিজেকেই জোগাড় করতে হতো পয়সা।
মাইজভান্ডার দরবার শরীফের প্রধান ওরসটি অনুষ্ঠিত হতো ১০ই মাঘ। এইদিনে ওরস হওয়ায় আমরা বাড়তি কিছু সুবিধা পেতাম। কারণ তখন স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা হয়ে যেতো। পড়াশোনার চিন্তু খুব একটা থাকতো না কারোই। আশপাশের মাঠে চলতো পাকা ধান কাটার উৎসব। চাষিরা সেই ধান নিয়ে যাবার সেখানে পড়ে থাকতে বেশকিছু ধানের গোছা। বন্ধুরা সবাই মিলে বিলে বিলে ঘুরে সেই ধান সংগ্রহ করতাম। বাড়ির অপেক্ষাকৃত অসচ্ছল লোকজন এসব ধান কিনে নিতেন আমাদের কাছ থেকে। সেখান থেকে মিলতো কিছু টাকা। আমাদের পুরোনো গুদাম ঘরের সামনে যে কাচারিটি দাঁড়িয়ে আছে একসময় সেটি ছিল বেতবন। এক একটি বেত যেন উপরে উঠতে উঠতে আকাশ ছুঁতে চায়। বেশ রগরগে ছিল সেসব বেত।বনে এত বেত ছিল যে, এসব বেত কেটে নিলে কেউই কিছু বলতো না। আমরা সেই বেত পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে চাকা বানিয়ে সেগুলো নিয়ে যেতাম বাড়ি থেকে কিছুদুরের মোহাম্মদ তকিরহাটে যেটা মাহাত্তেরহাট নামেই অধিক পরিচিত। মনে অনেক আশা নিয়ে যেতাম এসব বিক্রি করে বেশকিছু টাকা আয় করবো। কিন্তু হাটে ঘটতো নানা বিপত্তি। হাটের হাসিলদার চেয়ে বসতো মাত্রাতিরিক্ত হাসিলদার। কিন্তু বেত বিক্রি না হলে হাসিল দেবো কোথা থেকে। এই বিষয়টি কোনভাবে বোঝানো যেতো না বেরসিক হাসিলওয়ালাকে। নাছোরবান্দা হাসিলওয়ালার কাছে কোন যুক্তিই যুক্তি বলে মনে হতো না। এক পর্যায়ে কষ্ট করে সংগ্রহ করে আনার বেতের মধ্যে লোভনীয় বেতটাই নিয়ে যেতো হাসিলের পরিবর্তে। দু:খে চোখ বেয়ে পানি পড়তো রীতিমতো। যাই হোক, এভাবে এক-দুই হাট ঘুরে পাঁচ-সাত টাকা জোগাড় হতো। আমার খুশী আর দেখে কে।টাকা জোগারের আরেকটি উৎস ছিল মার্বেল খেলায় জেতার মার্বেল বিক্রির পয়সা।
এক সময় আসতো সেই মাহিন্দ্রক্ষণ। প্রচন্ড ঠান্ডায় জমে যাওয়া ১০ই মাঘ। আগেরদিনই চলে যেতাম মাইজভান্ডার দরবার শরীফের পাশে দাদির বাপের বাড়ি কলিমুল্লাহ সওদাগর বাড়িতে।
বলে রাখি, সেসময় আজকের মতো এত পিচঢালা রাস্তা ও কিংবা গাড়িঘোড়া খুব সহজলভ্য ছিল না। আবার গাড়িতে চড়লে অনেক কষ্টে জমানো টাকা খরচ হবার ভয়। সুতরাং এ বাড়ি সে বাড়ির উঠোন, ঘাঁটা, পুকুরপাড়, ধু ধু ধান ক্ষেত ধরে চলে যাওয়া মেঠো পথকেই বেচে নিতাম আমরা।
আগেরদিন বিকেলে জোগাড় করা টাকাকে সম্বল করে যোগীরহাটের পেছন ধরে হাঁটা শুরু করতাম। একসময় কোদালধোয়া দিঘী, বক্তপুর দায়রাবাড়ি,কমল উদ্দিন মুন্সি বাড়ির সামনের রাস্তা,নানুপুর বড়ুয়া পাড়া, বিনাজুরি হয়ে একসময় পৌঁছে যেতাম কলিমুদ্দিন সওদাগর বাড়ি। চলার পথে ভয়ডর কিছুই কাজ করতো না, কারণ আমার মতো ছোট-বড়, চেনা-অচেনা আরো অনেকেই থাকতো সেই কাফেলায়। পথে বিভিন্ন বাড়ির উঠোন-ঘাঁটায় অনেকে শরবত, চাসহ নানা পসরা সাজিয়ে বসতো। খুব ক্ষিধে কিংবা পিপাসা পেলেও খাইনি কিছুই। কারণ, আমার মন পড়ে থাকতো মাইজভাÐারের ওরসের মেলায়।
দাদির ভাইপো এয়ার মোহাম্মদ ছিল আমার সমবয়সী। পরববর্তীতে স্থানীয় একটি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন।আমাকে পেয়ে এয়ারুর আনন্দ যেনো আর ধরতো না। বাড়ির বৌ-ঝিরা আমাদের জন্য ছোট মাছ ভাজা, বড় মাছে কালিয়া কোপ্তাসহ নানা মুখরোচক খাবারের আয়োজন করতেন। যত পারো খাও, কোনো বাধা নেই। আহা, সেই স্বাদ যেনো আজো লেগে আছে মুখে।
সেসময় মাইজভান্ডার দরবার শরীফে আজকের মতো এত বড় বড় দালান ছিলনা। ছিল না এত জৌলুস। যেহেতু যোগাযোগের ব্যবস্থা একেবারেই নাজুক ছিল সেই কারণে এতলোকের সমাগমও হতো না। ফলে, রাতে খাওয়া দাওয়া করে আমি আর এয়ার মোহাম্মদ বের হয়ে যেতাম মাইজভান্ডার দরবার শরীফ ঘুরতে। দুর থেকে দেখতাম, হযরত সৈয়দ দেলাওয়ার হোসাইন মাইজভান্ডারিসহ অনেককে। হুজরাখানার সামনে সাদা লুঙ্গি,সাদা ফতুয়া আর একজোড়া অতি সাধারণ চটি পায়ে দিয়ে বসে থাকতেন তিনি। চারপাশে ভক্তরা উনাকে ঘিরে বসে থাকতো। তখনো বুঝতাম না তিনি কতো বড়মাপের বুজুর্গ। তাই এত কাছ থেকে দেখেও খুব বেশি আমলে নিতাম না আমরা। ঘুরে ঘুরে দেখতাম দরবার শরীফের এখানে সেখানে মহিষ, গরু জবাই করা, সেগুলো কাটাকুটি করে তবারুক পাকানোর আয়োজন। খুব খেতে ইচ্ছে হতো এসব বিরিয়ানি। কিন্তু ছোট বলে কেউ আমাদের খুব একটা গুরুত্ব দিতেন না। তবে আমাদের শিশুমনের সেই স্বাদ পূরণ করতেন আমাদের বাড়ির নোয়া মিয়া চাচা।নোয়া মিয়া চাচারা সেসময় মাইজভান্ডারে ভলান্টিয়ারের দায়িত্ব পালন করতেন। আমাদের দেখে পরম মমতায় খেতে দিতেন গরম গরম ভাত আর মাংস।
পরিণত বয়সে এসে মনে পরে আমি তখন সপ্তম কি অষ্টম শ্রেনীর ছাত্র। সেবার ১০ মাঘের ওরসটি হয়েছিল শুক্রবার। সেদিন জুমার নামাজের ইমামতি করেছিলেন শাহানশাহ সৈয়দ জ্য়িাউল হক (ক.) মাইজভাÐারির বাবাজান সৈয়দ দেলাওয়ার হোসাইন মাইজভান্ডারি (ক.)। সেই জামায়াতে শরীক হয়েছিলাম। অন্যরকম আবেশে ভরে গিয়েছিল মনপ্রাণ।
১০ মাঘের ওরসে এখন লাখো মানুষের সমাগম হয়। দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অসংখ্য মানুষ। এখনো সেইদিনটি আমাকের টানে প্রচন্ডভাবে।কিন্তু বয়সের ভারে নিজেই কাহিল। তাই ইচ্ছে করলেই আগের মতো ছুটে যেতে পারিনা। তবুও প্রতিবছর ১০ মাঘ দিনের বেলা গিয়ে ঘুরে আসি।
অনেকদিন আগেই দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন মমতাময়ী সেই দাদি। বিদায় নিয়েছেন নোয়া চাচাও। আজো সেই মাইজভাÐারের সামনে দিয়ে গেলে মনে পড়ে সেইসব দিনের কথা। চোখে পড়ে চেনা-অচেনা নানা মুখ। নেই দাদি বাড়ির সেসব আন্তরিক মানুষগুলোও। দুনিয়ার নিয়মেই চলে যেতে হয়েছে তাদের সবাইকে।
অনেক বছর আগে ১৯৯৪ সালে বন্ধু এয়ার মোহাম্মদের সাথে দেখা হয়েছিল চাচাতো ভাই সুজার বিয়েতে। চুল-দাঁড়ি পেকে একেবারে সাদা সব একাকার। অনেকবছর পর দুইজন দুইজনকে পেয়ে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলাম অনেকক্ষণ। তারপর আর দেখা হয়নি। শুনেছি, কিছুদিন আগে সেই বন্ধুও চলে গেছে না ফেরার দেশে। দোয়া করি আল্লাহ যেন তাদের জান্নাতবাসী করেন।আমিন।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী