হিমানীশ গোস্বামী

15

 

হিমানীশ গোস্বামীর জন্ম বৃটিশ ভারতের তৎকালীন বাংলার বর্তমানে বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার কালিকাপুরে মামার বাড়িতে ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের ১৮ই মার্চ। তাঁদের আদি বাড়ি ছিল ফরিদপুরেরই রতনদিয়া। পিতা পরিমল গোস্বামী ছিলেন জনপ্রিয় বাঙালি সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও চিত্রগ্রাহক। তার মাতা জ্যোৎস্না দেবী। দাদামশাই ছিলেন বাঙালি কবি যতীন্দ্রনাথ বাগচী ও কাকা জ্ঞানেন্দ্রনাথ বাগচী বিভিন্ন পত্র পত্রিকার প্রাবন্ধিক ছিলেন। সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে তিনি বড় হয়ে ওঠেন। ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে হিমানীশ পিতার সঙ্গে কলকাতার সিঁথির বাড়ীতে চলে আসেন। এখানে রাণী ভবানী স্কুলে তার বাল্যশিক্ষা শুরু। ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে ম্যাট্রিক পাশ করেন । কলকাতার বিদ্যাসাগর কলেজ থেকে স্নাতক হওয়ার পর ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে বিলেত যান কার্টুন আঁকা শিখতে। সেখানে থাকেন ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাস পর্যন্ত । বিলেতে কার্টুন শিক্ষা শেষ করে বেশ কয়েকটি প্রকাশন সংস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করেন। বিখ্যাত বিদেশি প্রকাশন সংস্থা ম্যাকগ্রহিলে তিনি ছিলেন বেশ কয়েক বছর । পরে যোগ দেন আনন্দবাজার পত্রিকায় (১৯৭২-৮৬)। শরৎচন্দ্র পন্ডিত (দাদাঠাকুর) ও শিবরাম চক্রবর্তী দ্বারা প্রভাবিত হিমানীশের লেখায় ছিল অনায়াস লঘু-পরিহাস । কথার ‘পান’ (চঁহ) আর নতুন শব্দ তৈরিতে তার জুড়ি মেলা ভার । সেই সঙ্গে তীক্ষ্ণ-রসসমালোচনায় বিদ্ধ করতেন রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে জনপ্রিয় সাহিত্যিকের রচনাকেও । হিমানীশের কথায়-
‘বাবা বিশিষ্ট লেখক-সাংবাদিক হওয়ায় আমাদের বাড়িতে বহুগুণীমানুষের সমাগম হত। খুব কাছ থেকে দেখেছিলাম দাদাঠাকুরকে, শব্দ নিয়ে ‘পান’ করার অমন মানুষ বিরল। শিবরাম চক্রবর্তীকে কাছ থেকে দেখেছি – উল্লসিত হয়ে উঠেছি তার শব্দের খেলায়।’
ছাত্রাবস্থায় তার লেখা প্রকাশিত হত ‘সচিত্র ভারত’ পত্রিকায়। আর কলেজে পড়ার সময় থেকেই নিয়মিত লেখালেখির কাজ শুরু । ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে এশিয়াটিক সোসাইটির প্রকাশনা উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন। তার প্রথম প্রকাশিত বই টি ছিল ডেল কার্নেগির ইংরাজী গ্রন্থে এর বাংলা অনুবাদ । বিলেতে থাকাকালীন অভিজ্ঞতা নিয়ে তার লেখা ‘লন্ডনের পাড়ায়’ , ‘বিলিতি বিচিত্রা’, ‘লন্ডনের আড্ডায়’। তার বিলেত-বাসের কাহিনীগুলি আজকাল থেকে প্রকাশিত হয়েছে দুই খন্ডে ‘লন্ডন সমগ্র’। ছোটদের কাছেও তিনি ছিলেন প্রিয় লেখক। আর তার লেখার সঙ্গে জড়িয়ে থাকত তারই আঁকা কার্টুনধর্মী ছবিগুলি। শিশু সাহিত্যে সর্বভারতীয় সম্মান ছাড়াও ২০০১ খ্রিস্টাব্দে পেয়েছিলেন ‘প্রাচ্য কলাকেন্দ্র পুরস্কার’। হিমানীশ গোস্বামীর গ্রন্থ সংখ্যা শতাধিক। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি হল – ভাজা মাছ, আমার রামায়ণ, কিট্টু লাহিড়ীর তিন কীর্তি (আনন্দ পাবলিশার্স), বড় গোঁসাইয়ের বন্ধু-বান্ধব (আনন্দ পাবলিশার্স), বুনো হাঁসের সন্ধানে ( আনন্দ পাবলিশার্স), মজার খেলা দাবা (আনন্দ পাবলিশার্স), কলকাতার শয়তান (দে’জ পাবলিশিং), আনন্দনগরী ও অন্যান্য দুঃখের কাহিনী, ভুবনচরার কালোপ্যাঁচা (দে’জ পাবলিশিং), বাংলাবন্ধ, শেষের শুরু, হাসতে হাসতে (পুনশ্চ), পরচর্চা, ভীষন বিপদ (আনন্দ পাবলিশার্স), তেঁতুলমামার আজব কান্ডকারখানা(প্রতিক্ষণ), কিছু ভূতের কিছু অদ্ভুতের, হারিয়ে যাওয়া ঘোড়ার গাড়ি (করুণা প্রকাশনী), অপদার্থ (প্রতিক্ষণ), জীব্রামের গল্প (লাল মাটি), অভিধানাই-পানাই (সাহিত্য সংসদ) প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘরোগভোগের পর হিমানীশ গোস্বামী ২০১২ খ্রিস্টাব্দের ১৪ ই মার্চ কলকাতার এক নার্সিং হোমে ৮৬ বৎসর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। সূত্র : বাংলাপিডিয়া