হাসপাতাল নির্মাণ উদ্যোগের পর নতুন বিতর্ক

27

নিজস্ব প্রতিবেদক

ফুসফুসখ্যাত সিআরবির তিন প্রবেশমুখে গেট নির্মাণ করছে রেলওয়ে। চলমান আন্দোলনের কারণে হাসপাতালের মূলকাজ শুরুতে যাতে বাধাগ্রস্ত না হয় সেজন্য এ গেট নির্মাণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও ভারী যান চলাচল বন্ধ করতেই গেট নির্মাণের কথা বলছে রেলওয়ে। তবে উন্মুক্ত ও সাংস্কৃতিক বলয়ে আবদ্ধ থাকা সিআরবি ঘিরে এমন কর্মকান্ডে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে নাগরিক সমাজ। নান্দনিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত সিআরবিকে উন্মুক্ত রাখার দাবি জানিয়েছে চট্টগ্রামবাসী।
সিআরবি ঘুরে দেখা যায়, তিন প্রবেশপথে গেট বসানোর উদ্যোগ নেয়া হলেও মূলত গেট নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে কদমতলী অংশের প্রবেশপথে। এখনো উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও টাইগারপাস অংশে গেটের অবকাঠামো নির্মাণ শুরু হয়নি। হাসপাতাল নির্মাণে বরাদ্দকৃত জায়গা ফাঁকা করা হচ্ছে। সিআরবির গোয়ালপাড়ার মুখে মানুষের প্রবেশাধিকার স্থায়ীভাবে বন্ধে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। সেখানে প্রবেশে অন্যরাস্তা ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে রেলওয়ে। গোয়ালপাড়ার মুখে কমপক্ষে ৩০টি দোকানঘর উচ্ছেদ করা হয়েছে। আরো কয়েকটি আধাপাকা বাড়ি লাল কালিতে ক্রস দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গতকাল দুপুরে এসব বিষয়ে জানতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক মো. আহসান জাবিরের দপ্তরে গেলে তিনি বলেন, ‘হাসপাতাল নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। আর বেশি কিছু বলতে পারবো না। এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করতে অফিসিয়ালি নিষেধ আছে। আমার চেয়ে বেশি প্রধান প্রকৌশলী স্যার জানবেন।’ পরে প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তরে গেলে তিনি মিটিংয়ে ব্যস্ত আছেন বলে জানানো হয়। প্রধান প্রকৌশলীর মুঠোফোনে কল দেয়া হলেও তিনি ধরেননি।
যদিও এর আগে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) জাহাঙ্গীর হোসেন গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘সিআরবির সড়কটি ভারী যানবাহন চলাচলের উপযুক্ত নয়। এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন ভারী অনেক যানবাহন চলাচল করে। আমরা ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে সিআরবি এলাকায় প্রবেশপথের তিন দিকে গেট নির্মাণ করছি। তবে এখনই যানবাহন কিংবা সর্বসাধারণের প্রবেশ বন্ধ হবে না। গেট নির্মাণ করা হলেও আগের মতোই ওপেন থাকবে। সবাই যাতায়াত করতে পারবে। ভবিষ্যতে যদি কখনো প্রয়োজনে পড়ে তখন হয়তো সর্বসাধারণের প্রবেশাধিকার সীমিত করার বিষয়টি ভাবা হতে পারে।’
সিআরবি গোয়ালপাড়ার মুখে থাকা শ্রীশ্রী রাধাকৃষ্ণ নিতাইগৌর বন্ধুকুঞ্জ আশ্রমের প্রতিমার কারিগর মঙ্গল পাল পূর্বদেশকে বলেন, ‘এখানে হাসপাতাল করার জন্য চেষ্টা করছে। চলাচলের রাস্তায় খুঁটি দিয়েছে। আমাকে এখনও কিছু বলেনি। যেভাবে খুঁটি দেয়া হয়েছে আমিতো প্রতিমাও ডেলিভারী দিতে পারবো না। তবে যতটুকু শুনেছি মন্দিরকে রেল নতুন জায়গা দিবে।’
এদিকে সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণ ও প্রবেশপথে গেট নির্মাণ করে রেল কর্তৃপক্ষ সিআরবিতে সংস্কৃতির দুয়ার বন্ধের প্রক্রিয়া চালানোয় ক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজ ও চট্টগ্রামবাসী। তারা রেলের এমন কর্মকাÐ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অবিলম্বে হেরিটেজ ঘোষিত সিআরবিতে যাতে মানুষের চলাচলের পথ বন্ধ করা না হয় সে দাবি জানিয়েছে হাসপাতাল নির্মাণের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত নাগরিক সমাজ।
একুশে পদকপ্রাপ্ত নাট্যনির্দেশক আহমেদ ইকবাল হায়দার পূর্বদেশকে বলেন, ‘যুগে যুগে আমরা দেখে আসছি সিআরবি উন্মুক্ত স্থান। সেখানে খোলা মাঠ আছে, গাছ আছে। রেল নাকি ভারী যান চলাচল বন্ধে গেট দিচ্ছে। কিন্তু আমাদের কাছে এগুলো উদ্দেশ্যমূলক মনে হচ্ছে। সিআরবিতে আগে নানা ঘটনা ঘটতো। এখন বাতি আছে। তবুও কেন এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে তা বোধগম্য নয়। এটা জনসমাগম বন্ধ করার মানসিকতা। রেল কর্তৃপক্ষ হয়তো ভুলে গেছে সিআরবি হেরিটেজ। তারা হেরিটেজের অর্থ বুঝলে এমন সিদ্ধান্ত নিতো না। এর আগে ডিসি হিল বন্ধ হয়েছে। ধীরে ধীরে সব পার্ক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সিআরবিতে হঠাৎ করে গেট নির্মাণ করে মানুষের সমাগম বন্ধের উদ্যোগ নেয়ায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’
চট্টগ্রাম নাগরিক সমাজের কো-চেয়ারম্যান দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান পূর্বদেশকে বলেন, ‘জনমতকে উপেক্ষা করে হাসপাতাল করার ধৃষ্টতা মঙ্গলজনক না। ফুসফুসখ্যাত সিআরবি রক্ষায় চট্টগ্রামের জনগণ, পেশাজীবীরা আট মাস ধরে আন্দোলন করছে। আন্দোলনের যে উদ্দেশ্য তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। এরপরেও ব্রিটিশ বেনিয়া কোম্পানির মতো সিআরবি ঘেরাও করে জনগণের চলাচল পথ বন্ধের পাঁয়তারা করা হচ্ছে। এটা নাগরিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন। আমি মনে করি চট্টগ্রামের যেসকল সুন্দর স্থাপনা আছে সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের। সিআরবিসহ যেসব সৌন্দর্যমন্ডিত স্থাপনা আছে সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণ, রাস্তাঘাটের উন্নয়নে নগরপিতার হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’
এদিকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত ও চিরসবুজে ঘেরা চট্টগ্রামের উন্মুক্ত স্থান সিআরবি এলাকাটি অবরুদ্ধ করার ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদ জানিয়েছে সিআরবি রক্ষায় আন্দোলনকারী সংগঠন নাগরিক সমাজ। গতকাল মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ বলেন, একদিকে শতবর্ষী গাছ ও প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করে বেসরকারি হাসপাতাল নির্মাণের অপচেষ্টার পাশাপাশি এখন সিআরবি’র তিনটি প্রবেশ পথে গেট নির্মাণ করে সিআরবি এলাকায় সকল যানবাহন ও সর্বসাধারণের চলাচল বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু করেছে রেলওয়ে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের এমন উদ্ধত্যপূর্ণ কর্মকান্ড বিট্রিশ সম্রাজ্যবাদী উপনিবেশিক শাসনের শামিল। চট্টগ্রামবাসীর মতামতকে উপেক্ষা করে রেলওয়ের এই ধরনের কর্মকান্ডে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে। এমন জনপ্রিয় উন্মুক্ত স্থানে সর্বসাধারণের প্রবেশাধিকার সংকুচিত করে অবরুদ্ধ করার এই ষড়যন্ত্র চট্টগ্রামবাসী কোনোভাবেই মেনে নেবে না।