হালদার সাত পয়েন্টে পানির রং পরিবর্তন!

27

মিরসরাই বঙ্গবন্ধু শিল্পপার্কে পানি নেয়া না নেয়ার তর্কবিতর্কের মধ্যেই উপমহাদেশের অন্যতম প্রাকৃতিক মৎস্যপ্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীর পানির রং পরিবর্তন হয়েছে। এ নদীর সাতটি পয়েন্টে পানির রং পরিবর্তন হয়ে কালো আকার ধারণ করেছে। পানি দূষিত হয়ে যাওয়ার ফলেই এটা হয়েছে বলে জানালেন বিশেষজ্ঞরা। এ অবস্থায় মা মাছ ও নদীর জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়ার শঙ্কা রয়েছে বলেও তারা জানান। আচমকা পানির এ রং পরিবর্তনের কারণ খুঁজছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হালদা রিচার্স ল্যাব, হাটহাজারী উপজেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর। এখনো কালো রংয়ের এ পানির উৎস খুঁজে পায়নি তিন সংস্থা। কারণ অনুসন্ধানে পরিবেশ অধিদপ্তর নদীর চার পয়েন্ট থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করেছে।
তথ্য মতে, প্রশাসনের নানামুখী সচেতনতামূলক তৎপরতার কারণে এ নদীর প্রাকৃতিক পরিবেশ গত দুই বছর ধরে ভাল ছিল। এ পরিবেশে মা-মাছ ডিমও দিয়েছে আশানুরূপ। কিন্তু গত পাঁচদিন ধরে হঠাৎ করেই দূষিত হয়ে ওঠেছে পানি। হালদা নদীর কাগতিয়া, রামদাশ মুন্সির হাট এলাকা, গড়দুয়ারা, নাজিরহাট পৌর এলাকা ও রাউজানের তিনটি পয়েন্টের পানির রং হঠাৎ কালো হয়ে যায়। স্বাভাবিক রং পরিবর্তন হওয়ায় বিভিন্ন এলাকার উৎসুক জনতা ভিড় করেন সংশ্লিষ্ট এলাকায়। হালদায় জোয়ার শুরু হলে গাঢ় রং মিশ্রিত পানির প্রবাহ দেখা যায়।
এ বিষয়ে হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল আমীন জানান, গতকাল পাঁচটি সংযোগ খালের মুখসহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দূষিত পানির উৎস খুঁজেছি। কিন্তু এ ধরনের পানির উৎস খুঁজে পাইনি। হালদা পাড়ের মানুষদের প্রতি এ ধরনের পানির উৎসের সন্ধান পেলে দ্রুত প্রশাসনকে জানানোর অনুরোধও করেন তিনি। যাতে এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া যায়।
উপজেলা প্রশাসন থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, হাটহাজারী উপজেলা প্রশাসন হালদা নদীর দূষণ রোধ ও মা মাছ রক্ষায় গত দুই বছর ধরে অভিযান পরিচালনা করে আসছে ধারাবাহিকভাবে। এ সময়ের মধ্যে ১৫০টি অভিযানে ধ্বংস করা হয় বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত ৯টি ড্রেজার ও ২৭টি ইঞ্জিনচালিত নৌকা, কারাদন্ড দেওয়া হয় ৩ জনকে, বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত পাইপ জব্দ করা হয় ৩ দশমিক ৫ মিটার, জব্দ করা হয় ১ লাখ ১৫ হাজার ঘনফুট বালি ও ২ লাখ ৩৩ হাজার মিটার জাল, নিলামে বিক্রি করা হয় দুই লাখ ২৫ হাজার টাকার বালু ও জরিমানা করা হয় এক লাখ ৫২ হাজার টাকা। একবছর আগে বন্ধ করা হয়েছে হাটহাজারী ১০০ মেগাওয়াট পিকিং পাওয়ার প্ল্যান্ট ও একটি পেপার মিল। এরপরও থামানো যাচ্ছে না প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্যের আধার হালদা নদীর দূষণ।
এদিকে হঠাৎ পানির রং পরিবর্তনের বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর ল্যাবরেটরির সিনিয়র কেমিস্ট কামরুল হাসান জানান, হালদা নদীর চারটি পয়েন্ট থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করে আমরা পরীক্ষা করেছি। এ বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরি হলে পানি দূষণের কারণ ও উৎস জানা যাবে বলে জানালেন এ কর্মকর্তা।
প্রসঙ্গতঃ হালদা নদীতেই বিচরণ করে দেশের বেশিরভাগ ডলফিন। কিন্তু এ নদী থেকেই ‘মোহরা পানি সরবরাহ প্রকল্প (ফেইজ-২)’ শীর্ষক একটি প্রকল্প প্রস্তাব করে চট্টগ্রাম ওয়াসা। এ প্রকল্পের পানি যাবে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চলের (বেজা) মিরসরাই শিল্পনগরে। তবে ওয়াসার প্রকল্পে আগামীতে হালদা নদীতে মৎস্য প্রজনন হুমকিতে পড়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন নদী বিশেষজ্ঞরা। তাই বিকল্প উৎস থেকে পানি উত্তোলনের পরামর্শও দেন তারা।
হালদা নদীর মোহরা পানি শোধনাগার ফেইজ-১ এর জন্য বর্তমানে দৈনিক ৯ কোটি লিটার পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। এর পাশেই ১৪ কোটি লিটার শোধন ক্ষমতার মোহরা পানি শোধনাগার ফেইজ-২ এর প্রস্তাব করেছে চট্টগ্রাম ওয়াসা।
এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে তর্কবিতর্ক চলার মধ্যেই পাঁচদিন আগে হালদার সাতটি পয়েন্টে পানির স্বাভাবিক রং পরিবর্তন হয়ে কালো আকার ধারণ করল।
এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় হালদা রিভার রিচার্স ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়া বলেন, হালদার পানির রং পরিবর্তন হওয়ার বিষয়টি পানি দূষিত হওয়ার ল²ণ। আমরা এ দূষিত পানির উৎস খোঁজ করলেও এখনো সেটা পাইনি। তবে এভাবে হালদা নদীর পানির রং পরিবর্তন হলে মা মাছ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকি হিসাবে পরিণত হবে। এ সমস্যা নিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই।