হারিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের তাঁত শিল্প

11

পার্বত্যজেলা বান্দরবানের আলীকদম উপাজেলার দুর্গম পাহাড়ী জনপদের উপজাতী নারীদের বুনা পাহাড়ি তাঁত শিল্প এখন বিলুপ্ত প্রায়। কাঁচামালের সংকট আর সংশ্লিষ্ঠদের উদাসীনতাকেই দায়ি করছেন স্থানীয়রা। সব কিছু মিলে তাদের সেই ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। একদিকে যেমন সংশ্লিষ্ঠ কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা অপরদিকে বেসরকারী উদ্যোক্তাদের পৃষ্ঠপোষকতাও সমানভাবে এই শিল্প বিলুপ্তির জন্য দায়ি বলে মনে করেন অনেকেই। বাপ-দাদাদের সেই পুরোনো পেশাকে শুধুমাত্র নিজস্ব ব্যবহারের জন্য এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে গুঁটি কয়েক পরিবার। জীবিকার তাগিদে বাকিরা হালে জড়িয়ে পড়েছে অন্যান্য পেশায়। সরকারী তুলা উন্নয়ন বোর্ডের কার্যালয় রয়েছে নামে মাত্র। অথচ কোন প্রকার কার্যক্রম নেই তাদের। যার কারণে কাঁচামাল প্রাপ্তিও অনেকটা দুর্লভ। অপরদিকে আলীকদমে সরকারী একটি কুঠির শিল্প রয়েছে। কিন্তু কোন কার্যক্রম ছাড়াই বিগত প্রায় দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে বসে বসেই বেতন নিচ্ছে ্ঐ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। এসব নিয়ে সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোক্তাদের কোন মাথা ব্যথা নেই। সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার থোয়াইচিং হেডম্যান পাড়ায় এখনো গুটি কয়েক তাঁত চলছে আধমরা অবস্থায়। কিন্তু কাঁচামালের সংকট ও প্রতিকূল বাজার ব্যবস্থার সাথে প্রতিযোগীতা দিয়ে টিকে থাকতে না পেরে কষ্টে দিনানিপাত করছে এ পাড়ার অনেকেই। থোয়াইচিং হেডম্যান পাড়ার গৃহবধু আছাইমে মার্মা বলেন, একসময় আমাদের তৈরী চাদর, বেডশিট, গামছা, পাহাড়ি নারীদের থামি, ওড়না ও অন্যান্য তাঁতবস্ত্রের কদর ছিল পাহাড় জুড়ে। কিন্তু এ খাতে সরকারের উদাসীনতার কারণে আজ এ তাঁত শিল্প বিলুপ্ত হতে চলেছে। কারণ তাঁতের কাঁচামাল হিসেবে তুলা থেকে তৈরী সুতা ব্যবহার করা হয়। কিন্তু নামে মাত্র তুলা উন্নয়ন কার্যালয় থাকলেও তুলা চাষের জন্য এ উপজেলার তেমন কোন কার্যক্রম সরকার রাখেনি। এছাড়াও এ খাতে অর্থ সহায়তা প্রদান করলে পাহাড়ের তাঁত শিল্প দেশজুড়ে সুনাম বয়ে আনতে পারবে বলে আমি মনে করি। এবিষয়ে জানতে চাইলে আলীকদম প্রেসক্লাব সভাপতি হাসান মাহমুদ বলেন, এ শিল্পের উন্নয়নে সরকারের আরো জোরালো ভ‚মিকা রাখা প্রয়োজন। পাহাড়ী তাঁত শিল্পের জন্য অর্থ সহায়তা প্রদান, সহজ শর্তে ঋণ দান এবং তাদের উৎপাদিত শিল্পপন্য সহজে বাজারজাত করণের বিষয়টিও সরকারের নিশ্চিত করা উচিত। এছাড়াও আলীকদমে পর্যটকদের অবাধ বিচরণ এবং পর্যটকদের সুযোগ সুবিদা প্রদান করতে হবে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে প্রতি সপ্তাহে আলীকদম আড়াই থেকে তিন হাজার পর্যটক আনাগোনা করে। পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা থাকলে এসব পর্যটকদের মাধ্যমেই এই শিল্পের সুনাম ছড়িয়ে পড়বে সারা দেশে মসলিন বা খাদির চেয়েও জনপ্রিয়তা পাবে বলে আমার বিশ^াস। বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য ধুংড়িমং মার্মা বলেন, এই তাঁত শিল্পের সাথে আমাদের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতি জড়িয়ে আছে। অথচ উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এটি বিলুপ্ত হতে চলেছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেরই এবিষয়ে কোন ধারণা নেই। আমি মনে করে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রশিক্ষনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে এবিষয়ে ধারণা দেওয়া গেলে পাহাড়ে বসবাসকারী নৃ-গোষ্ঠীর জনসাধারণ আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারবে এবং এর সুনাম দেশ ব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আলীকদমে একটি কুঠির শিল্প আছে, যা দীর্ঘদিন যাবত বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। অথচ ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বসে বসে বতেন নিচ্ছে দীর্ঘ বছর ধরে। এবিষয়ে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের মাসিক সভায় আলোচনা করা হয়েছে।