হানাদার বাহিনী পিছু হঠছে

11

জামাল উদ্দিন

আজ বিজয়ের মাস ডিসেম্বরের দ্বিতীয় দিন। আজ থেকে ৫২ বছর আগে ১৯৭১ সালের এই সময়ে বাংলার দামাল সন্তানেরা জননীতুল্য দেশকে হানাদার বাহিনীর হাত থেকে উদ্ধার করে চির মুক্তির সন্ধানে প্রচন্ড গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। আর প্রতিদিন কোণঠাসা হতে থাকে পাক বাহিনী। নভেম্বরের শুরু থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করতে থাকে।
এদিন মুক্তির সংগ্রামে উত্তাল ছিল বাংলার মাটি। মুক্তিবাহিনীর গেরিলা আক্রমণ থেকে সম্মুখ যুদ্ধের গতি বাড়ে। আর অপ্রতিরোধ্য বাঙালির বিজয়ের পথে পাকিস্তানি বাহিনীর নিষ্ঠুর সব পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে থাকে।
বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তুমুল লড়াইয়ে পাকিস্তানি সেনারা পিছু হটতে থাকে। আর অবরুদ্ধ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অনেক মুক্তাঞ্চলের সৃষ্টি হয়। এদিকে পাকিস্তানি বাহিনী পঞ্চগড়ে রিংয়ের আকারে প্রথম ও দ্বিতীয় ডিফেন্স লাইন তৈরি করেছিল। মুজিব ব্যাটারির যোদ্ধারা মিত্র বাহিনীর সহায়তায় গভীর রাতে পঞ্চগড় আক্রমণ করায় তারা পঞ্চগড় ছেড়ে চলে যায়।
এদিনে চট্টগ্রামে মুক্তিবাহিনী উত্তরে ফটিকছড়ি ও রাউজান থানা এবং দক্ষিণে আনোয়ারার অধিকাংশ স্থান তাদের দখলে আনতে সক্ষম হয়। মুক্তিবাহিনী ঘোড়াশালে পাকবাহিনীর অবস্থানের ওপর চারদিক থেকে আক্রমণ করে ২৭ হানাদারকে হত্যা করতে সক্ষম হয়। এখান থেকে বেশকিছু গোলাবারুদও উদ্ধার করে মুক্তিবাহিনী। এদিকে আখাউড়া, পঞ্চগড়, ভুরুঙ্গামারী, কমলাপুর, বনতারা, শমশেরনগর ও পার্বত্য চট্টগ্রামে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে প্রচন্ড সংঘর্ষে হুনাদার বাহিনী পিছু হটে যায়। এতে মুক্তিবাহিনীর নেতৃত্ব দেন লে. মাসুদ, সুবেদার খালেক, লে. মতিন, মেজর সদরুদ্দিন ও ক্যাপ্টেন শাহরিয়ার।
এদিকে বোমা বিস্ফোরণে ঢাকার রামপুরা বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্র, চট্টগ্রামের পাঁচটি বিদ্যুৎ সাব স্টেশন ও দুটি পেট্রোল পাম্প বিধ্বস্ত হয়। আজমপুর রেলওয়ে স্টেশন মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে এলেও হানাদার বাহিনী তাদের বিপর্যস্ত অবস্থা কাটিয়ে উঠে মুক্তিবাহিনীর ওপর পাল্টা আক্রমণ করে। এ আক্রমণে মুক্তিবাহিনী পুনরায় তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করে তিন দিক থেকে শত্রুকে আক্রমণ করলে হানাদার বাহিনী আজমপুর রেলওয়ে স্টেশন ছেড়ে পালিয়ে যায়।
অন্যদিকে ভারতে প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী কংগ্রেসের কর্মিসভায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার আহবান জানান।
সীমান্ত এলাকাগুলোতে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করলে মুক্তিবাহিনীর সাথে যোগ দেয় ভারতীয় বাহিনী। সাথে সাথে পুরো দেশজুড়ে চলছিল গণপ্রতিরোধ। প্রতিদিন মুক্তিবাহিনীর কাছে নাস্তানাবুদ হচ্ছিল পাক বাহিনী। তারই মাঝে এদিন মুক্তিযোদ্ধারা দিনাজপুরে অকস্মাৎ এমন এক হামলা চালায় যার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না পাকিস্তান বাহিনী। সেখানে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে একত্রিত হয় ভারতীয় সেনাবাহিনী। মুক্তিবাহিনী পঞ্চগড় মুক্ত করে এগিয়ে চলছিল ঠাকুরগাঁওয়ের দিকে।
পাক হানাদার বাহিনীর হামলায় একাত্তরের এই দিনে রামপুরা ও মালিবাগে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন। ডিসেম্বরের এ সময়টাতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে তখন মুক্তিবাহিনীর সাফল্যের খবর গুরুত্ব দিয়ে প্রচার হতে শুরু করে। ৭১ সালের এ দিনে মুক্তিযোদ্ধারা যখন রাজধানীকে দখলমুক্ত করার লক্ষ্যে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে ঢাকার দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল তখন পাকিস্তান বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে চালিয়ে যাচ্ছিল নানা অপপ্রচার। এ দিকে প্রিয় মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করার প্রত্যয়ে প্রতিদিন শহীদ হচ্ছিলেন হাজারো মুক্তিকামী জনতা। হানাদার বাহিনীর অত্যাচার থেকে রেহাই পাচ্ছিল না মা-বোনেরা। এসময়ে নোয়াখালী থেকে চট্টগ্রামের পথে পথে শুরু হয় সম্মুখযুদ্ধ। সম্মুখযুদ্ধ চলে আখাউড়া রেল স্টেশনেও। একাত্তরের এই দিনে ময়মনসিংহ, জামালপুরসহ দেশের বেশ কয়েকটি এলাকায় গণহত্যা চালায় পাকবাহিনী। তবুও অদম্য সাহস আর প্রবল দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা এগিয়ে যায় তাদের আসন্ন বিজয়ের অভেদ্য লক্ষ্যে।

লেখক : মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, সাংবাদিক ও প্রকাশক