হাতটা একটু ধরো: কবিতায় মর্মন্তুদ যন্ত্রণা

9

মোস্তফা হায়দার

কবি ও কবিতা শব্দ দুটো আলাদা বিশেষত্ব দাবি রাখে। দুটোই এ সমাজের ব্যতিক্রম এক শিল্পী আর শিল্পের নাম। কবিতার বিশেষত্বের কাছে চিন্তার উদ্রেক ঘটে। ভালোবাসার বিন্যাস রূপ পায়। সুন্দরের ক্রিয়ায় হাসে অসুন্দরের বাহ্যিক রূপ। কবিতার কাছে ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র, প্রকৃতি নির্দিষ্ট আবহের দোলায় চড়ে বাহ্যিক ও আভ্যন্তরিক অন্দরে প্রবেশ করে নিত্যতা প্রকাশ করে। আর কবি চিরায়ত ভ্যাংচির স্বীকার হয়ে অপবাদের বোঝা কাঁধে নিয়ে কিছুটা বেঁচে থাকার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে যায়। আর এটাই কবির শক্তি।
প্রত্যেক কবিই তার ভাবের দরিয়ার কিস্তির পাটাতনে চড়ে শিল্পের উৎকর্ষতার এক মহীরুহে প্রবেশের জোর প্রচেষ্টা চালাতে চেষ্টা করেন। এবং শব্দ আর বাক্য মিলে কবিতা নামক এক শিল্পের উদগীরন ঘটান। তেমন এক কবির সৃষ্টির প্রথম মলাটবদ্ধতার ভেতরে প্রবেশ করার চেষ্টা থেকেই এই লেখাটুকু। বলছিলাম এক সময়ের সতীর্থ লেখক কবি শাহাদাত মাহমুদ সিদ্দিকীর কথা।
সে শূন্যদশক বা প্রথম দশকের মাঠ চষে বেড়িয়ে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করলেও তৃতীয় দশকের শুরুতে এসে নিজের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশে তার ‘হাতটা একটু ধরো’ ই প্রথম সন্তানের নামাঙ্ক।
০২.
এ কবি নিয়ত শব্দের কাছে ন্যুজ হয়ে বসে থাকা এক কারিগর হিসেবে নিজেকে উপস্থাপনে কোনো ধরণের স্থুলতার আশ্রয় নেননি। চেষ্টার নালন্দায় চড়ে বাক্য আর উপমাকে স্থায়ী আসন দেবার তরী ভাসিয়েছে বাংলা সাহিত্যে। সচেতনভাবে প্রেমাশ্রিত সব সময়কে ধারণ করার চেষ্টায় জাগতিক প্রেমকে এতো সুন্দরভাবে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করেছেন তাতে পাঠকের আশ্বস্ত হওয়ার পথ রয়েছে। কবির ভাষায়-
প্রেমের কাছে কৃতজ্ঞ হও পুরুষ
তোমার জন্য ঘর ছেড়েছে নারী
তোমার জন্য জ্বালিয়ে রাখে আগুন
তোমার সাথে দেখবে বলে ফাগুন
কনকনে সব রাত দিয়েছে পাড়ি
কৃতজ্ঞ হও সামনে তোমার নারী..
(প্রেমের কাছে)
আবেগের সবটুকু একজন পুরুষের জন্য নারীর থাকে। আর তা যদি হয় প্রেম বিষয়ক, তাহলে তো কথার ফুলঝুড়ি ছুঁটে। কিন্তু একজন নারী সব ছেড়ে একজন পুরুষের কাছে ভরসা খোঁজে! অথচ পুরুষ মধু আহরণ শেষে হারিয়ে যায় অন্য কাননে। কবি তাই পাঠকের সামনে পুরুষ ভাবনার চাবি তুলে দিয়ে ক্ষান্ত হননি। নারীকেও পুরুষমুখী প্রিয়া হতে পথ বাতলিয়ে স্মরণ করিয়েছেন-
প্রেমের কাছের কৃতজ্ঞ হও নারী
নিজের জন্য ঘর না গড়া পুরুষ
তোমার জন্য বানিয়ে তোলে বাড়ি
(প্রেমের কাছে)
কবি এ সমাজের জাগতিক প্রেমের ধ্বজভঙের চিত্র থেকে বেড়িয়ে আসার জন্য চির বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।
০৩.
কবি শাহাদাত মাহমুদ সিদ্দিকী খুব সচেতন দরিয়ার কূলে এসে কবিতার তরী ভাসানো প্রত্যয় নিয়েছেন বলে মনে হল তার কবিতায়। কবিতাগুলো পাঠ করতে বসলে কোনো কাঠিন্যতা আঁচ করে না! বরং সরল বাক্যগুলি তাকে নিয়ে যায় এ সমাজের মানুষের কাছে। এ সমাজের কেনো বললাম? কারণ কবিতা একটি উচ্চমার্গীয় শিল্পের নাম। যে শিল্পের রসায়ন বুঝতে পারাও কঠিন। তার কবিতায় আপত কোনো দূর্বোধ্যতা আঁচ করতে পারে নি। সে চেষ্টা করেছে হৃদয়গ্রাহী পাঠক পেতে। মানুষের ভেতরে প্রবেশ করার ক্ষমতাটা আত্মস্থ করার চেষ্টা করেছেন এ কবি। তার ভাষায়-
রক্ত কোনোদিন পুরান হয় না।
পুরান হয়ে যায় ফেরাউনের লাশ
নমরুদের অগ্নিকুন্ড
কিংবা এজিদের অবৈধ ক্ষমতার জারজ মসনদ! (মজলুমের রক্ত)
এই যে সাধারণ মানুষের সাধারণ ক্ষমতার ভেতর অসাধারণ চিত্রের প্রকাশ ঘটিয়ে ইতিহাসের পূনরাবৃত্তিতে চোখ দেয়ার চেষ্টা। এই যে, ‘এজিদের অবৈধ ক্ষমতার জারজ মসনদ’! চমৎকার বাক্যের কাছে পাঠকের তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার প্রয়াস সৃষ্টিই কবির সার্থকতা। কবিতা মননশীলতার পরিচয় যেমন দেয় তেমনি সময়ের পেখম মেলে অযাচিত শিল্পের উদগাটনেও সহায়তা করবে নিশ্চিত।
কবিতা মানুষের ভাবের ভেতরে লুকায়িত সত্তার প্রকাশও বটে। কবিতার নিজস্বতার কাছে পাঠক মাত্রই অনুসন্ধানী অথবা স্বাদের কিনারায় পৌঁছার চেষ্টা মাত্র। সময়ের এক পিঠ রঙিন হলেও আরেক পিঠ ক্লেদে আক্রান্ত হয়ে বিষাক্ততা বহন করে সময়কে করে কলুষিত। আজীবন এমনটাই ছিল, আছে এবং হবে। তারও একটা মাত্রা থাকা বাঞ্চনীয়। আর যখন মানুষ হয়ে ওঠে তার অন্যতম কারণ তখন প্রকৃতি,পরিবেশ নিশ্চয় আর ছাড় দিবে না। কে শোধাবে কাকে? নিয়তির কাছে ক্ষমতার রঙিন চশমা আঁকে বিরহের করুন সুর। যে সুরে বা গুলির আওয়াজে বুক ভেঙে নদী হয়ে ওঠে, সাগরে রুপ নিয়ে গ্রহণ করে শোকের মাতাল পৃথিবী। যে পৃথিবীতে শুধু প্রতিহিংসার দানা বাঁধবে, বীজ রোপন হবে। ভেঙে যাবে মানুষের ভাতৃত্বের পৃথিবী। এ কবির ভাষায়-
চাই না শহর আমার গ্রাম গ্রাম থাক
মানুষ খুনের প্রকল্পটা বন্ধ রাখ
এক জনেরও হয় না যেন সম্ভ্রমহানি
আর কতো দিন উন্নয়নের লুটের বাণী
আমার গ্রাম শঙ্কাবিহীন রাত কাটাক।
(মানুষ খুনের প্রকল্প- হাতটা একটু ধরো)
০৪.
কবি শাহাদাত মাহমুদ সিদ্দিকী কে একজন সময়প্রেমিক কবি যেমন বলা যায় তেমনি পাঠক বলতে বাধ্য হবেন দেশপ্রেমিকের ধারক হিসেবে। কবিরা দেশপ্রেমিক হলেও বর্তমানের দেয়ালে ঠেস দিয়ে কবিরা হয়ে উঠছেন লেজুড়ভিত্তিক বা বুর্জোয়া দেশপ্রেমিক! তাও আবার ধর্মের পেটে বসে ধর্মের কোরাস করে চেতনার বিশ্বাস লালন করে রোপন করে আত্মঘাতি বুলেট! এসব আজ নিত্য মোয়ামালাতের অংশে পরিণত করে জাতি আর ধর্মের ঘরে ঠেলে যাচ্ছে গোমূত্রের শেরোনি! তাই কবির কলমে ভেসে ওঠে এক নতুন ভাষ্য-
কে না জানে – জালিমদের একেককটি ‘ বন্দুকযুদ্ধ’ মানেই
আরো এক বা একাধিক মজলুমের শাহাদাত
আর কাউকে ‘ সন্ত্রাসী’ বলা মানেই হলো
সে চির আরাধ্য শান্তির শ্বেত পায়রা- (আমার ধর্ম)
কবির একটা নিজস্ব ভাষা আছে। কবির নিজস্ব ভাবনা আছে। কবির থাকে সংসার। কবিরা থাকে মনুষ্যজগতে। যাপিত জীবনের বিছানায় কবিদের বসবাস,কবিদের সংসার। কবি শাহাদাত মাহমুদ সিদ্দিকীও এর ব্যতিক্রম নয়! তবে মাছরাঙার মতো সুযোগ-সন্ধানী নয়; বরং তাকে ডাহুকের মতো খুঁজে ফিরে আত্মপ্রতিষ্ঠায় দৃঢ়প্রত্যয়ী বলা যায়। সে সময়ের অপচর্চাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখার বাসনা লালন করা এক পুরুষও বটে। তার বিশ্বাসের পরিধি অনেক গভীর। চিন্তার দূরদর্শিতায় অনেক উঁচু মানের একজন মানুষ। প্রচলিত সব অপকাতারতাগুলোকে পদপৃষ্ট করার কঠিন মানসিকতা লালনকারী সে। তার পরিধিতে হাতবুলাতে গিয়ে দেখি-
কবর জিয়ারতে আসিনি বোন।
এসেছি দীক্ষা নিতে।
না, কোনো পীরের খানকায় আমাকে পাঠিয়ো না। কী আলিয়া কী/কওমী। স্বকথিত ওসব হাক্কানী আলেমে আমার বিশ্বাস নেই। কাপুরুষকে আমি আলেম বলি না। মোসাহেবকে আমি আলেম বলি না। অর্ধশতাব্দী বোখারী পড়ালেই আমি তাকে আলেম বলি না। আলেম বলি না মাদ্রাসার অধ্যক্ষ কিংবা ভার্সিটির অধ্যাপক হলেই।
প্রচলিত আযহারী মাক্কী মাদানী কাউকেই না।
তাহলে কার কাছে পাঠাবে আমাকে? (মা অথবা মানচিত্র)
আসলেই আমরা কার কাছে দীক্ষা নেবো? কোথায় বা ভরসার সূত্র পাবো? সংগ্রামের ভেতরেই সেই সূত্র খুঁজেছেন লেখক। তাই দীক্ষা নিতে গিয়েছেন নুসরাতের মরণযন্ত্রণার কাছে। তার ভাষায়-
‘বিরক্ত হয়ো না, বোন আমার!
আরো শিখতে এসেছি কী করে আমৃত্যু লড়তে হয়। কী করে কয়লা হওয়া শরীরে সীমাহীনপ্রায় যন্ত্রণা নিয়েও জালিমের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ থাকা যায়। বলো, নিজের মৃত্যুকে তুচ্ছ করে উচ্চস্বরে কখন বলা যায়- ভাই, আমার যদি কিছু হয়ে যায় মায়ের দিকে খেয়াল রাখিস..
(মা অথবা মানচিত্র)
০৫.
লেখক বার বার আলেমদের টেনে কিসের যেন ইঙ্গিত দিচ্ছেন! তারও কারণ আছে। কেতাব পাঠ করা লোকগুলো আজ বোগলদাবা করে ইসলামের ধারক সাজে, কিন্তু ইসলামের শোকেসে তারা প্রবেশ করায় অনৈতিকতার যতোসব বেড়াজাল। তাদের হাতগুলো হয়ে ওঠে বিকলাঙ্গ, মুখগুলো হয়ে যায় জড়তায় বাকা, অন্তরগুলো হয়ে ওঠে পোড়ামাটির মতো শক্ত! অঙ্গূলি দিয়ে এ কবি পুরো মানচিত্রকে হয়ত ছেদা করবেন নয়তো শক্ত করে ধরার প্রয়াসই বরং দেখালেন! জাতির বোধের চরাচরে জলসিঞ্চনই যে কোনো কবির অদম্য ইচ্ছে হওয়া উচিত। কবি শাহাদাত মাহমুদ সিদ্দিকী উপলব্দির সাথে সময়ের যাপনলীলায় এমনভাবে এক হয়ে গেছেন তা যেন বাঁচতে জানার সূত্রের আবিস্কার। কবির ভাষায়-
ইকরা! পড়তে হবে আপনাকে। পড়তে
জানতে হবে হৃদয়ের চোখে। দাজ্জালের
জান্নাত দেখে আগের মতো আটখানা
হবেন না। তার কপাল পড়ুন। নিজের
কপাল পুড়বেন না। (মুখ)
কবি মানেই দ্রষ্টা। কবি মানেই মুক্তির নিশানা। কবি মানেই ধর্মযাজক। কবি মানেই বিবেকের বিচারক। কবি মানেই শিল্পচাষের কুলায় চড়ে মানুষের মুক্তির পয়গাম। এ কবি নিয়তির নির্মমতার কাছে নিজেকে সঁপে দেয়া পুরুষ হতে চান না। এ কবির প্রতিটি কবিতায় যেন একেকটি ইচ্ছে বারুদের স্পুরুন ধরা পড়লো। একটি পরিপূর্ণ ইচ্ছে কাব্যগ্রন্থ বলা যায়। যে গ্রন্থের পাতায় পাতায় কবিতাগুলো মানুষের কথা বলেছে, মানবতার কথা বলেছে, সময়ের কথা বলেছে, ভালোবাসার কথা বলেছে, প্রেয়সির কথা বলেছে, যন্ত্রণাভোগ করে মৃত্যুবরণ করা নুসরাতের কথা বলেছে, একটি রাষ্ট্রের অপচর্চার কথা বলেছে, মানুষের বাঁচতে জানার কথা বলতে গিয়ে স্বাধীনতার কথা বলেছে। কবির ভাষায়-
‘যেদিন তুমি মুক্তি পাবে
আজাদ হবো আমি
বিজয় যে কী সেইদিন হবে
বিপুল জানাজানি’। (বিজয়)
০৬.
‘হারিয়ে কাঁদার মত কিছু কোথাও কি আছে?
বলো-আহত এই আত্মা যেন কেঁদে উঠে বাঁচে!’
বাঁচতেই হবে। এই বিশ্বাসে এসো কবির ‘হাতটা একটু ধরো’র ভেতর ছুঁয়ে দেশকে ধরি। দেশকে মুক্তি দেই। দেশকে মানুষের বসবাসযোগ্য করে তুলি।
‘তবু বাঁশের কেল­ার আগুন আজও জ্বলছে- জীবন দিয়ে জেনে গেলে তুমি/
কে জানে এরপরও বিস্তৃত হয় কিনা আমাদের অবরুদ্ধ আত্মার ভূমি/
আমাদের অন্তরের দু’চোখ থেকে সরে কিনা মৃতের মতো বেঁচে থাকার মায়া।’
(শোক কিংবা শোকগীতি নয়)
বাঁচার শক্তি পাটাতনে। নিপতিত বিশ্বাসে লুকায় মৃতের স্বপ্ন। কবি শাহাদাত মাহমুদ সিদ্দিকীর হাতটা একটু ধরোতে কোনো আবেগকে স্থান দেয় নি। সে সময়ের পিঠে চড়ে অতীত ইতিহাস, ঐতিহ্যের শোকেস খুলে বর্তমান ও ভবিষ্যতের কিছু সূত্রপাত ঘটানোর চেষ্টা করেছে। দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্তে এ বইয়ে আছে সময়ের মনোলোভা সব ঘটনার পুনরাবৃত্তি। স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে দেশ আজো পিছিয়ে যাচ্ছে উন্নয়নের বুর্জোয়া ট্রেনে চড়ে। যে ট্রেন লাইন চ্যূত! বগির ঝনঝন শব্দ দিয়ে সময় পার করা গেলেও পথ অতিক্রম যায় না। কবি সেই লাইনচ্যুত ট্রেনটিকে সঠিক জায়গায় দাঁড় করাতে বইটির নাম দিয়েছে- হাতটা একটু ধরো।
হালকাচালের শিরোনামটিতে গভীর মর্মন্তুদ যন্ত্রণা থেকে মানুষের মুক্তির এক স্লোগান বয়ে বেড়াচ্ছে। এ যাত্রায় কবির সফলতা কামনা করছি।