হযরত শাহজাহান শাহ (রাহ.) মানবহিতৈষণার এক আলোকবর্তিকা

14

 

আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন-‘তারা আপনাকে রুহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। আপনি বলে দিন, রুহ আমার প্রভূর আদেশ ঘটিত। তোমাদেরকে এ বিষয়ে সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে।’ আত্মা অন্ধকারাচ্ছন্ন দেহকে আলোকিত করে। রূহ ব্যতীত আরেকটি শক্তি মানুষের মধ্যে বিদ্যমান, তা হল নাফ্স। রূহের আকর্ষণ অল্লাহর দিকে আর নফছের আকর্ষণ পার্থিব জগতের দিকে। মানুষ এই দ্বিবিধ শক্তির মোকাবেলার কেন্দ্র। আত্মার পবিত্রতার মাধ্যমেই ঐশী জ্ঞান অর্জিত হয়ে থাকে। বিশ্ববিখ্যাত মরমী সাধক কবি আল্লামা রুমীর নিম্নোক্ত পংক্তিগুলোর মধ্যে এর অন্তর্নিহিত চিত্রটি ফুটে উঠে:
‘ক্রুশ ও খ্রিষ্টান জগৎ তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম
তিনি ক্রুশের উপর নন।
পূজামন্ডপ, প্রাচীন বৌদ্ধ মঠে গমন করলাম
সেখানেও তাঁর সাক্ষাৎ মিলল না।
হিরাত ও কান্দাহারের পর্বত অনুসন্ধান করলাম
তিনি সেই পর্বত উপত্যকার মধ্যে নেই।
আমি আমার কলবের মধ্যে দৃষ্টিপাত করলাম,
তাঁকে সেখানে দেখতে পেলাম-তিনি অন্য কোন খানে নেই।’
বাংলাদেশে সুফিবাদের সূচনাকাল একাদশ শতকে। ইসলাম অধ্যুষিত পশ্চিম ও মধ্য এশিয়া এবং উত্তর ভারত থেকে মধ্যযুগীয় বাংলায় শত শত সুফি-দরবেশ বাংলাদেশে আগমন করেন। কালক্রমে সমগ্র বাংলাদেশে এমনকি গ্রামীণ জনপদেও সুফিবাদের বিস্তৃতি ঘটে। এর ধারাবাহিকতায় যে ক’জন ক্ষণজন্মা আউলিয়ায়ে কেরাম চট্টগ্রাম অঞ্চলে ধর্ম প্রচার ও জনকল্যানে ব্রতী হন তাঁরা‘বারো আউলিয়া’ নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। যাঁদের মধ্যে হযরত শাহজাহান শাহ রাহ. অন্যতম।
মানুষের আত্মবিকাশের পথে প্রয়োজন মজবুত মানসিক অবলম্বনের। এ অবলম্বনকে ঐশী বা খোদায়ী অবলম্বন বলেও অভিহিত করা যায়। এর জন্য যে মানসিক দৃঢ়তা, উৎকর্ষের প্রয়োজন তার জন্য দরকার বিশেষ আত্মিক গুণে গুণান্বিত মানুষের সাহচর্য, আনুকূল্য। আর এক্ষেত্রে হযরত শাহজাহান শাহ রাহ্.হলেন এমন এক মহতী আত্মিক গুণে গুণান্বিত ইনসানে কামেল। যিনি ‘জিন্দা অলি’ নামে আখ্যাত হন। হযরত শাহজাহান শাহ রহ. এমন এক আধ্যাত্ম্য নক্ষত্র যিনি ত্যাগ, সাধনা ও আত্মোকর্ষ লাভের মাধ্যমে মারেফাতের সর্বোচ্চ মকামে তথা মানসিক বিভিন্ন উচ্চ উন্নত স্তরে পৌঁছুতে সক্ষম হয়েছিলেন। যা কুতুবুল আকতাব হজরত গোলামুর রহমান বাবা ভাÐারীর ক. একাধারে সাতদিন তাঁর মাজার প্রাঙ্গনে অবস্থান এবং শাহানশাহ হযরত সৈয়দ জিয়াউল হক মাইজভাÐারীর ক. (তাঁর সম্পর্কে) পবিত্র মন্তব্যে সুপ্রমাণিত।
হযরত শাহজাহান শাহ রাহ্. এমন বিশুদ্ধ পবিত্র আত্মার অধিকারী যাঁর রওজা জিয়ারতে আত্মা বিশুদ্ধ হয়, মন হয় পবিত্র। তিনি প্রেম ও অবলীলামুক্ত অন্তরে প্রাপ্ত ঐশ্বরিক প্রেরণার সত্যস্বরূপ-সৌন্দর্য্যস্বরূপ। যিনি ভক্তের মন ভক্তিরসে ভরে দেন ও তাঁর মন হতে কলুষ কালিমা বিদুরিত করে আল্লাহর মিলন ঘটান। মহানবী (দ.) ভাষায়: ‘সমগ্র সৃষ্টি আল্লাহর পরিবার, যে এ পরিবারের সদস্যদের প্রতি ভাল, সে আল্লাহর নিকট ভালো’। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল জনগোষ্ঠী তাঁর আধ্যাত্মিক বেলায়তী শক্তির অফুরন্ত স্বর্গীয় আভায় উদ্ভাসিত। পর্যায়ক্রমে তাঁর মাজার প্রাঙ্গন সামপ্রদায়িক সম্প্রীতির এক মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে। মনোবাসনা পূরণ করার জন্য তিনি সবাইকে দয়া করেন। সবার মধ্যে খোদা প্রেমের বীজ বপন করেন। আত্মার শান্তি একমাত্র তাঁর সান্নিধ্যে গেলেই মেলে। নি¤েœাক্ত পংক্তির মধ্যে বিষয়টি প্রস্ফূটিত হয়ে
প্রবীন সাংবাদিক ওবায়দুল হকের স্মৃতিচারণে এরূপ অসাম্প্রদায়িক চিত্র ফুটে ওঠে এভাবে: আন্দরকিল্লাহর পাশে হোড় বাবুর চেম্বারে গিয়ে কথা বলছিলাম। তিনি বললেন, দাদা, আমি আপনাদের বাড়ির পাশে গিয়েছিলাম। আমি তাজ্জব হয়ে বললাম, আমাদের বাড়ীর পাশে কি ব্যাপারে গিয়েছিলেন। তিনি বললেন; অসুস্থ আবস্থায় আমি একদিন স্বপ্নে দেখলাম, আমি নাজিরহাট বাসে উঠেছি এবং যেখানে নামলাম সেখানে দেখতে পেলাম রাস্তার পূর্ব পাশে একটি পাকা গেইটে হজরত শাহজাহান শাহ লেখা রয়েছে। আমি গেইট পেরিয়ে পূর্ব দিকের রাস্তা দিয়ে কিছুদূর যাওয়ার পরে দেখতে পেলাম হযরত শাহজাহান শাহ রাহ.্ দরগাহ শরীফ। আমি দরগাহ শরীফের পূর্ব পাশে কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম এবং পরে রাস্তা দিয়ে পূর্ব দিকে যেতে একটি নদীর পাড়ে পৌঁছলাম। আবার আমি সেই একই পথ দিয়ে আসতে থাকি এবং একটি বাজারে এসে উপস্থিত হই। সেখানে একটি চায়ের দোকানে চা পান করার সাথে সাথে আমার স্বপ্ন ভঙ্গ হয়। এই স্বপ্ন দেখার পর আমার মনে বিভিন্ন প্রশ্ন দেখা দেয়। আমি জানতাম না, হযরত শাহজাহান শাহ রঃ এর মাজার কোথায়! রাত-দিন চিন্তা করতে লাগলাম কি করে হজরত শাহজাহান শাহ মাজার শরীফের সন্ধান পাই। এরকম অসংখ্য কারামাতের অধিকারী হজরত শাহজাহান শাহ রহ.।
মানুষের পাশাপাশি মূক জন্তু জীন, বণ্যপ্রাণী পশু পাখিও তাঁর প্রতি সম্মান ও আনুগত্য প্রকাশ করে যথাযথ মর্যাদায়। তাঁর মাজার শরীফ আতিক্রমকালে হাতি, উট ইত্যাদি প্রাণীও যথার্থ সম্মান ভক্তি প্রদর্শন করে থাকে। এমনকি হিং¯্র ব্যঘ্র তাঁর কনিষ্ঠ আঙ্গুল মোবারক লেহন করতো। শুধু যে তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর কাছে আসতো এমনটি নয় তাঁর ওফাতের পরও তাঁর মাজার প্রাঙ্গণে শ্রদ্ধা জানাতে আসতো। বহু প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় বিষয়টি বিবৃত হয়েছে।সাংবাদিক ওবায়দুল হক এর বর্ণনাটি এক্ষেত্রে প্রনিধানযোগ্য: সকল প্রাণীর, সকল প্রাণের অপরূপ এক মিলন স্থান। হযরত শাহজাহান শাহের স্মৃতিঘেরা এই সবুজ চাট্টান।
সুফিরা কেবল তাদের আত্মোৎকর্ষ লাভের জন্যই নিজেকে নিয়োজিত করেন না, তাঁরা ইসলামের জন্য এবং মানব সেবার জন্য হিতৈষনামূলক কাজেও নিজেদেরকে উৎসর্গ করেন। মানব সেবাকে তাঁরা স্রষ্টার প্রতি গভীর প্রেম ও নিষ্ঠারূপে বিবেচনা করে থাকেন। রুমীর ভাষায়-‘মানুষের চিত্ত জয় করাই মহত্তম তীর্থযাত্রা।’ হযরত শাহজাহান শাহ রহ. এমন একসুফি সাধক আধ্যাত্ম্য ব্যক্তিত্ব যাঁর জীবন মানবতার জন্যই উৎসর্গীত। তাঁর আদর্শ ছিল ‘খিদমতে খালক’ বা সৃষ্টির সেবার মাধ্যমে ¯্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জন করা। জীবদ্দশায় যেমন ছিলেন তেমনি ওফাতের পরও তিনি মানবকল্যাণে নিবেদিত। তাইতো দুঃখী, নিরন্ন, অসহায় বঞ্চিতদের ফরিয়াদে যথার্থ সাড়া মেলে তাঁর দরবারে। বিশেষত অত্যাচারিতের প্রতি একেবারে জীবন্ত মানুষের মতোই সংবেদনশীল তাঁর দরবার।
হযরত শাহজাহান শাহকে রহ. আবর্তিত করে যে জীবন প্রবাহ, তার মূলেও রয়েছে মানবতার কল্যাণ তথা কুল মাখলুকাতের মঙ্গল। তাঁর অলৌকিক ক্ষমতার পরশ, অতিন্দ্রীয় সহযোগিতা ও তাঁর আদর্শের অনুবর্তী নি:স্বার্থ, স্বেচ্ছাসেবী ত্যাগী, সৎ, ও মানবহিতৈষী ব্যক্তিবর্গের কর্মতৎপরতা ও প্রাণচাঞ্চল্যে গড়ে উঠেছে জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের এক অনবদ্য কাঠামো।‘হযরত শাহজাহান শাহ রহ.মাজার শরীফ কমপ্লেক্স’ তাঁর প্রোজ্জ্বল স্বাক্ষর।
জীবিত অবস্থায় ও ওফাতের পর সমভাবে মানব-কল্যাণে নিয়োজিত রয়েছেন। তাঁর মাজার শরীফ হাজার হাজার ভক্তের শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় সিক্ত হচ্ছে। এখানে সর্বস্তরের মানুষ এসে যে নজর নেয়াজ, হাদিয়া পেশ করেন সেগুলোও কল্যানকর একাধিক শিক্ষা ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান নির্মাণে ব্যয় করা হচ্ছে। তাঁর মানবহিতৈষীচিন্তাধারার আলোকেগড়ে উঠেছে ‘হযরত শাহজাহান শাহ র. এতিমখানা’। রোগাক্রান্ত দুঃস্থ মানবতার সেবার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়ে আসছে দাতব্য চিকিৎসা সেবা। এলাকার শিশুদেরকে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার লক্ষ্যে ‘ফোরকানয়িা মাদ্রাসা’ আর উচ্চতর জাগতিক ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা প্রদানের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘হযরত শাহজাহান শাহ রাঃ এবতেদায়ী মাদ্রাসা’। দেশের মেধাবী দুঃস্থ ছেলেদেরকে পবিত্র কোরান হেফজের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ‘হযরত শাহজাহান শাহ’র রাঃ হেফজখানা’। এলাকার জ্ঞানপিপাসু আবাল বৃদ্ধ ছাত্র-শিক্ষক সর্বস্তরের লোকের জ্ঞানার্জনে সহায়তা করার জন্য ইসলামী জ্ঞানসহ আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভে সহযোগিতার লক্ষ্যে প্রািতষ্ঠা করা হয় হযরত শাহজাহান শাহ’র রাঃ ইসলামী পাঠাগার প্রকল্প।এছাড়া মাজার শরীফকে কেন্দ্র করে নানা কর্মযজ্ঞ প্রতিপালিত হয়ে আসছে। অনেক কর্মসূচী বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। হযরত শাহজাহান শাহ’র রাহ. জীবনাদর্শ, কল্যান, কারামাত, আধ্যাত্মিক শক্তি, চিন্তাধারা, কর্মপ্রক্রিয়া, রীতিনীতি, অপূর্ব চরিত্র মাধুরী সর্বোপরী ঈমানী মহিমায় এ অঞ্চলের মানুষ আলোকিত হয়েছিলেন। রূহানী সাধনা তথা আত্মোৎকর্ষ লাভের জন্যপ্রজ্জ্বলিত করেছিলেন এক উজ্জল আলোর মশাল। সমাজ রাষ্ট্র ও ধর্মীয় পরিমন্ডলে সৃষ্টি করেছিলেন আলোড়ন। ভক্তদের হৃদয়ে আশা, সাহস ও আস্থার অনির্বাণ প্রদীপরূপে। তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থে অখন্ড মানবতার আলোকবর্তিকা। তাঁর মাজার শরীফকে আবর্তিত করে যে নতুন নতুন ধ্যান-ধারণা, মানবসেবা মূলক কর্মধারা প্রবর্তিত হচ্ছে তা আমাদের সমাজ প্রগতিতে সহায়ক হবে। অসাম্প্রদায়িক মানবিক মূল্যবোধের পুনরুজ্জীবনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করবে। সকল সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে এ মহান অলিয়ে কামেলের আরাধ্য সমাজ ও আদর্শ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নই হউক আমাদের ঐকান্তিক প্রয়াস।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ