হঠাৎ শিশু নিখোঁজের ঘটনায় আতঙ্ক নগরে

13

তুষার দেব

নগরীতে হঠাৎ করেই শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা বেড়েছে। ‘রহস্যজনক’ এসব নিখোঁজের ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হওয়ার পর তদন্ত করছে পুলিশ। এরই মধ্যে লক্ষীপুর ও ফেনী থেকে দুই শিশুকে উদ্ধার ও ঘটনায় জড়িত আটজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও এখনও তিন শিশুর কোনও হদিস মিলেনি। হঠাৎ করে নগরে শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় অভিভাবকদের মধ্যে ভীতি ও আতঙ্ক সঞ্চার হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি মাসে গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে নগরীর পৃথক তিনটি এলাকা থেকে তিন শিশু নিখোঁজ হয়েছে। এর মধ্যে গত ১৫ নভেম্বর ইপিজেড থানার বন্দরটিলা নয়ারহাট এলাকা থেকে আয়াত নামে পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুকন্যা নিখোঁজ হয়েছে। থানায় জিডি করার পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজনের বাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে খোঁজ-খবর নিয়েও এখন পর্যন্ত তার কোন হদিস পাওয়া যায়নি। গত ১৭ নভেম্বর নগরীর আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকায় মো. আরিফ নামে পাঁচ বছর বয়সী এক ছেলে শিশুর খোঁজ মিলছে না। আরিফের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় ডবলমুরিং মডেল থানায় জিডি করা হয়েছে। তার অভিভাবক মো. দিদার আলম জানান, গত কয়েকদিনে এলাকার আশাপাশ বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও আরিফের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
সর্বশেষ গত ২০ নভেম্বর নগরীর কোতোয়ালী থানায় জুম্মান ইসলাম সিয়াম নামে দশ বছর বয়সী আরেক শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় জিডি হয়েছে। সিয়াম নগরীর একটি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। তার অভিভাবকরা অনেক খোঁজখবর করেও তার কোনও হদিস পায়নি। এর আগে গত ২৫ অক্টোবর নগরীর চকবাজারে একটি কোচিং সেন্টারে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হওয়ার পর এখন পর্যন্ত নিখোঁজ রয়েছেন এবারের এইচএসসি পরীক্ষার্থী অনুভব মল্লিক তুর্য। তুর্য নগরীর বাকলিয়ার থানার শান্তিনগর ব্যাংক কলোনির তপন কান্তি মল্লিকের ছেলে। তিনি স্থানীয় হাজেরা-তজু কলেজের শিক্ষার্থী। বাসায় না ফেরায় তার অভিভাবকরা ওইদিন কোচিং সেন্টারে যোগাযোগ করলে কর্তৃপক্ষ জানায় তিনি কোচিংয়ে যাননি। এরপর আত্মীয়-স্বজনসহ সম্ভাব্য সব জায়গায় তার খোঁজ করেও সন্ধান পায়নি পরিবার।
এ ঘটনায় ওই রাতেই সিএমপির বাকলিয়া থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। এরপর থানাসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট অনেক চেষ্টা চালিয়েও এখন পর্যন্ত তুর্যের কোনও হদিস পায়নি।
নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আ স ম মাহতাব উদ্দিন পূর্বদেশকে বলেন, শিশু নিখোঁজের ঘটনায় দায়ের হওয়া জিডিগুলো গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করে দেখার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। থানা পুলিশ ছাড়াও বিভিন্ন ইউনিট সমন্বিতভাবে নিখোঁজ হওয়া শিশুদের সন্ধানে মাঠে তৎপর রয়েছে। এরইমধ্যে ল²ীপুর ও ফেনী থেকে দুই শিশু উদ্ধার ও ঘটনায় জড়িত আটজন গ্রেপ্তার হয়েছে। বাকিদেরও সহসা খোঁজ মিলবে বলে আশা করি।

বন্দর ও ইপিজেড এলাকা থেকে চুরি যাওয়া দুই শিশু উদ্ধার : নগরীর বন্দর ও ইপিজেড এলাকা থেকে চুরি করা দুই শিশুকে ফেনী ও লক্ষীপুর থেকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। গত ২২ নভেম্বর সিএমপির ইপিজেড ও বন্দর থানা পুলিশের আলাদা অভিযানে লক্ষীপুরের চন্দ্রগঞ্জ ও ফেনী সদর উপজেলা থেকে দুই শিশুকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা শিশুদের একজনের বয়স তিন বছর, আরেকজনের আট মাস। এই দুই শিশুর উদ্ধারের ঘটনায় মোট আট জনকে গ্রেপ্তার করার কথা জানিয়েছে পুলিশ। যাদের মধ্যে ছয় জনকে আগেও বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে ধরা হয়েছিল। উদ্ধারকৃত দুই শিশুর মধ্যে তিন বছর বয়সী শিশুকে গত ২২ সেপ্টেম্বর নগরীর বন্দর থানার কলসীদিঘীর পাড় এবং অন্যজনকে গত ২৭ অক্টোবর ইপিজেড থানার নিউমুরিং এলাকা থেকে চুরি করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
নগর পুলিশের উপকমিশনার (বন্দর) শাকিলা সুলতানা জানান, গত ২২ সেপ্টেম্বর বন্দর থানার কলসীদিঘীর পাড় এলাকা থেকে জেমি নামের তিন বছর বয়সী এক শিশুকে চুরি করে নিয়ে যায় এক যুবক। এ ঘটনায় শিশুটির বাবার করা মামলায় অভিযোগ করা হয়, নানীর সাথে কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রাম আসার পথে ট্রেনে এক যুবকের সাথে পরিচয় হয়। ওই যুবক চট্টগ্রাম রেল স্টেশনে নেমে তাদের সঙ্গে কলসীদিঘীর পাড় পর্যন্ত যায়। এ সময় সে পেছন থেকে জেমিকে নিয়ে দৌঁড়ে পালিয়ে যায়।
এ মামলার তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ কয়েক দফায় কুমিল্লার লাকসাম, চৌদ্দগ্রাম ও ঢাকার বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে। এক পর্যায়ে গত ২২ নভেম্বর মিরসরাই উপজেলার বারৈয়ারহাট এলাকা থেকে জয়নাল আবেদীন ওরফে সুমনকে (২৭) গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেয়া তথ্যে ফেনী সদর উপজেলায় আমেনা আক্তার নামে এক নারীর হেফাজত থেকে শিশু জেমিকে উদ্ধার করা হয়। আমেনা আক্তার নিঃসন্তান। গ্রেপ্তার সুমন চুরি করা শিশু জেমিকে তার শ্যালিকার মেয়ে পরিচয়ে ‘দত্তক’ দিয়েছিল। বিনিময়ে সুমন তার কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা নেয়।
এদিকে, গত ২৭ অক্টোবর ইপিজেড থানার নিউমুরিং এলাকা থেকে চুরি করা সাত মাস বয়সী আরেক শিশুকে লক্ষীপুরের চন্দ্রগঞ্জ উপজেলা থেকে উদ্ধার করে ইপিজেড থানা পুলিশ।
ইপিজেড থানার ওসি আব্দুল করিম জানান, সাত মাস বয়েসী শিশুকে নিয়ে নিউমুরিং এলাকায় একটি বাসায় থাকতেন তার বাবা-মা। ওই বাসায় এক রুমে সাবলেট নিয়েছিলেন কামরুল হাসান-তানিয়া দম্পতি ও মামুন নামের আরেকজন। গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় ওই শিশুকে ঘর থেকে চুরি করা হয়। শিশুর মায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে ওইদিনই কামরুল হাসান, তার স্ত্রী তানিয়া ও তাদের পরিচিত রুবেল নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বায়েজিদ থানার আমিন জুট মিল এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় আরও দুইজনকে। পরে নোয়াখালীর সেনবাগ থেকে গ্রেপ্তার করা হয় সীমা আক্তারকে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা শিশুটিকে লক্ষীপুরের চন্দ্রগঞ্জে রোমেনা আক্তার নামে এক নারীর কাছে রাখার তথ্য জানায়। গত ২২ নভেম্বর গোপন তথ্যের ভিত্তিতে রোমেনার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ওই শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে। ওই শিশুকে চুরি করে পরদিনই চন্দ্রগঞ্জে রোমানার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। রোমানা শিশুটিকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় আত্মগোপনে ছিলেন। পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তারকৃতরা সংঘবদ্ধ শিশু পাচারকারী দলের সদস্য।