সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে লিটারে ৭ টাকা

21

ফারুক আবদুল্লাহ

দেশে বছরে ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে ২০ লাখ টন। এর মধ্যে দেশে উৎপাদিত সরিষা, সূর্যমুখীসহ অন্যান্য তেলবীজ থেকে সোয়া দুই লাখ টন তেল পাওয়া যায়। মোট চাহিদার বাকি ৯৫ শতাংশ ভোজ্যতেল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এসব তেল মালয়েশিয়া, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে থেকে আমদানি হয়ে থাকে।
এদিকে আবারও আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ার অজুহাতে দেশের বাজারেও বেড়েছে সয়াবিন তেলের দাম। এবার প্রতি লিটারে ৭ টাকা বেড়েছে। এখন থেকে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৬০ টাকা দরে বাজারে বিক্রি হবে। এই দাম দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। যা আগের দাম ছিল ১৫৩ টাকা। আর পাঁচ লিটারের এক বোতল তেল পাওয়া যাবে ৭৬০ টাকায়, যা এত দিন ছিল ৭২৮ টাকা। এছাড়া খোলা এক লিটার সয়াবিন তেল ১৩৬ টাকা ও বোতলজাত পাম সুপার তেল ১১৮ টাকা দরে কিনতে হবে ক্রেতাদের।
গতকাল মঙ্গলবার তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বাণিজ্য মন্ত্রণালয় চ‚ড়ান্ত করে বাংলাদেশ ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী ও বনস্পতি উৎপাদক সমিতিতে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন ও অপরিশোধিত পাম তেলের দাম বাড়ায় বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে তেলের এই দাম নির্ধারণ করেছে সংগঠনটি। আজ বুধবার থেকে নতুন এ দাম কার্যকর হবে বলে জানানো হয়। তবে পরিবেশক ও খুচরা পর্যায়ে পুরোনো মজুতের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হবে না বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
এর আগে গত ২৭ মে সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৯ টাকা বাড়ানো হয়। তবে পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগে সয়াবিন তেল লিটার প্রতি তিন টাকা ছাড় দেওয়ায় সেবার সব মিলিয়ে দাম বাড়ে ১২ টাকা। এছাড়া ২০১২ সালের মাঝামাঝিতে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম সর্বোচ্চ ১৩৫ টাকায় উঠেছিল। গত এক দশকে প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম ১০০ থেকে ১১৫ টাকার মধ্যে ওঠানামা করলেও গত এক বছর ধরে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যটির বাজার ছিল লাগামহীন।
বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের সচিব মো. নুরুল ইসলাম মোল্লা স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন তেল ও পাম ওয়েলের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বিবেচনায় বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে নতুন এ দাম নির্ধারণ করা হয়েছে।
কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে বিশ্ববাজারে ভোজ্যতেলের দাম কমছে। নিত্যপণ্যের বাজার বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত কয়েক মাস ধরে ধারাবাহিকভাবে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম কমছে। সেপ্টেম্বর মাস শেষে প্রতি টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল এক হাজার ৩৯৮ ডলারে বেচাকেনা হয়েছে। গত আগস্টে যার প্রতি টনের দাম ছিল এক হাজার ৪৩৪ ডলার। তার আগে জুলাইয়ে প্রতি টন অপরিশোধিত ভোজ্যতেলের দাম ছিল এক হাজার ৪৬৮ ডলার, জুনে এক হাজার ৫১৮ ডলার এবং মে মাসে এক হাজার ৫৭৪ ডলার। চলতি অক্টোবরে দাম আরও কমেছে। অথচ দেশের বাজারে পণ্যটির দাম বাড়ছেই।
খাতুনগঞ্জের আল মদিনা ট্রেডার্সের স্বত্ত্বাধিকারী এহসান উল্লাহ জাহেদী জানান, চট্টগ্রামে ভোজ্যতেলের বড় সরবরাহকারী হলো সিটি গ্রুপ। মঙ্গলবার খাতুনগঞ্জে পাইকারিতে সিটি গ্রুপের পাম অয়েল মণপ্রতি ৫ হাজার থেকে ৫ হাজার ৫০ টাকা এবং সয়াবিন মণপ্রতি ৫ হাজার ৪৫০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আর এস আলম গ্রুপ, টিকে গ্রুপ এবং মেঘনা গ্রুপের পাম অয়েল ও সয়াবিন তেল উল্লেখিত মূল্যের ১০ থেকে ২০ টাকা কমবেশি বিক্রি হয়েছে।
তিনি বলেন, ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধির কারণে বাজারে প্রভাব পড়বে।এতে খুচরা পর্যায়ে দামও বাড়বে। একারণে ভোক্তাদের মধ্যে আরেক দফা চাপ বাড়বে।
বহদ্দারহাট মক্কা ট্রেডিংয়ের মালিক দিদার জানান, দাম বেড়েছে। তবে আগের দামে কেনা পণ্য এখানো বিক্রি চলছে। তাই মঙ্গলবার সয়াবিন লিটার ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। বাজারে নতুন করে নির্ধারিত মূল্যের পণ্য আসলে দাম বাড়বে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, আমার মনে হচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দাম বাড়ানোর জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত। কারণ ব্যবসায়ীরা আবেদন আরও আগেও করেছে। কিন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয় হঠাৎ করেই দাম বাড়ানোর কথা বলছে। এতে বুঝা যায় দাম বাড়ানোর জন্য খুব বেশি আগ্রহী বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তাছাড়া ভোজ্যতেলের ব্যবসায়ী ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে এই দাম বাড়ানো হয়েছে। এজন্য আর কারো সাথে আলোচনা করা হয়নি।