স্লুইস গেটের উপযোগিতা নিয়ে ভিন্নমত

24

এম এ হোসাইন

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চলমান দু’টি প্রকল্পের অধীনে খালের মুখে বসছে ১৭টি রেগুলেটর (স্লুইসগেইট)। এরমধ্যে মেগাপ্রকল্পের অধীনে ৫টি ও শাহ আমানত সেতু থেকে কালুরঘাট সড়ক কাম বেড়িবাঁধ প্রকল্পের অধীনে ১২টি রেগুলেটর নির্মাণের কাজ চলছে। প্রকল্পে জোয়ারের পানি ঠেকানোর জন্য এসব রেগুলেটরকে মূখ্য হাতিয়ার হিসাবে বিবেচনা করা হলেও স্থানীয়রা তা মানতে নারাজ। তাছাড়া সমন্বিত কাজ না হওয়ায় অর্থের অপচয়ের অভিযোগও উঠছে।
গত ১১ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে বিচারক মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান একটি পোস্টে লিখেন, ‘চাকতাই রাজাখালি খালের মুখে এই স্লুইসগেইট। এরপরেও পাশাপাশি দু’টি ব্রীজও আছে। কাজেই খালে এই রকম স্লুইসগেটের কি প্রয়োজন ছিল? খরার সময় চাষাবাদের জন্য পানি আটকানোর প্রয়োজন না থাকলে ঠিক খালের মুখে এটা বানানোর দরকার ছিল যেখানে জলাবদ্ধতায় পুরো শহরের মানুষ কষ্ট পায়। এই খালের চরিত্র আমার ভালো জানা আছে। কারণ এই স্লুইসগেটের একশ-দেড়শ মিটার আগে খালে পাড়ের এক বাসায় আমার জন্ম। কাজেই কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি দিয়ে এই গেটের যৌক্তিকতা আমাকে বুঝানো যাবে না। অবশ্য আমি বুঝলেও কি, না বুঝলেও কি! আমরা যারা সাধারণ মানুষ আমরা তো এই দেশের কেউ না’।
এই পোস্টের কমেন্টে বিভিন্ন পেশার অনেক মন্তব্য করেন। যেখানে নানা দিক তুলে ধরেন মন্তব্যকারীরা। এখানে এজিএম জাহাঙ্গীর আলম নামের একজন লিখেন, ‘আমার বিশ্বাস ক’দিন পর ভাঙার জন্য অপরিকল্পিত এই স্লুইচগেট নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে কিছু মানুষ আঙুল ফুলে কলাগাছ হবে মাত্র, কোনো উপকারে আসবেনা এই স্লুইচগেট’। যিশু রায় চৌধুরী কমেন্ট করেন, ‘এসব করতে গিয়ে একযুগ পার করার উপক্রম। খাল খননের নামে যে তামাশা তা আর বললাম না। খালের কোনো কোনো অংশে মাছের চাষ চলছে’।
উৎপল বড়ুয়া লিখেন, ‘আমাদের সব কাজ স্বল্প মেয়াদী চিন্তার। দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল চিন্তা করিনা বলেই এ ধরণের অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে’। মোহাম্মদ এইচ মাসুম লিখেন, স্লুইস গেইটকে ব্রিজ হিসেবে ব্যবহার করা যেত, এখন দেখা যাচ্ছে পাশেই নতুন কিছু ব্রিজ করছে, পয়সার অপব্যবহার’। ‘এই স্লুইস গেইট মরণ ফাঁদ হবে’- এমন মন্তব্য করেন সাংবাদিক আলিউর রহমান রশ্নি। এদিকে খালের মুখে রেগুলেটর স্থাপনে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তির কোনো আশা দেখছেন না স্থানীয় বাসিন্দারা। যুগ যুগ ধরে বসতি করা খাল পাড়ের বাসিন্দারা খালের গতি-প্রকৃতির সাথে এই রেগুলেটরকে মিলাতে পারছেন না। ব্রিজ-রেগুলেটর আলাদাভাবে করার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তারা।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, ব্রিজ আর স্লুইসগেইট এক জিনিস না। ব্রিজ পানির প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণের জন্য না। ওখানে যেটা হচ্ছে গেইটা টাইডাল রেগুলেটর বা নেভিগেটর। এটা স্লুইসগেটের মতোই। অতিরিক্ত জোয়ারের সময় পানি প্রবাহকে রোধ করার জন্য রেগুলেটর। এটার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নয়, আয়তন বা ঠিক আছে কিনা গেইটা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। আবার স্ট্রাকচারের সাথে রেগুলেটরে ব্রিজও করা যেতে পারে, তবে গেইটা ল্যান্ড আয়তন ও খরচের উপর নির্ভর করে।
তিনি বলেন, যে ডিজাইন গেইটার সুফল আসার জন্য যথেষ্ট না। আমরা প্রথমে ১০০টি খাল, পরে ৭০টি, তারপর ৫৭টি খালের কথা বলেছি। এখন ৩৬টি খালে কাজ করা হচ্ছে। সকল কাজ একেবারে শেষ হলেও এটি সম্পূর্ণ প্রকল্প না। তারপর এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ঠিক মতো না হলে উদ্দেশ্য ফেল করবে। রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি থাকলে এসব কাজ বুমেরাং হতে পারে।
সিডিএ দু’টি প্রকল্পের অধীনে ১৭টি রেগুলেটরের মধ্যে সেনাবাহিনীর তত্ত¡াবধানে পরিচালিত জলাবদ্ধতা নিরসনে মেগা প্রকল্পের ৫টি রেগুলেটরের কাঠামো স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। জলাবদ্ধতা নিরসন মেগা প্রকল্পের অধীনে নগরীর মহেশখাল, কলাবাগিচা, মরিয়ম বিবি, টেগপাড়া ও ফিরিঙ্গিবাজার খালের মুখে রেগুলেটর স্থাপন করা হয়েছে। মূল কাঠামো স্থাপনের কাজ শেষ হলেও নেদারল্যান্ড থেকে সরঞ্জাম না আসায় বসানো হয়নি গেইট। আগামি বর্ষার আগে রেগুলেটরগুলো পরিপূর্ণতা পেতে পারে। অন্যদিকে শাহ আমানত সেতু থেকে কালুরঘাট সেতু পর্যন্ত সড়ক কাম বেড়িবাঁধ প্রকল্পের অধীনে মোট ১২টি রেগুলেটর স্থাপন করছে সিডিএ। এই প্রকল্পের অধীনে রাজাখালী ও চাক্তাই খালের মুখে দু’টি রেগুলেটরের কাজও শেষের দিকে। চাক্তাই ও রাজাখালীর মুখের রেগুলেটরে চলাচলের রাস্তা (ব্রিজ) না থাকলেও বাকি ১০টি রেগুলেটরের সাথে ব্রিজ রাখা হয়েছে। সবগুলো রেগুলেটরের কাজ যখন চলমান তখন রেগুলেটর স্থাপনের যৌক্তিকতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।
প্রকল্পের কাজের তত্ত্বাবধানে থাকা বাংলাদেশ সেনাবাহিনার ৩৪ কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের পরিচালক লে. কর্ণেল শাহ আলী বলেন, রাজাখালী ও চাক্তাই খালে আমরা কোনো স্লুইসগেইট করছি না। সিডিএ সেখানে স্লুইসগেইট করছে।
একই বিষয়ে সিডিএ’র প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস বলেন, ওয়াটার বোর্ডের বিশেষজ্ঞদের প্ল্যান অনুযায়ী রেগুলেটরের কাজ করা হচ্ছে। লক্ষ্যভুক্ত এলাকার উপর ভিত্তি করে এগুলো করা হচ্ছে। চাক্তাই ও রাজখালীতে অনেক আগে ব্রিজ করা হয়েছে, তাই রেগুলেটরে ব্রিজের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। তবে শাহ আমানত সেতু থেকে কালুরঘাট সেতু পর্যন্ত সড়ক কাম বেঁড়িবাধে আমরা যে ১০টি রেগুলেটর করছি সেখানে ব্রিজসহ করছি। এখন যারা প্রশ্ন তুলছেন তারা হয়তো বিষয়গুলো জানেন না।
জলাবদ্ধতায় প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ ক্ষয়-ক্ষতি হয় ভোগ্যপণ্যের বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে। ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা বিভিন্ন সময় স্লুইসগেইট নির্মাণের দাবিও তুলেছিলেন। ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি স্থানীয় বসবাসকারী বাসিন্দারাও চরম ক্ষতি ও ভোগান্তি পোহাচ্ছেন বছরের পর বছর।
খাতুনগঞ্জ ব্যবসায়ী সমিতির নেতা সৈয়দ ছগির আহমেদ বলেন, আমরা ব্যবসায়ী সমাজ ছাড়াও বিভিন্ন পেশাজীবীদের দাবির প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী আন্তরিক হয়ে এই প্রকল্প দিয়েছেন। ২০২০ সালে প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা, আমরা এখনো কোনো অগ্রগতি দেখছি না। আদৌ কাজ শেষ হবে কিনা, হলেও কখন শেষ হচ্ছে আমরা কিছু জানি না। যাদের কাজ দিয়েছেন তাদের জবাবদিহিতার প্রয়োজন আছে। যে স্লুইসগেইট নির্মাণ করা হচ্ছে সেগুলোর কাজ শেষ হচ্ছে না। খালের মধ্যে অবৈধ স্থাপনা, মাটি থেকে গেছে। স্লুইসগেইটের নির্মাণ কাজ শেষ হলে আমাদের যে আকাঙ্খা অর্থাৎ আমরা সুফল পাবো আশা করি।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, রেগুলেটরে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি মিলবে। জোয়ারের পানি ঠেকানোর মাধ্যমে শহরে পানি প্রবেশ রোধ করা যাবে। তাছাড়া অধিক ক্ষমতা সম্পন্ন পাম্পের মাধ্যমে পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। যদিও বংশপরম্পরায় খালের গতিবিধি দেখে আসা স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন, এই রেগুলেটরই একদিন মরণ ফাঁদ হিসাবে দেখা দিবে।