স্মার্টফোনে আসক্তি, ছোটবড় সকলের সামাজিক দক্ষতা নষ্ট করছে

14

সুপ্রতিম বডুয়া

স্মার্টফোন খুবই একটি প্রয়োজনীয় ডিভাইস সকলেই আমরা জানি যা দিয়ে বড় থেকে শিশুরা গোটা বিশ্বকে জানছে। প্রতিনিয়ত আপডেট সংবাদগুলো জেনে নিচ্ছে এই স্মার্টফোন এর মাধ্যমে। কিন্তু ক্ষতি কতটুকু হচ্ছে সেটাকি ভাবছে? না কেউ ভাবছি না। রাতে শুয়ে স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার চোখের নানা সমস্যা তৈরি করছে তা কি ভাবছি? স্মার্টফোন থেকে বের হওয়া নীল রশ্মি মস্তিষ্কের কাজে বাধা দেয়। এতে রাতের ঘুম ব্যাহত হয়। এছাড়া চোখে রক্ত সঞ্চালনও ব্যাহত হয়। অনেকেই মোবাইলে পড়তে পছন্দ করেন । কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এর চেয়ে বই পড়া অনেক উপকারী। কারণ এক পাতা ই-বুক পড়তে যে সময় লাগে বইয়ের পাতায় চোখ বুলালে তার চেয়ে অনেক সময় কম লাগে। সেই সঙ্গে চোখের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কাও কম থাকে। একটানা মোবাইলের স্ক্রিনে চেয়ে থাকলে ফোনের আলো চোখের উপর খুব চাপ সৃষ্টি করে। কারণ এই আলো চোখের কর্নিয়া ও মণির মধ্য দিয়ে সরাসরি ভিতরে প্রবেশ করে, চোখ কোনওভাবেই এই আলোর তীব্রতা ফিলটার করতে পাড়ে না। ফলে রেটিনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় যা থেকে ‘ম্যাকুলার ডিজেনারেশন’ এই সমস্যা শুরু হয়। মূলত বয়সজনিত কারণে চোখের এমন সমস্যা হয়। তবে বর্তমানে খুব কম বয়সিদের মধ্যে এমন সমস্যা বা জুভেনাইল ম্যাকুলার ডিজেনারেশন বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ মোবাইলের নীল আলো। ফোনের দিকে একটানা চোখ আটকে থাকলে লাল হয়ে যায়, মনোসংযোগের অভাব দেখা যায়, মেলাটোলিন হরমোনের অভাবে ঘুমের সমস্যা তৈরি হয়, সারা শরীরে ব্রণর প্রবণতা বাড়ে। শিশুর মানসিক ও শারীরিক নানা পরিবর্তন হতে থাকে। শুধু শিশুরাই নয়, বর্তমানে এমন সমস্যায় বয়স্করাও আক্রান্ত। ফোনের আলোয় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি কমবয়সিদের। আসলে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখ নিজে থেকেই ক্ষতিকর আলো, বিষাক্ত কোনও উপাদান ইত্যাদির সঙ্গে লড়াই করতে পারে। চোখের লেন্স হলুদ বর্ণের হতে থাকে ফলে ক্ষতিকর নীল আলো সরাসরি চোখে প্রবেশ করতে পারে না। কিন্তু শিশুদের চোখ যেহেতু পুরোপুরি তৈরি হয় না তাই এই আলো সরাসরি প্রবেশ করে অল্পতেই চোখের ক্ষতি করে। ফলস্বরূপ শিশুদের চোখে স্ট্রেস, ক্যাটারঅ্যাক্ট, মাথাব্যথা ও রেটিন্যাল ড্যামেজের প্রবণতা খুব বাড়ছে। প্রয়োজনে ইউভি প্রটেকটেড গøাস পরে মোবাইল দেখা উচিত, ফোনের ব্রাইটনেস কমিয়ে তবে তা ব্যবহার করলে উপকার। আর ফোনের স্ক্রিন যেন ছোট না হয়, সে দিকে নজর রাখতে হবে। বড়রা চ্যাট করার সময় ফোনের ফন্ট সাইজ বড় করে তবে লিখুন। এতে চোখের উপর চাপ অনেকটা কমানো যায়।
একদৃষ্টিতে ফোনের দিকে তাকিয়ে না থেকে বারবার চোখ পিটপিট করলে খুব ভাল। একান্তই যদি অনেকক্ষণ মোবাইলের দিকে তাকিয়ে থাকার প্রয়োজন পড়ে সেক্ষেত্রে মোবাইলের ব্রাইটনেস কমিয়ে ব্যবহার করা উচিত। ফোনে রাখুন ব্রাইটনেস কমানোর অ্যাপস। যা নিজে থেকেই মোড পরিবর্তন করে মোবাইলের আলোর তিব্রতা কমায়। রাত্রিবেলা অন্ধকার ঘরে মোবাইলের দিকে দীর্ঘক্ষণ চেয়ে থাকলে চোখের ক্ষতি মারাত্মক। শরীরে ন্যাচারাল রিদম বিনষ্ট হয়, ওবেসিটি, হার্টের সমস্যা, স্ট্রোক ও মানসিক অবসাদ বাড়ে। তাই ঘুমনোর আগে মোবাইল ঘাটাঘাটি নয়। সাধারণত ৬-৭ ইঞ্চি চোখ থেকে দূরে রেখে মোবাইল ব্যবহার করা হয়, এতে ক্ষতি। চেষ্টা করুন ১২-১৫ ইঞ্চি দূরত্বে ধরে ফোন ব্যবহার করতে। ফোনের আলো খুব কম বা বেশি দুটোতেই ক্ষতি। যেমন আলোর মধ্যে আপনি রয়েছেন সেই অনুযায়ী ফোনের ব্রাইটনেস সেট করুন। দিনের আলোতে থাকলে ব্রাইটনেস একটু বেশি ও অন্ধকারে ব্রাইটনেস কম চোখের জন্য ভাল। মোবাইলের প্রতি আসক্তি শিশুদের সামাজিক দক্ষতা নষ্ট করেছে, যার জন্য শিশুদের নানান ধরনের শারীরিক ও মানসিক সমস্যা সৃষ্টি হয়। তাছাড়া এ আসক্তির ফলে শিশুদের নানা শারীরিক সমস্য হচ্ছে। মোবাইল বা ট্যাবের দিকের দৃষ্টি দিয়ে দীর্ঘ সময় বসে থাকার ফলে শিশুদের স্থূলতা বেড়ে যাচ্ছে। শিশুরা সামজিকভাবে বেড়ে উঠতে পারছে না। তাই মায়া মমতার জায়গা অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে। শিশুদের এইভাবে বেড়ে ওঠা ভবিষ্যতের জান্য অশনিসংকেত। কাছের মানুষের আদর-ভালবাসায় বেড়ে ওঠা শিশুরা বড় হয় মানবিক গুণাবলীর অধিকারী হয়ে। কিন্তু এই প্রযুক্তির অপব্যবহার শিশুদের অমানবিক করে তুলছে। দুই বছর করোনার কারণে অনলাইন ক্লাসের জন্য এই ফোন আমাদের সবার খুব প্রয়োজনে হাতের নাগালে ছিল। আগে বড়রা ফোন তত বেশি ছোটদের হাতে দিতেন না। এখন সবাই অনায়সে স্মার্ট ফোন ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু অনেকে ক্লাসের বা পড়ার কথা বলে, সেই স্মার্ট ফোনে, পাবজি কিংবা ফ্রি-ফায়ার গেইম খেলতে লেগে যায়। যে গেইমগুলো শিশুদের মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তা কখনো খেলা উচিত নয়। কিন্তু যারা এইসব গেইমে আসক্ত হয়ে যায়, তারা অনেকেই বুঝতে পারে না। স্মার্টফোন খুব দরকারি একটা জিনিস। তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এই যে, আজকে বৃষ্টি হবে কিনা তা খুব সহজে এ থেকে জানা যায়। কোথায় কী হচ্ছে, আমরা স্মার্ট ফোনের মাধ্যমে তা জানতে পারি। কিন্তু সব ব্যাপারে, মানে যে কোন বিষয়ে অপরিমিত কিছু ভালো না। যা যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু হওয়া উচিত। এখন আসা যাক আসক্তি প্রসঙ্গে। আসক্তি হচ্ছে যে কোনো বিষয়কে নেশার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। স্মার্টফোন আসক্তি হচ্ছে সেই অবস্থা বা পরিস্থিতি প্রয়োজন ছাড়া অনেকটা বাধ্যতামূলকভাবে কেউ মোবাইল ব্যবহার করছে। মোবাইল ছাড়া ৫ মিনিট থাকতে না পারাই আসক্তি। এই ব্যাপারটা শুধু যে অল্প বয়সীদের হয় তা কিন্তু না, অনেক সময় বড়রাও এমন আসক্তিতে পড়ে যায়, যা কারো জন্য ভালো নয়। শিশুরা দেশের সম্পদ। তাদের সুন্দরভাবে গড়ে তোলার দায়িত্ব পরিবার ও স্কুলের শিক্ষকদের। দিন দিন যেমন মানুষ স্মার্টফোননির্ভর হয়ে যাচ্ছে, তেমনি শিশুদের মোবাইল আসক্তি দিন দিন বাড়ছে, যা অভিভাবক তথা সমাজের জন্য বিরাট বড় চিন্তার কারণ হয়ে যাচ্ছে। আবার দীর্ঘ সময় মোবাইল ট্যাব অথবা কম্পিউটার ব্যবহারের ফলে শিশুর চোখ কিংবা মানসিক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। তাই এটা যখন প্রয়োজনে তখন ব্যবহার করতে দিতে হবে। এই যে, জায়গা স¦ল্পতার কারণে ছোট বাসায় আমরা বাস করি, সেখানে খেলার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই। অনেক সময় এমন পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে শিশুদের স্মার্ট ফোনে খেলাধুলা করতে দিতে হয়, যা তাদের জন্য ক্ষতিকর। পরিবারে মা-বাবা, বড় ভাই-বোন, ঘরের কনিষ্ঠজনের জন্য বেশি সময় দিতে পারেন। ঘরের ভিতরে চাইলে কিছু খেলা করা যায়। আবার সুন্দর সুন্দর বই হতে পারে শিশুর বিনোদনের উৎকৃষ্ট মাধ্যম। বইয়ের চেয়ে ভালো বন্ধু আর নাই।
প্রযুক্তির এই গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কল্যাণে আমাদের জীবন যাপন অনেক সহজ হয়েছে। তবে এর ক্ষতিকর দিকও ইদানিং উন্মুচিত হচ্ছে বড় আকারে। শিশুদের মোবাইলের প্রতি আসক্তির অবশ্য অনেক কারণে হচ্ছে। সন্তানদের প্রতি বাবা-মায়ের সময় না দেওয়া এর মধ্যে অন্যতম। বেশিরভাগ বাবা-মা ব্যাস্ত থাকেন চাকরি বা ব্যবসার কাজে। অগত্যা মোবাইল দিয়ে বসিয়ে দেন। আবার এমনো হয়, অনেক মা সন্তান খেতে না চাওয়ায়, মোবাইল ফোন হাতে দেন। তারা ইউটিউবে গান শুনতে শুনতে বা কার্টুন দেখতে দেখতে খায়, এইভাবে ভুলের শুরু। এরপর দেখা যাচ্ছে, এই বিষয়গুলো আসক্তিতে পরিণত হচ্ছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, শিশুদের হাতে মোবাইল ফোনসহ কোনো ইলেকট্রনিক্স গেজেট দেওয়া উচিত নয়। এতে শিশুদের দেহে নানান রোগের জন্ম হয়। নাক, কান, গলা বিশেষজ্ঞ ডা. প্রাণগোপাল দত্ত বলেন, মোবাইল ফোন শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। মোবাইল ফোন থেকে নির্গত রশ্মি শিশুদের দৃষ্টি শক্তির ভীষণ ক্ষতি করে। যেসব শিশু দৈনিক পাঁচ-ছয় ঘণ্টা মোবাইল ফোনে ভিডিও গেম খেলে, খুব অল্প বয়সে তারা চোখের সমস্যায় পড়বে।

লেখক : ছড়াকার ও শিশুসাহিত্যিক