স্বেচ্ছাসেবী দিবস ও কিছু কথা

13

 

‘পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি, এ জীবন মন সকলি দাও। তার মত সুখ কোথাও কি আছে? আপনার কথা ভুলিয়া যাও’। কামিনী রায় তার ‘সুখ’ কবিতায় এভাবেই নিজে অন্যের মাঝে সুখ খুঁজে পেয়েছেন। মানুষ হিসেবে প্রত্যেকেরই এই ধরনের মানসিকতা থাকা উচিত। একজনের বিপদে-আপদে কিংবা অসহায় মুহূর্তে সহযোগিতা করতে পারার মাঝে কি যে সুখ তা কেবল নিঃস্বার্থ উপকারী মানুষই বলতে পারেন। সমাজে যাদের পরিচয় স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে। কথায় আছে, যাঁরা স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করেন তাঁরা ‘ঘরের খেয়ে বনের মহিষ তাড়ান’। শুধুমাত্র নিজের মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিপদগ্রস্ত অসহায় মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ান। তাদের উদ্দেশ্য পরিবার ও রাষ্ট্রের কল্যাণে নিজেকে আত্মনিয়োগের মাধ্যমে আলোকিত সমাজ গঠনে কাজ করা।
আজ ৫ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী দিবস। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ১৯৮৫ সালের ১৭ ডিসেম্বরের অধিবেশনে প্রতি বছর ৫ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী দিবস পালনের জন্য সরকার সমূহকে আহবান জানানো হয়। তারই ধারাবাহিকায় প্রতি বছর এই দিনে বিশ্বব্যাপি স্বেচ্ছাসেবী দিবস পালিত হয়ে আসছে। জীবনের সর্বত্র স্বেচ্ছাসেবীদের অবদান সম্পর্কে গণসচেতনতা এবং ঘরে ও বাইরে স্বেচ্ছাসেবায় অধিক সংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণে উৎসাহ প্রদান, আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী দিবস পালনের মূল উদ্দেশ্য। (সূত্র: উইকিপিডিয়া)
সময়ের সাথে সাথে পাল্টেছে কাজের ধরন, বেড়েছে ক্ষেত্র। একসময় পারিবারিক সীমাবদ্ধতার মাঝেও এলাকার উঠতি বয়সের তরুণরা সংগঠিত হয়ে শিক্ষা, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক চর্চাসহ সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ে সাংগঠনিকভাবে জোট বদ্ধ হয়ে কাজ করতো। বর্তমানের বিশ্বায়নের যুগে তরুণরা প্রযুক্তিগত সহায়তায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে নিজ এলাকার গন্ডি পেরিয়ে সহজে একে অপরের সাথে যোগাযোগ এবং মতের মিলের কারণে বহুমুখী সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের আনাচে-কানাচে কার্যক্রম করছে। এতে করে একে অপরের সহায়তায় ভালো কিছু উদ্যোগ উঠে আসছে।
স্বেচ্ছাসেবীরা সম্পর্ক খোঁজেন না, দল মতের ঊর্ধ্বে উঠে শুধুমাত্র মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে অন্যের বিপদে হাত বাড়িয়ে দেন। এতেই একজন স্বেচ্ছাসেবকের মানসিক প্রশান্তি। এইতো কদিন আগে, মহামারি নোভেল করোনা ভাইরাসের প্রার্দূভাবে বিশ্বব্যাপি এক ভয়াবহ চিত্র কারো অজানা নয়। সময়টা বুঝিয়ে দিয়েছে বাস্তবতা বড়ই কঠিন। সাধারণ মানুষের আয় রোজগার প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছিল, দিনে এনে খেটে খাওয়া মানুষ, রাস্তারধারে অনাহারে কাটিয়ে দেয়া পরিবারগুলো কেমন কেটেছে তাতো কমবেশী সকলেই জানি। তাদের খোঁজখবর রাখার জন্য রাষ্ট্রীয় সেবা সংস্থার পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবীরা নিজ উদ্যোগে নিজের জীবনবাজি রেখে কাজ করার হাজারো নজির আমরা দেখেছি। বিভিন্ন সময়ে মিডিয়া-পত্র-পত্রিকায় স্বেচ্ছাসেবীদের হাজারো গল্প কারো চোখ এড়িয়ে যাওয়ার নয়।
উল্লেখ না করলেই নয়, জরুরি প্রয়োজনে রক্ত শূন্যতায় যখন একজন রোগীর জীবন সংকটাপন্ন তখন স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতা সময়ের তোয়াক্কা না করে হাসপাতালে ছুঁটে যান নিজের রক্ত দিয়ে রোগীকে বাঁচিয়ে তুলতে। এছাড়াও পরিবেশের ভারসম্য রক্ষায় সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন, শিশু ও মায়েদের টিকা প্রদান কার্যক্রমে সম্পৃক্ততা, দুর্যোগ কালীন মুহূর্ত, বন্যা কবলিত কিংবা অগ্নিকাÐে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়াতে, তাদের জন্য খাবার, বস্ত্র, গৃহ সামগ্রী পৌঁছে দিতে, নদী ভাঙ্গনে বাঁধ নির্মাণ বা এলাকার রাস্তা সংস্কারে স্বেচ্ছাসেবীরা প্রতিনিয়ত কাজ করছে। নিরক্ষরকে অক্ষর জ্ঞান প্রদান, ঝরেপড়া শিশুদের জীবনমান উন্নয়নে কর্মসূচি গ্রহণ, শীত মৌসুমে শীতবস্ত্র বিতরণ, ধর্মীয় উৎসবে নতুন কাপড় ও খাবারসামগ্রী বিতরণ, অসহায় জনগোষ্ঠির স্বাস্থ্য সেবা ও চিকিৎসা নিশ্চিত, মৃত ব্যক্তির সৎকার, হাসপাতালে অজ্ঞাত রোগীর সেবা শুশ্রæশা, অর্থাভাবে চিকিৎসা করতে না পারা মানুষের জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ, পরিবেশ রক্ষায় বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যা, সমাজের অসঙ্গতি দূর করতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, বাল্য বিবাহ, যৌতুক ও মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনসহ সময়োপযোগী নানামুখী মানবিক উদ্যোগে এই স্বেচ্ছাসেবীরাই ব্যক্তিস্বার্থ উপেক্ষা করে সময়ে অসময়ে লড়ে যাচ্ছে।
অহংকার ও লোভ কখনই একজন স্বেচ্ছাসেবীকে স্পর্শ করতে পারে না। কারণ তারা অন্যের জন্য নিজের অর্থ-সময়-শ্রম উৎসর্গ করে। জীবন ও জগত সম্পর্কে আত্মবিশ্বাসী থেকেই তারা অন্যের অধিকার পূরণে এগিয়ে যায়। একজন স্বেচ্ছাসেবক নিজের ইচ্ছায় পরের উপকার করতে গিয়ে বাহাবা যেমন পায় আবার ক্ষেত্র বিশেষে নেতিবাচক কথাও শুনতে হয়। সবরকম পরিস্থিতির জন্যই একজন স্বেচ্ছাসেবককে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হয়।
মানুষ হিসেবে জীবনে কে উপভোগ করতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি সকলেরই বাস্তবমুখী সামাজিক শিক্ষা গ্রহণ জরুরি। যা চারপাশের পারিপার্শ্বিক অবস্থা থেকে অর্জন করা সম্ভব। যে শিক্ষা নিজের মাঝে জাগিয়ে তোলে মানবিকতা। দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণে নিজের প্রতিভা, চরিত্র ও মানবিক গুণাবলির বিকাশে প্রত্যেককেই আত্মপ্রত্যয়ী হিসেবে গড়ে তোলে পাশাপাশি কলুষতামুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় অন্যায়-অনাচার, অপরাধবোধ, হীনম্মন্যতা পরিহারে নিজের মাঝে শুদ্ধ মানসিকতা ব্যাপক ভূমিকা রাখে।
কাজেই, স্বেচ্ছাসেবী হলেই নিজের মাঝে মানবতাবোধ জাগ্রত হয়। স্বেচ্ছাসেবীর জন্য বয়স, পেশা কখনই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়না। শারিরীকভাবে সামর্থবান যেকোন ব্যক্তিই তার জন্য উপযুক্ত। পৃথিবীতে অনেক প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি নিঃস্বার্থভাবে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁদের কর্মযজ্ঞ সব সময়ই প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম অনুপ্রাণিত।
পরিশেষে, সবল বা দুর্বল নয়, প্রতিটি মানুষকে মানুষ হিসেবে বিবেচিত করে সুখে-দুখে হাতে হাত রেখে প্রত্যেকেই পারস্পরিক সমহর্মিতায় স্বার্থহীন সমাজকর্মী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করি। ‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য’ এই অমর বাণীটি বুকে ধারণ করে জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে সম্প্রীতি এবং শ্রদ্ধাশীল মনোভাব, ইতিবাচক চিন্তা-চেতনায় যার যার অবস্থান থেকে সর্বত্র মানবাধিকার সুরক্ষায় দেশ ও দশের কল্যাণে কাজ করে যাওয়াই আজকের এই স্বেচ্ছাসেবী দিবসের সার্থকতা। প্রত্যেক স্বেচ্ছাসেবকদের প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা।
লেখক: সামাজিক সংগঠক ও মানবাধিকার কর্মী।