স্বল্পমেয়াদী বন্যায় বর্ষার বিদায়

34

বাংলা ক্যালেন্ডারের পাতায় শ্রাবণের পাততাড়ি গুটানোর দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসছে। চলতি আগস্ট মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত রয়েছে তার আয়ুষ্কাল। পূবালী বাতাসে শ্রাবণের বিদায়ের মধ্য দিয়েই কাগজে-কলমে বিদায় নেবে বর্ষা মৌসুমও। যদিও প্রকৃতিতে কমবেশি তার রেশ থেকে যায় শরতের শৈশব পর্যন্ত।
আবহাওয়ার বিরাজমান পরিস্থিতিতে এবার শ্রাবণের বিদায়ের পূর্বাপর সাগরে একাধিক মৌসুমি লঘুচাপ সৃষ্টির আলামত দেখছেন আবহাওয়াবিদরা। যার অন্তত একটি নি¤œচাপেও পরিণত হতে পারে।
লঘু-নিম্নচাপের প্রভাবে দেশের অভ্যন্তর ও উজানে ভারী বর্ষণজনিত স্বল্পমেয়াদী বন্যা পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণকারী দেশ-বিদেশের একাধিক সংস্থার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পূর্বাভাস সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে বর্ষার বিদায়ক্ষণের সম্ভাব্য এমন চিত্রই পাওয়া গেছে।
অবশ্য দেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদী পূর্বাভাস সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ কমিটির সভায়ও একই কথা বলা হয়েছে। তবে, প্রতিবেশি ভারতের সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গের বেসরকারি সংস্থা ‘ওয়েদার অব ওয়েস্ট বেঙ্গল’ আগস্টের শুরুতেই বঙ্গোপসাগরের বাংলাদেশ ও তৎসংগ্ন অঞ্চলে একটি লঘুচাপ বা ঘূর্ণাবর্ত সৃষ্টি এবং তা নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে বলে প্রচার করলেও আপাতদৃষ্টিতে তার গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে। তবে, আগস্টের প্রথম পক্ষে অন্তত একটি লঘুচাপ সৃষ্টির আলামত বেশ জোরালোভাবেই বিদ্যমান রয়েছে বলে সংস্থাটির কর্মকর্তারা দাবি করছেন।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস প্রদানের লক্ষ্যে গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি গত ১ আগস্ট নিয়মিত সভা করে। সভায় আবহাওয়ার সর্বশেষ তথ্য-উপাত্ত, ঊর্ধ্বাকাশের আবহাওয়া বিন্যাস, বায়ুমন্ডলের বিভিন্ন স্তরের বিশ্লেষিত আবহাওয়া মানচিত্র, জলবায়ু মডেল, এল-লিনো এবং লা-নিনা অবস্থাসহ যাবতীয় উপাদান বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করে পূর্বাভাস প্রদান করা হয়।
সভাশেষে অধিদপ্তরের পরিচালক ও বিশেষজ্ঞ কমিটির চেয়ারম্যান সামছুদ্দিন আহমেদ জানান, জুলাইয়ের মত চলতি আগস্ট (শ্রাবণ-ভাদ্র) মাসেও দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। এছাড়া বঙ্গোপসাগরে দুই থেকে তিনটি বর্ষাকালীন মৌসুমী লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে অন্তত একটি জোরদার হয়ে নিম্নচাপে পরিণত হতে পারে। সম্ভাব্য এই লঘুচাপ-নি¤œচাপগুলো দেশে ভারী বর্ষণের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাতে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল, উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ফের স্বল্পমেয়াদী বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে।
অধিদপ্তরের (বিএমডি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জুলাই মাসে দেশের অভ্যন্তরে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। সাধারণত সারা দেশে জুলাই মাসে গড়ে প্রায় পাঁচশ’ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। এবার বিদায়ী জুলাইয়ে বৃষ্টি হয়েছে ছয়শ’ ২৫ মিলিমিটার। সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে। যার পরিমাণ এক হাজার ১৩ মিলিমিটার। অথচ, স্বাভাবিকভাবে গড়ে জুলাইয়ে চট্টগ্রাম বিভাগে সাতশ’ ২০ মিলিমিটার বৃষ্টি হওয়ার কথা। একইভাবে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগেও।
তবে সিলেট বিভাগ বন্যায় আক্রান্ত হলেও সেখানে গড় বৃষ্টিপাত কম হয়েছে। উজান থেকে নদীপথে নেমে আসা ঢলের পানিতেই মূলত ওই বিভাগে মৌসুমের প্রথম বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টির দেখা পেয়েছেন খুলনা বিভাগের বাসিন্দারাও। অথচ তার আগে গত মে (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ) এবং জুন (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়) পর পর দুই মাসে সারাদেশে সার্বিক বৃষ্টিপাত হয়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে তিন ভাগের এক ভাগ কম। এর মধ্যে মে মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে ২৫ দশমিক দুই এবং জুন মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে ৩৭ দশমিক সাত শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়েছে।
জুলাই মাসে বর্ষার মৌসুমী বায়ুর সক্রিয় প্রভাবে ৬ থেকে ১৪ জুলাই চট্টগ্রামসহ দেশের অনেক স্থানে ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ হয়। এ সময় একদিনে সর্বোচ্চ দুইশ’ ৫৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে সমুদ্রকন্যা কক্সবাজারের কুতুবদিয়ায়।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের আবহাওয়া বিভাগের পূর্বাভাসের ভিত্তিতে জানিয়েছিল, দেশে ‘ভয়াবহ বন্যা’ হিসেবে পরিচিতি পাওয়া বিগত ১৯৮৮ কিংবা ১৯৯৮ এর মতো বড় বন্যার আশঙ্কা এবার না থাকলেও দেশের অভ্যন্তরে এবং বাংলাদেশ সংলগ্ন নদ-নদীসমূহের উজানভাগের অববাহিকায় উত্তর-পূর্ব ভারত, বিহার ও নেপালসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে বৃষ্টিপাতের পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে আগস্টের শেষভাগে দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি রয়েছে। গত জুলাই (আষাঢ়-শ্রাবণ) মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকেই দেশের উত্তর-পূর্ব, দক্ষিণ-পূর্ব, উত্তররাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চল পর্যায়ক্রমে বন্যাকবলিত হয়। যা প্রধানত অভ্যন্তরীণ ও উজানের উত্তর-পূর্ব ভারতে অতিবৃষ্টিতে আসা ঢলের কারণে। এতে চট্টগ্রামসহ দেশের ২৮টি জেলা বন্যাকবলিত হয়।
বাড়ছে উষ্ণতাও : আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ কমিটির সভার পর্যালোচনায় বলা হয়, গত জুলাই মাসে সারাদশে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে যথাক্রমে এক ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং শূন্য দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ঊর্ধ্বমুখি ছিল। তার আগের জুন (জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়) মাসেও সার্বিকভাবে দেশে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন গড় তাপমাত্রার পারদ স্বাভাবিকের চেয়ে যথাক্রমে এক দশমিক আট ও শূন্য দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস ঊর্ধ্বমুখি ছিল। এটি দেশের আবহাওয়া-প্রকৃতির ক্রমাগত উষ্ণতা বৃদ্ধি বা তপ্ত হয়ে উঠার প্রবণতা নির্দেশ করে। তেমনি জুলাইয়ে ১৫ জুলাই থেকে মৌসুমী বায়ু দুর্বল হয়ে পড়লে ২৩ জুলাই পর্যন্ত দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যায়।