স্থায়ী প্রতিরোধে জাতীয় কর্মকৌশল গ্রহণ করুন

11

 

শীত আসছে ধীরলয়ে। সেই সাথে নির্বাচনের উৎসব উষ্ণতাও বাড়ছে। ঢিলেঢালায় চলছে হরতাল-অবরোধও। এসব উৎসব-আতঙ্কের মধ্যে একেবারে খবরের পেছনে পড়ে গেছে, এডিশ মশার কামড় ও ডেঙ্গু রোগীর দুর্দশা। এককথায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ও তাদের আত্মীয়স্বজনদের দুঃখ-দুর্দশার কথা নির্বাচন ও আন্দোলনে হারিয়ে গেছে। আমরা যেন বেমালুম ভুলতে বসছি; কিন্তু ডেঙ্গু আতঙ্ক এখনো দূর হয় নাই। প্রতিদিন ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃত্যুর খবর পাওয়া যাচ্ছে উদ্বেগজনকভাবে বিভিন্ন গণমাধ্যমে, সামাজিক মাধ্যম ও অনলাইন নিউজের মাধ্যমে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত গত সোমবার-মঙ্গলবার ২৪ ঘণ্টায় ৭৫৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এতে এই বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়াল ৩ লক্ষ ৭ হাজার ১৯৬ জন। নূতন করে ১২ জনের মৃত্যুর পাশাপাশি মোট মৃত্যুসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৯৫ জন। এদিকে চট্টগ্রামেও প্রতিদিন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হচ্ছে আর মৃত্যুর মিছিলও দীর্ঘ হচ্ছে। আমরা জানি, ২০১৯ সালের আগ পর্যন্ত এডিশ মশার বিস্তার ও ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব শুধু শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল; কিন্তু এবার গ্রামগঞ্জেও এ রোগের প্রাদুর্ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। ডেঙ্গু সমগ্র দেশে ছড়িয়ে পড়লেও প্রতিরোধে সরকারি কিংবা বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। এ নিয়ে সামাজিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানসহ সাধারণ মানুষের মধ্যেও দেখা যায় নি, তেমন সচেতনতা এবং প্রতিরোধমূলক কোন উদ্যোগ। সিটি কর্পোরেশন কিছুটা তৎপর থাকলেও মশার ঔষধ ছিটানো নিয়ে নগরবাসীর অসন্তুষ্টি রয়েই গেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যর্থ না হলে এর পরিস্থিতি দিনের পর দিন এত খারাপ হতে পারত না। সাধারণত আমরা দেখে আসছি বর্ষাকালে ডেঙ্গু বাড়ে। কারণ মে-জুলাই মাসে এডিস মশার প্রজনন হার বৃদ্ধি পেয়ে থাকে; কিন্তু স¤প্রতি দেখা যাচ্ছে, ডেঙ্গু এখন সব ঋতুতে সমানভাবে প্রভাব বিস্তার করে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই বছর আক্রান্তদের ৫১ দশমিক ৫ শতাংশ ডেন-২ এবং ৪৩ দশমিক ৯ শতাংশ ডেন-৩ ধরনে আক্রান্ত। করোনার মতো ডেঙ্গুর এই ভেরিয়েন্ট বা ধরন পরিবর্তনও আমাদের উদ্বিগ্ন করে তুলছে। এর ফলে একবার ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হলেও আবার একই বা অন্য ধরনের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে। প্রতিদিন এ নিয়ে খবর প্রকাশিত হলেও আমরা কোন কার্যকর উদ্যোগ না নিয়ে বরং আলোচনার টেবিলে আটকিয়ে রয়েছি। মাঠ পর্যায়ে সর্বাত্মক কর্মসূচি গ্রহণ যে জরুরি, সে ব্যাপারে আমরা এখনো উদাসীন। আমরা মনে করি, এখনই এই ব্যাপারে সতর্ক না হলে আগামী বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরো মারাত্মক রূপ ধারণ করবে, বলাই বাহুল্য। তাতে পরিস্থিতি অধিক সংকটাপন্ন হতে পারে। এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এমনকি ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত স্থানীয় সরকারের প্রতিটা স্তরে গ্রহণ করতে হবে প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি। এই ক্ষেত্রে জনগণকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে।
বর্তমানে আমাদের দেশে ডেঙ্গু একটি জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। এটি নিয়ন্ত্রণের জন্য কীটতত্ত¡বিদ ও টিকা বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়ে আসছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন কীটতত্ববিদদের পরামর্শ আমলে নেয়া হচ্ছে না, এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের নির্দেশনা প্রয়োজন রয়েছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০০০ সাল হতে ২০২২ সাল পর্যন্ত ডেঙ্গুতে যত মানুষ আক্রান্ত হয়েছে, এবার এই নভেম্বরের মধ্যে তার তুলনায় প্রায় দেড় গুণ বেশি আক্রান্ত হয়েছে। সে হিসেবে বিগত তেইশ বছরের চাইতে এবার প্রায় ১ দশমিক ৮ গুণ অধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এবার আক্রান্তদের ৬২ শতাংশের অধিক বয়স ৩০ বছরের নিচে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ডেঙ্গু বিস্তারের সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব রয়েছে। বিশেষকরে তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাব। ২০০০ হতে ২০১০ সালে দেশে গড় তাপমাত্রা ছিল ২৬ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে ২০১১ হইতে ২০২২ সাল পর্যন্ত গড় তাপমাত্রা দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই তাপমাত্রা বৃদ্ধি ডেঙ্গুর রোগ সৃষ্টিকারী এডিস মশার বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখছে। এছাড়া ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারের পক্ষ হতে যে সকল নির্দেশনা ও গাইডলাইন জারি করা হয়, তা যথাযথ বাস্তবায়ন না হবার কারণেও ডেঙ্গু ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
অতএব, ডেঙ্গু প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনার উন্নতির পাশাপাশি আমাদের চারিপার্শ্ব পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা ও গণসচেতনতার উপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। ফগিং মেশিনে ধোঁয়া ছাড়ার চাইতে জোর দিতে হবে লার্ভিসাইডের উপর। এছাড়া প্রাকৃতিকভাবে বিকল্প ব্যবস্থার উপর জোর দিতে হবে। সরকারের উচিৎ কালবিলম্ব না করে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়ন করা। নচেৎ আগামীতে এটি আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।