সোশ্যাল মিডিয়ার যত কথা

8

আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস

তাওহীদুল ইসলাম নূরী

সাধারণত, ১৯৮১ সাল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এবং ১৯৯৭ সাল থেকে বাংলাদেশে মিছিল, সমাবেশ, মানববন্ধনসহ নানান আয়োজন উৎসবের মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী নারীর প্রতি সকল বৈষম্য এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জানান দিতে প্রতি বছর এই দিনে পৃথিবীর প্রায় সব দেশে দিবসটি উদযাপিত হয়ে আসছে। একইসাথে প্রতিবছর ২৫ নভেম্বর থেকে ১০ ডিসেম্বর মানবাধিকার দিবস পর্যন্ত ‘আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ’ ও পালিত হয়ে থাকে। কিন্ত, সেই আদি থেকে নারীর প্রতি যে নির্মম, নিষ্ঠুর বৈষম্য তার তেমন একটা পরিবর্তন লক্ষ্যণীয় করা যাচ্ছে না। বরং, নারীর প্রতি নির্যাতনের মাত্রা দিন দিন যেন বেড়েই চলছে। যৌতুকের বলি হয়ে স্বামীর হাতে খুন, তুচ্ছ কারণে স্বামীর হাতে শরীরের অঙ্গ হানি, কথায় কথায় তালাক, গণপরিবহনে নিপীড়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা চাকুরীসহ নানানক্ষেত্রে নারীর প্রতি বৈষম্য আজও ব্যাপকভাবে লক্ষ্যণীয়। প্রতি বছর এত উৎসবের মধ্য দিয়ে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস পালনের পরও ‘দিন দিন নারীর প্রতি বৈষম্য কেন বেড়ে চলছে?’ এমন প্রশ্ন যখন জাগে, তখন উত্তরে উঠে আসে, আমরা দিবস ভেদে দিবসের প্রয়োজনে নীতি কথা বলতে পছন্দ করি। কিন্ত, সেই নীতি কথা সমাজ, দেশ, পৃথিবীর মাঝে বাস্তবায়ন করার কাজকে বিরক্তবোধ মনে করি। তাইতো দেখা যায়, নারী যখন তালাক, যৌতুক, যৌন হয়রানি, অ্যাসিড নিক্ষেপসহ প্রভৃতি স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে আদালতের দারস্থ হয়, তখন তাদের অধিকাংশের অভিযোগ শুনানি পর্যন্ত গড়ায় না, গেলেও তা বাতিল হয়ে যায়। এক প্রতিবেদনে দেখা যায় এই কঠিন বাস্তবতার ফাঁদে ৯৭ শতাংশ নারী-ই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। আর, আদালত যখন সহিংসতার সাথে অভিযুক্তদের কঠোর হস্থে দমন না করে নিরব থাকে, তখন তা তাদেরকে সমর্থন করার মত হয়েই দাঁড়ায়। ফলে দিন দিন নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়ছে তো, বাড়ছেই।
একশন এইড বাংলাদেশ এক সময় দেশের ২০টি জেলায় সংগঠিত ২ হাজার ৮০০টি নারী সহিংসতা ও সহিংসতার ফলাফল নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেই প্রতিবেদনে দেখা যায় একটি পরিবারের পক্ষে টাকা খরচ ও সময় দিয়ে মামলা পরিচালনা করা কঠিন। তাই, শতকরা ৯০ ভাগ মামলাই আলোর মুখ দেখে না। অথচ, আমরা যারা নারী দিবস কিংবা নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবসের আয়োজন করে থাকি, সভা সমাবেশে নীতি কথার গল্প বলে থাকি, সকল সহিংসতা রোধে নারীদের পাশে থাকার প্রতিশ্রæতি দিয়ে থাকি তারা যদি সত্যিকারে নারীদের বিপদে তাদের পাশে দাঁড়াতাম, তখন হয়ত পরিণতি এমনটা হত না। আর আমরা একটা বারও মাথায় আনি না যে, আমাদের উদাসীনতার ফলেই একদিকে যেমন ভুক্তভোগীরা নিরাশ হচ্ছে, অন্যদিকে অভিযুক্তদের সংখ্যাও বাড়ছে।
আবার দেখা যায় কর্মক্ষেত্র কিংবা বাহিরের অন্য কোথাও নয়, নিজ ঘরেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী অনিরাপদ। তাই নারীদের ব্যাপারে পরিবার থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অঙ্গন পর্যন্ত সর্বত্র আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। বিচার বিভাগকে নিরপেক্ষভাবে সব তদন্ত করে সহিংসতার অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে, অভিযুক্ত নিপীড়কের বিরুদ্ধে শাস্তির যে বিধান আছে তা কার্যকর করতে হবে। আর তখনই সার্থকতা আসবে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস পালনের। সত্যিকার অর্থে ক্রমাগতভাবে বন্ধ হবে নারীর প্রতি চলমান সকল সহিংসতা।