সে এক হরগোবিন্দের কাহিনী

29

জেলের ছেলে। হরেগোবিন্দ জলদাস। লেখাপড়ার প্রতি খুব ঝোঁক। পরিবারে এ পর্যন্ত কেউ বিদ্যালয়ে যায়নি। বুড়োদের অভিমত এই যে, জেলেদের জাল নিয়েই সংসার। লেখাপড়াটা তাদের জন্য সময় নষ্ট করা ছাড়া আর কিছু নয়। সুতরাং হরগোবিন্দের লেখাপড়া করার বাসনার অচিরেই যে সমাপ্তি ঘটবে এ বিষয়ে বাড়ি ও পাড়ার অধিকাংশ বয়স্কজনেরই আর আশংকার অবকাশ থাকল না।

হরগোবিন্দকে দেখতে পারত পাশের কায়স্ত বাড়ির একজন শিক্ষক, হেমন্ত দত্ত। ছেলেটার প্রতি তার স্বতন্ত্র এক স্নেহবোধ অনেকজনকেই ভাবায়! হেমন্ত বাবুও জানেন না কেন তিনি ওই জেলের ছেলেটিকে এত স্নেহ করেন। ছেলেটার বয়স যখন আট, একদিন হেমন্ত বাবু গেলেন ছেলেটার বাড়িতে। চল্লিশ বছর বয়সি মাস্টার বাবুকে নিজের ঘরের সামনে দেখে অবাকই হলো পঁয়ত্রিশ বছর বয়সি রঙ্গমোহন, হরগোবিন্দর বাবা!
রঙ্গ কাকা, হরগোবিন্দের তো ইস্কুলে যাবার বয়স হয়েছে। শুনলাম তুমি নাকি তাকে ইস্কুলে যেতে দিচ্ছ না। সত্যি?-হেমন্ত বাবুর প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে বলতে থাকে রঙ্গমোহন:
প্রতিদিন যে সংসারের চুলোয় হাঁড়িই চড়ে না, তাদের কোন সন্তান ইস্কুলে যাবে তা কি হাস্যকর কথা নয় কাকা?
তার মানে টাকার অভাবে হরগোবিন্দকে ইস্কুলে পাঠাতে পারছ না, তাই বলতে চাও কাকা?
মাথা নেড়ে সম্মিত জানাল রঙ্গমোহন।
একটুখানি ভেবে বলতে থাকেন শিক্ষক হেমন্ত বাবু, ঠিক আছে রঙ্গ কাকা, আমিই হরগোবিন্দের লেখাপড়ার সব খরচ বহন করব। বই তো সরকারই দিচ্ছে। খাতা-কলম আর ইস্কুল ড্রেসের ব্যবস্থা না হয় আমিই করব। প্লিজ কাকা,তুমি আর না কর না।
বাবা আর হেমন্ত স্যারের কথোপকথনের সময় কাছেই দাঁড়িয়েছিল হরগোবিন্দ। সে শুনতে পেল বাবা বলছে, ঠিক আছে কাকা, তুমি যখন সব ভার নিজেই নিয়ে নিলে তো আমার আর না করার কারণ নেই। দেখ তার মধ্যে কিছু পাও কিনা? তোমরা নাকি বাচ্চাদের চোখ দেখেই আন্দাজ করতে পার কোনটা কদ্দূর উঠবে। দেখ কাকা বাজিয়ে কেমন মাল মগজে আছে।

সেই থেকে হরগোবিন্দর জেলে বংশের প্রথম বিদ্যালয়গামী বংশধরের নতুন জীবন শুরু!
বুড়োরা হরগোবিন্দর ইস্কুলে যাবার সময় প্রতিদিন দাওয়ায় বসে হা করে তাকিয়ে থাকে। তার মা অভাবী সংসারের কর্ত্রী। বাবা খালে বিলে জাল বেয়ে যা মাছ পায় তা বিক্রি করে টেনেটুনে সংসার চালিয়ে নিচ্ছে।

হরগোবিন্দর স্মৃতিশক্তি প্রবল। ইস্কুলে যাবার প্রথম দিন থেকেই তা শিক্ষকদের দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হল। দিন যায় মাস যায়। হরগোবিন্দর নাম এ মুখ থেকে ও মুখে; এর কান থেকে ওর কানে ছড়িয়ে পড়তে থাকে মহামারীর ভাইরাসের মতই দ্রæত থেকে দ্রæততর। কিছু কিছু লোকের কাছে তা অসহনীয় লাগে। যুগের হাওয়া অনেক পাল্টে গেলেও কিন্তু সম্ভ্রান্তের ছায়ায় এখনো বিস্তর সন্ত্রাসী আশ্রয় পায়। যারা কিনা কাক হয়েও কাকের মাংস খায়।

হরগোবিন্দ এস.এস. সিতে দারুণ রেজাল্ট করে। হেমন্ত বাবুতো খুশিতে আটখাানা। জেলে পাড়ায় আনন্দোৎসব। হরের বাবা ও মা দারিদ্রের জন্য তেমন কিছু না করতে পারলেও মনের আনন্দটা প্রকাশ করতে কার্পণ্য করছে না কিছুতেই। মা-বাবার আনন্দে হরগোবিন্দও আনন্দিত বেশ!
অনুকূল সাড়া পেলে মেধা তার কাÐ থেকে শাখা-প্রশাখা বের করে বিশাল বৃক্ষে পরিণত হতে বেশি সময় নেয় না। হরগোবিন্দর ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটল না! কিন্তু, বংশগত আভিজাত্যেরও যে কিছু সুফল থাকে, তার কিছুই তো তার স্বভাব-চরিত্রে নেই। উচ্চ মাধ্যমিকে গিয়ে ক্রমাগত ধাক্কা খেতে থাকে সে এ ধরনের অপাঠ্যসূচীসম্ভুত বিষয়ে ও ব্যাপারে। একদিন এক ব্রাহ্মণের মেয়ে সহপাঠিনীর সাথে সামান্য কথা কাটাকাটি থেকে তার মনে এক গভীর শূন্যতার সৃষ্টি হল। কাউকে তা শেয়ার করল না সে বিন্দুমাত্রও!
কেউ কেউ এরি মধ্যে পথে ঘাটে হরগোবিন্দকে ছোটখাট টিটকারি মারতে শুরু করে দিয়েছে। বংশ ও বাড়িতে এমন কোন আপনজন নেই যাকে সে ব্যাপারটা শেয়ার করবে। হেমন্ত স্যারকে তো আর সব কথা বলা যায় না। লেখাপড়ার প্রতি ধীরে ধীরে অনীহা জন্মাতে লাগলো তার মনে।
:ওই যে গোবরের পদ্মফুল যায়।
:তাই তো। মা বাপে যার নামই লিখতে পারে না। টিপসই দেয়,তাদের ছেলে হরয়্যা নাকি এসএসসিতে গোল্ডেন পেয়েছে!
:হেমন্ত স্যারেরও বোধহয় তার মায়ের ওপর চোখ পড়েছে।
:পাতা ঢাকা পদ্ম কিনা।
:রঙ্গ হাইরগ্যাতো সারাদিন জাল নিয়ে খালে বিলে থাকে। না না উছিলায় দেখি ইদানিং হরয়্যাদের ঘরে স্যারের যাতায়াত বেড়েই চলেছে।
হরগোবিন্দের পিছু নিয়ে অভিজাত বাড়ির কিছু লোক তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে কথাগুলো বলে যেতে লাগল।
হরগোবিন্দ পিছু ফিরে একটিবারও না তাকাল না, একটা কথাও বলল না। সবাই মানি মানুষ এবং গুরুজন কিনা!

পরেরদিন সকাল বেলা সারা পাড়া ছড়িয়ে পড়ল কথাটা; জাইল্যা বাড়ির হরয়্যা ফাঁস খাইয়ে।
মা আর বাবার কান্নায় সারা বাড়িটাও যেন চিৎকার করে কাঁদছে। সম্পর্কে দাদু এক বুড়ো বলতে থাকে; বলেছিলাম বার বার জেলের ছেলের ইস্কুলে যেতে নেই। পাপ। এখন যা হবার তাই হয়েছে। কেউ তো আর মেরে যাইনি তাকে?
হেমন্ত বাবু খবর পেয়ে আসলেন। দেখলেন। যেতে যেতে বলে গেলেন: স্বপ্ন দেখেছিলাম আর একজন হরিশঙ্কর পয়দা করব। কিন্তু পারলাম কই? সমাজতো এখনো তাদের পথে প্রচুর প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রেখেছে।

হরগোবিন্দ তো সবার মুখে লাথি মেরে চলে গেল।
কথাগুলো বলতে বলতে বারে বারে চোখ মুছতেছিলেন তিনি।

কী আশ্চর্য, হাতে হাতে মুষ্ঠিফোনের কালেও বাংলাদেশের সমাজে আজো জাত নিয়ে কত বাজে কথা সেই সব লোকদের মুখে উচ্চারিত হয় যারা কিনা অভিজাত এবং শিক্ষিতের দাবীদার! প্রতিভাদীপ্ত শিশুমাত্রকেই হেমন্ত স্যারের মত সার্বিক সাহায্য সহায়তা দিয়ে নির্বিঘেœ বেড়ে উঠতে দেয়াটাই তো সবার কর্তব্য হওয়া উচিৎ। নয় কি?