সুমহান চরিত্রের অধিকারী প্রিয় নবী (স.)

14

 

আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবন মানবসভ্যতার জন্য অনুপম উপহার। প্রতিটি মানুষের জন্যই তাঁর জীবন অনুকরণীয় ও অনুসরণীয়। তিনি অবিস্মরণীয় ক্ষমা, মহানুভবতা, বিনয়-নম্রতা, সত্যনিষ্ঠতা প্রভৃতি বিরল চারিত্রিক মাধুর্য দিয়ে বর্বর আরব জাতির আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ফলে সবাই তাঁকে ‘আল-আমীন’ বা বিশ্বস্ত ও আমানতদার উপাধিতে ভ‚ষিত করেছিল। দুনিয়ার মানুষকে তিনি অর্থ বা প্রভাব-প্রতিপত্তির দ্বারা বশীভ‚ত করেননি। বরং স্বভাবজাত উত্তম ব্যবহার দিয়ে বশীভ‚ত করেছিলেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরিত্রের প্রশংসায় ও তাঁর অসাধারণ চারিত্রিক মাধুর্য ও অনুপম ব্যক্তিত্বের স্বীকৃতি দিয়ে আল্লাহ ্ তাআলা এরশাদ করেন, ‘এবং নিশ্চয় আপনি সুমহান চরিত্রের উপর অধিষ্ঠিত’। (সূরা কালাম :৪) আল্লাহ ্ তাআলা আরও এরশাদ করেন,‘যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মাঝে অনুকরণীয় উত্তম আদর্শ রয়েছে।’ (সূরা আহযাব: ২১)।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, ‘তোমাদের মধ্যে যার স্বভাব-চরিত্র সর্বোত্তম সে আমার নিকট সর্বাধিক প্রিয়। আর ক্বিয়ামত দিবসেও সে আমার কাছাকাছি অবস্থান করবে।(তাহক্বীক্ব তিরমিযী হা/২০১৮, সনদ ছহীহ)।
সর্বোত্তম আদর্শের বাস্তবায়নকারী ও প্রশিক্ষক হিসেবেই তাঁকে বিশ্বমানবতার কল্যাণের জন্য পৃথিবীতে প্রেরণ করা হয়েছিল। এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, ‘আমি উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা দানের জন্য প্রেরিত হয়েছি। (তাহক্বীক্ব মিশকাত হা/৫০৯৭, সনদ হাসান, বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৪৮৭০, ৯/১৭২)।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তাকওয়া ও আল্লাহর ভীতি: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বাপেক্ষা তাকওয়া অবলম্বনকারী ছিলেন। গোপনে ও প্রকাশ্যে আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন : ‘আল্লাহ সম্পর্কে আমি তোমাদের চেয়ে বেশি অবগত এবং আল্লাহকে আমি তোমাদের চেয়ে বেশি ভয় করি।’ (বুখারী-২০)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দানশীলতা: নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দানশীলতা, উদারতা ও বদান্যতায় ছিলেন সর্বোচ্চ উদাহরণ। হযরত জাবের বিন আব্দুল্লাহ রাদ্বিয়াল্লাহু তাআলা আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট কিছু চাওয়া হলে তিনি কখনও ‘না’ বলতেন না।’ (মুসলিম-৬১৫৮)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ক্ষমা প্রদর্শন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিশোধ নেয়ার সামর্থ্য থাকা সত্তে¡ও ক্ষমা ও মার্জনা করার মহৎ গুণের অধিকারী ছিলেন। মক্কা বিজয়ের পর কোরাইশদেরকে তিনি বললেন: হে কোরাইশগণ! তোমাদের সাথে এখন আমার আচরণ কীরূপ হওয়া উচিৎ? তারা বলল: আপনি উদারমনস্ক ভাই ও উদারমনস্ক ভাইয়ের ছেলে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: ‘যাও, তোমরা মুক্ত।’ (ইবন হিশাম: সীরত ২/৪১২)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ধৈর্যধারণ : আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে জীবনের সর্বক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ করা ও আত্মঃসংবরণশীল হওয়া এক মহৎ গুণ। আল্লাহ তাআলা তার প্রিয় হাবীবকে উদ্দেশ্য করে বলেন,’(হে হাবীব!) অতএব, আপনি ধৈর্যধারণ করুন, যেমন ধৈর্যধারণ করেছেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাসূলগণ। (সুরা আহকাফ:৩৫)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ন্যায়পরায়ণতা : ন্যায়পরায়ণতা ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরিত্রের অত্যাবশ্যকীয় বিশেষ গুণ। মাখযুমিয়্যাহ গোত্রের জনৈক মহিলা যখন চুরি করল, সে অভিজাত পরিবারের সদস্য হওয়ায় কিছু লোক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে তার ব্যাপারে সুপারিশ করলেন। জওয়াবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তুমি কি আল্লাহ কর্তৃক অবধারিত দÐবিধি মওকুফের ব্যাপারে সুপারিশ করছ? আল্লাহর কসম! মুহাম্মদের মেয়ে ফাতেমাও যদি চুরি করে, অবশ্যই আমি তার হাত কেটে দেব। (বুখারী-৩৩১৬)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের লজ্জাশীলতা : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন লাজুকতায় সর্বোত্তমরূপে গুণান্বিত । বিশিষ্ট সাহাবি আবু সাঈদ খুদরী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্দাশীল কুমারী মেয়ের চেয়েও অধিক লাজুক ছিলেন। তিনি যখন কোন কাজ অপছন্দ করতেন তাঁর চেহারা মুবারকে আমরা তা চিনতে পারতাম। (বুখারী-৫৬৩৭)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সহচরদের সাথে উত্তম আচরণ : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহচরদের সাথে উত্তম ও সুন্দরভাবে মেলামেশা করতেন। আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন সর্বাপেক্ষা প্রশস্ত হৃদয়ের অধিকারী, সর্বাপেক্ষা সত্যভাষী, সর্বাপেক্ষা সম্মানজনক লেনদেনকারী। (তিরমিযী-৩৬৯৩৮)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিনয় : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন বিনয় ও নম্রতার সর্বোচ্চ উদাহরণ। তিনি নিজ হাতে জুতা মেরামত করতেন, কাপড় সেলাই করতেন, দুধ দোহন করতেন। সেবকদের কাজে সহায়তা করতেন। নিজ হাতে রুটি তৈরি করে পরিবার-পরিজনকে নিয়ে খেতেন। একদা এক লোক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসল। কিন্তু সে তাঁর ভয়ে শিহরিত হল। তিনি তাকে বললেন, তুমি নিজকে স্বাভাবিক করে নাও। কেননা আমি রাজা-বাদশা নই। নিশ্চয় আমি কোরাইশের এমন এক মহিলার সন্তান, যিনি শুকনো গোশতও খেতেন। (ইবনু মাজা-৩৩১২)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দয়া : দয়া আল্লাহ তাআলা প্রদত্ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এক বিশেষ গুণ। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন, আমি আপনাকে বিশ্বজগতের প্রতি রহমতরূপে প্রেরণ করেছি। (সূরা আম্বিয়া ১০৭)
তাছাড়াও তিনি ছিলেন নির্লোভ, নিরহংকার, পরোপকারী, সহজ-সরল অনাড়ম্বর জীবনে অভ্যস্ত, মন্দের বিনিময়ে উত্তম আচরণকারী। মানুষকে তিনি নম্র ও সুন্দর ব্যবহার, অযথা ক্রোধ প্রকাশ না করা, কাউকে তুচ্ছজ্ঞান ও হেয়প্রতিপন্ন না করার নির্দেশ দিতেন। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-দল-মত নির্বিশেষে সব মানুষের সাথে সদাচরণ করে পৃথিবীর বুকে শ্রেষ্ঠতর স্বভাব-চরিত্রের অতুলনীয় আদর্শ স্থাপন করেছেন। অন্য ধর্মের লোকেরাও তাঁর কাছে সুন্দর ও কোমল আচরণ লাভ করত। তাঁর নমনীয়তা ও কোমলতার কারণে সবাই তাঁকে প্রাণাধিক ভালোবাসতো। সব সময় হাসিমুখে কথা বলতেন, সদালাপ করতেন, ক্ষমাকে প্রাধান্য দিতেন। তাঁর মধুর বচনে সবাই অভিভ‚ত হত। তাঁর অভিভাষণ শুনে সাধারণ মানুষ অশ্রু সংবরণ করতে পারত না। তাই তিনি হলেন, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ একজন আদর্শ মহামানব।
আমরা যদি আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অনুপম গুণাবলী অনুশীলন করে চলি তাহলে আমরা ইহকালীন কল্যাণ ও পরলৌকিক মুক্তি লাভ করব-ইনশাল্লাহ।

লেখক: বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, সাদার্ন
বিশ্ববিদ্যালয়, খতীব, মুসাফিরখানা জামে মসজিদ