সুবীর নন্দী

16

 

সুবীর নন্দীর ডাক নাম বাচ্চু। সুবীর নন্দী হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং থানায় নন্দী পাড়া নামক মহল্লায় এক কায়স্থ সম্ভ্রান্ত সংগীত পরিবারে ১৯ নভেম্বর ১৯৫৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মামার বাড়ি শ্রীমঙ্গল উপজেলার বাদেআলিশা গ্রামে। তাঁর পিতা সুধাংশু নন্দী ছিলেন একজন চিকিৎসক ও সংগীতপ্রেমী। তাঁর মা পুতুল রানীও গান গাইতেন কিন্তু রেডিও বা পেশদারিত্বে আসেন নি। ছোটবেলা থেকেই তিনি ভাই-বোনদের সঙ্গে শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম নিতে শুরু করেন ওস্তাদ বাবর আলী খানের কাছে। তবে সংগীতে তাঁর হাতেখড়ি মায়ের কাছেই। বাবার চাকরি সূত্রে তাঁর শৈশবকাল চা বাগানেই কেটেছে। পাঁচ-ছয় বছর বয়স পর্যন্ত বাগানেই ছিলেন। চা বাগানে খ্রিস্টান মিশনারিদের একটি বিদ্যালয় ছিল, সেখানেই পড়াশোনা করেন। তবে পড়াশোনার অধিকাংশ সময়ই তাঁর কেটেছে হবিগঞ্জ শহরে। হবিগঞ্জ শহরে তাদের একটি বাড়ি ছিল, সেখানে ছিলেন। পড়েছেন হবিগঞ্জ হাইস্কুলে। তারপর হবিগঞ্জ বৃন্দাবন কলেজে। মুক্তিযুদ্ধের সময় সুবীর নন্দী দ্বিতীয় বর্ষে পড়তেন।
১৯৬৩ সালে তৃতীয় শ্রেণী থেকেই তিনি গান করতেন। এরপর ১৯৬৭ সালে তিনি সিলেট বেতারে গান করেন। তাঁর গানের ওস্তাদ ছিলেন গুরু বাবর আলী খান। লোকগানে ছিলেন বিদিত লাল দাস। সুবীর নন্দী গানের জগতে আসেন ১৯৭০ সালে ঢাকা রেডিওতে প্রথম রেকর্ডিং এর মধ্য দিয়ে। প্রথম গান ‘যদি কেউ ধূপ জ্বেলে দেয়’- এর গীত রচনা করেন মোহাম্মদ মুজাক্কের এবং সুরারোপ করেন ওস্তাদ মীর কাসেম। ৪০ বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে গেয়েছেন আড়াই হাজারেরও বেশি গান। বেতার থেকে টেলিভিশন, তারপর চলচ্চিত্রে গেয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গান। চলচ্চিত্রে প্রথম গান করেন ১৯৭৬ সালে আব্দুস সামাদ পরিচালিত সূর্যগ্রহণ চলচ্চিত্রে। ১৯৭৮ সালে আজিজুর রহমান পরিচালিত অশিক্ষিত চলচ্চিত্রে রাজ্জাকের ঠোঁটে তাঁর গাওয়া ‘মাস্টার সাব আমি নাম দস্তখত শিখতে চাই’ গানটি জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ১৯৮১ সালে তাঁর একক অ্যালবাম সুবীর নন্দীর গান ডিসকো রেকর্ডিংয়ের ব্যানারে বাজারে আসে। এছাড়া তাঁর প্রেম বলে কিছু নেই, ভালোবাসা কখনো মরে না, সুরের ভুবনে, গানের সুরে আমায় পাবে (২০১৫) প্রকাশিত হয় এবং প্রণামাঞ্জলী নামে একটি ভক্তিমূলক গানের অ্যালবামও প্রকাশিত হয়। তিনি গানের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ব্যাংকে চাকরি করেছেন। জনতা ব্যাংকে চাকুরী করার মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। চল্লিশ বছর ব্যাংকিং সেবা দিয়ে ২০১৩ সালে জনতা ব্যাংক থেকে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। সুবীর নন্দী দীর্ঘদিন ফুসফুস, কিডনি ও হৃদরোগে ভুগছিলেন। ১৪ এপ্রিল তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। ৩০ এপ্রিল তাঁকে সিঙ্গাপুর নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে ৫ ও ৬ মে পরপর দুইদিন হার্ট অ্যাটাকের পর তিনি ২০১৯ সালের ৭ মে ৬৫ বছর বয়সে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
তিনি অসংখ্য চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। তার মধ্যে রয়েছে: সূর্যগ্রহণ (১৯৭৬), অশিক্ষিত (১৯৭৮), দিন যায় কথা থাকে (১৯৭৯), মহানায়ক (১৯৮৪), চন্দ্রনাথ (১৯৮৪), শুভরাত্রি (১৯৮৫), শুভদা (১৯৮৬), পরিণীতা (১৯৮৬), রাজলক্ষী শ্রীকান্ত (১৯৮৭), রাঙা ভাবী (১৯৮৯), পদ্মা মেঘনা যমুনা (১৯৯১), স্নেহ (১৯৯৪), বিক্ষোভ (১৯৯৪), মায়ের অধিকার (১৯৯৬), আনন্দ অশ্রু (১৯৯৭), শ্রাবণ মেঘের দিন (১৯৯৯), চন্দ্রকথা (২০০৩), মেঘের পরে মেঘ (২০০৪), শ্যামল ছায়া (২০০৪), হাজার বছর ধরে (২০০৫), শত্রু শত্রু খেলা (২০০৭), চন্দ্রগ্রহণ (২০১৮), আকাশ ছোঁয়া ভালোবাসা (২০০৮), অবুঝ বউ (২০১০), দুই পুরুষ (২০১১), মাটির পিঞ্জিরা (২০১৩)
পুরস্কার ও সম্মাননা- ন্যাশনাল ব্যাংকার্স এওয়্যার্ড-২০১৮ (ABOB কর্তৃক ব্যাংকার হিসেবে সঙ্গীতে বিশেষ অবদান রাখার জন্য), শিল্পকলায় একুশে পদক (২০১৯)। চলচ্চিত্রের সংগীতে তাঁর অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদান করেন। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার- ১৯৮৪: শ্রেষ্ঠ পুরুষ কণ্ঠশিল্পী – মহানায়ক, ১৯৮৬: শ্রেষ্ঠ পুরুষ কণ্ঠশিল্পী – শুভদা, ১৯৯৯: শ্রেষ্ঠ পুরুষ কণ্ঠশিল্পী – শ্রাবণ মেঘের দিন, ২০০৪: শ্রেষ্ঠ পুরুষ কণ্ঠশিল্পী- মেঘের পরে মেঘ, ২০১৫: শ্রেষ্ঠ পুরুষ কণ্ঠশিল্পী – মহুয়া সুন্দরী। বাচসাস পুরস্কার- ১৯৭৭: সেরা পুরুষ কণ্ঠশিল্পী, ১৯৮৫: সেরা পুরুষ কণ্ঠশিল্পী – শুভরাত্রি, ১৯৮৬: সেরা পুরুষ কণ্ঠশিল্পী – শুভদা। সূত্র: বাংলাপিডিয়া