সুচেতনায় শুভচেতনার আভাস

12

মোহাম্মদ আবদুস সালাম

জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪) আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রাণপুরুষ। তিরিশের পঞ্চরতেœর তিনি অনন্য প্রতিভাবান কবিদের একজন। তাঁর কবিপ্রতিভা অলোকসামান্য এবং অভিনব। তিনি প্রকৃতিকে ভালোবেসে নির্জনতার ভেতর শান্তি অন্বেষণ করেছেন। প্রকৃতির নির্জনতার মাঝে নিজেকে বারবার সমর্পণ করতে চেয়েছেন। ইতিহাসের একজন হয়ে পৃথিবীর অশুভ শক্তি দেখে মর্মাহত হয়েছেন। প্রবলভাবে রক্তাক্ত, শিহরিত হয়ে গাঢ় রোমান্টিকতায় ডুব দিয়েছেন একজন অভিজ্ঞ দার্শনিকের মতো। বোধহীন, চেতনাহীন, বিবেকহীন যান্ত্রিক মানুষ কবির ভালো লাগে না। জীবনের আলো তিনি দেখতে চেয়েছেন নির্জন অন্ধকারময় পরিবেশের আড়ালে থেকে, নিঃসঙ্গ বেদনাকে সঙ্গী করে। আর মানুষের বেদনাকে নিজের বুকে ধারণ করেছেন আন্তরিকতার সাথে। এভাবে সব ঘটনার সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন তাঁর অনন্য অসাধারণ একটি কবিতায়। যার নাম দিয়েছেন ‘সুচেতনা’।
এই কবিতাটি আপাতদৃষ্টিতে প্রেমের কবিতা বলে মনে হলেও এতে রয়েছে ইতিহাস, শুভচেতনার ভাব ও গভীর জীবনবোধ। কবিতাটি “বনলতা সেন” কাব্যের অন্তর্ভুক্ত। তেত্রিশটি পঙক্তির সমন্বয়ে কবিতাটি পূর্ণতা পেয়েছে। চারটি স্তবকে কবিতাটি বিভক্ত। এই কবিতার মধ্যে তিনি চার স্তবকে চার রকমের ধারণা ব্যক্ত করেছেন। জীবনানন্দ দাশ গভীর ভাবের কবি। তাঁর কবিতা যেন রহস্যে ভরা এক দুর্বোধ্য জগৎ। কাল ও পরিবেশভেদে কবিতার বিষয় হয়ে ওঠে সময়োপযোগী। তিনি প্রেমের ভেতর ইতিহাস ও বিশ্বজগত সম্পর্কে নতুন ধারণা দেয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর কবিতা পড়ে আনন্দ পাওয়া যায় বটে, তবে কবিতার ভেতরে থাকা ভাবটা বুঝতে গিয়ে বেশ হিমশিম খেতে হয়। উপমা, উৎপ্রেক্ষা, অনুপ্রাস ও যমক মিলে পাঠককে নতুন এক জগতে নিয়ে যায়। তারপরও জীবনানন্দ দাশের কবিতা মানে ইন্দ্রিয় নির্ভর সুখস্মৃতি।
‘সুচেতনা’ কবিতার প্রথম স্তবকের আট পঙক্তিতে সুচেতনাকে দূরতম দ্বীপের সাথে তুলনা করে কবি বলেছেন, নির্জনতার ভেতর একধরনের আনন্দ আছে। কবি ভাবেন – চুপচাপ বসে থেকে ইতিহাসকে আশ্রয় করে ‘রণরক্ত’ থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানো সম্ভব। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে কলকাতাকে একদিন তিলোত্তমা নগরীতে পরিণত করতে কবি বদ্ধপরিকর। স্বপ্নের বীজ বুননে সদা প্রস্তুত। কবি মনে করেন, শুভ চেতনাকে ধারণ করে যে কোন মানুষ তার স্বপ্নের ঠিকানায় পৌঁছাতে পারবেন। তবে শুভ চেতনা সবখানে বিরাজমান নয়। অশুভ তৎপরতা বন্ধ করে শুভ ভাবনার উদ্ভব ঘটাতে হলে সকল মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি মনে করেন – সভ্যতা বিকশিত হবে, মানুষ মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, রক্তপাত হবে, প্রাণহানিও ঘটবে। তবে এই ধ্বংসাত্মক দিকটি শেষ দৃশ্য নয়। তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন, পৃথিবীতে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা, সন্দেহ নেই কিছু ঘটনা তাঁকে মর্মাহত করেছে। পাশবিক অবস্থার মধ্য দিয়ে কোন মানুষ সুস্থ ও সুন্দর ভাবে বেঁচে থাকতে পারে না। যে হিংস্রতা তিনি দেখেছেন, তা অস্বীকার করার কোন উপায়ও নেই। পৃথিবীর বীভৎস ওই রূপ দেখে ওই সময়ে কবি ক্রমেই নৈরাশ্যবাদী হলেও পুণরায় আশাবাদী হয়ে ওঠেন। মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারাতে চান না। মানুষ আবার ঘুরে দাঁড়াবে নতুন প্রেরণায়, নতুন উদ্দীপনায়। কবি মনে করেন, প্রত্যাশা পূরণে মানুষই শেষ ভরসা। উত্থান পতনে, ভাঙা-গড়ায় মানুষ শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে যেকোনো পরিস্থিতিতে। এই অমোঘ সত্য কবিকে উজ্জীবিত করে। ‘সুচেতনা’ কবিতায় আমরা তার বর্ণনা দেখতে পাই এভাবে-
‘এই পৃথিবীর রণরক্ত সফলতা
সত্য; তবু শেষ সত্য নয়।
কলকাতা একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে;
তবুও তোমার কাছে আমার হৃদয়।’
অসুস্থ, জরাগ্রস্ত মানুষকে সারিয়ে তোলার জন্য মানুষ আবার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। ভয়ানক অস্থিরতার সময় সংঘাত, মৃত্যু, অস্তিরতা ও বিষণ্ণতা সবকিছুর মধ্যে মানুষের উপস্থিতি দেখে কবি মাঝে মধ্যে একেবারে চুপ হয়ে যান। তখন মানুষের মন সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো ধারণা পাওয়া যায় না। যুদ্ধ ও মন্বন্তরের ছোবল তাঁকে আরো সংবেদনশীল ও বেদনাহত করে তুলে। সেই সময় কবি দেখেছেন – প্রকৃতির সৌন্দর্যে লেগেছিল গ্রহণের ছায়া। তাই প্রতিক্রিয়ায় তিনি মন ও মননে লালন করেছেন মুক্তির তীব্র আকাক্সক্ষা। তিনি আশা করেন, পৃথিবীব্যাপী যে গভীর অসুখ কিংবা বিপর্যয় শুরু হয়েছে তা থেকে মুক্তি আমাদের পেতেই হবে। শুভ চেতনার আলো জ্বালিয়ে তিনি মানুষের মুক্তি কামনা করেছেন। যুদ্ধ বিগ্রহ উন্নত বিশ্ব তৈরিতে বড় বাঁধা, সংঘাত বাঁধিয়ে উন্নত বিশ্ব কেবল নিঃস্ব করছে অনুন্নত বিশ্বের মানুষকে। এই সংকট তৈরির জন্য কবি মানুষকে দায়ী করেছেন। আবার এই সংকট উত্তরণ কেবল মানুষের চেষ্টা দ্বারা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। সুচেতনা কবিতার দ্বিতীয় স্তবকে এই দৃশ্যকে তিনি পরম মমতায় তুলে ধরেছেন। কবি বলেন-
দেখেছি আমারি হাতে হয়তো নিহত
ভাইবোন বন্ধু পরিজন পড়ে আছে ;
পৃথিবীর গভীর গভীরতম অসুখ এখন;
মানুষ তবুও ঋণী পৃথিবীরই কাছে।
লোকজ পৃথিবীর প্রতি কবির সুগভীর ভালোবাসা তাঁকে উন্মনা করে তুলেছেন। পারিপার্শ্বিক অসংখ্য বেদনার ছবি দেখে যন্ত্রণায় তিনি বিষণ্ণ কাতর হয়েছেন। তবে তিনি সময়ের গন্ডিতে বাঁধা পড়তে চাননি। বুদ্ধদেব বসু কবির এই জগৎকে প্রত্যক্ষ করে সঠিক কথাটাই বলেছেন – আমাদের আধুনিক কবিদের মধ্যে ‘জীবনানন্দ দাশ সবচেয়ে নির্জন,সবচেয়ে স্বতন্ত্র।’
তৃতীয় স্তবকে কবি ইতিহাসকে আরেকবার অবলোকন করেছেন। এখানে তিনি চৈনিক দার্শনিক কনফুশিয়াসকে স্মরণে রেখেছেন। কারণ দার্শনিকের দৃষ্টি গভীর অনুসন্ধানী। চারিদিকের পরিবেশ সর্ম্পকে তাঁরা কৌতূহলী, নীরবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বেশ তৎপর। ইন্দ্রিয় দিয়ে বিশ্বপ্রকৃতির অবস্থান অবলোকন করার কারণে তাঁদের চিত্ত চঞ্চল হয়ে ওঠে। তাই কবি তখন একজন দার্শনিকের আসনে বসে পরাবাস্তবতার গভীরে প্রবেশ করে চেতনালোকে বিহার করার চেষ্টা করেন। কবি এখানে প্রকৃতির পলাতক সৌন্দর্যের মৌন উপাসক হয়ে নির্জনতার স্বতন্ত্র এক জগতে অবগাহন করে পরিশুদ্ধ হতে চান।
আমাদের জীবন কখনো কখনো প্রতিবেশ দ্বারা প্রভাবিত।
চারিদিক হতে উৎসারিত বিস্ময় আমাদের চেতনাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। দুঃখিত, বেদনাহত মনকে তখন আপন অস্তিত্বের সাথে প্রতিনিয়ত মোকাবেলা করতে হয়। তাই এইসব কিছু থেকে কবি দূরে থাকতে চান। নিজেকে অর্পণ করতে চান সুচেতনার কাছে – যেখানে রয়েছে তাঁর আরাধ্য নির্জনতা।
কবি তাই বলে ওঠেন –
আমাদের পিতা বুদ্ধ কনফুশিয়াসের মতো আমাদের প্রাণ
মূক করে রাখে; তবু চারিদিকে রক্তক্লান্ত কাজের আহব্বান।
শেষ ও চতুর্থ স্তবকে কবি আশাবাদী ছিলেন তীব্রভাবে। বেদনার ঝিনুকে লুকিয়ে রেখেছিলেন আশার মুক্তো। তাঁর জীবনের অনুভূত প্রেম, হতাশা, স্মৃতি, প্রেরণা, জীবন-মৃত্যু প্রভৃতি বিষয়কে প্রকৃতির আলোর বিচিত্র বর্ণের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি দেখেছেন, একমাত্র আলোই পারে মুক্তির পথ দেখাতে। প্রকৃতির বহুবর্ণ, বিচিত্র রূপ মানব মনে যে অনুভূতির সঞ্চার করে তা তুলনারহিত। যা জীবনানন্দের প্রায় কবিতায় চিত্রিত হয়েছে। যুগযন্ত্রণা সেরকম অনুভূতির আরেকটি নাম। মাঝে মাঝে এক ধরনের অমানিশা পৃথিবীকে গ্রাস করে ফেলে। আবার শাশ্বত সূর্যোদয়ের সাথে সাথে সেই অমানিশা কেটেও যায়। শুভ চেতনার দ্বারা মানুষ আলোকোজ্জ্বল পৃথিবী গড়তে পারেন। দার্শনিকরা বলেন- শত কোটি বছর আগে পৃথিবী যেখান থেকে শুরু হয়েছিল, আবার ক্রমে আলো জ্বেলে মনীষীদের হাত ধরে সেখানে পৌঁছে যাবে। শত বাঁধা থাকবে, নিষেধও থাকবে, তবু এগিয়ে চলাই মানুষের ধর্ম। কবি দার্শনিক চিত্তে ভাবেন ‘যেখানে নিষেধের কাঁটাতার সেখানেইতো টপকানোর বাসনা তীব্র। নিষেধের বেড়া অতিক্রম করে মানুষকে অবগাহন করতে হবে সেই নতুন সমুদ্রে।’ তবেই অনন্ত সূর্যোদয় ঘটবে পুরো পৃথিবীতে। কবি আনন্দ চিত্তে, পুলক অনুভব করে ‘সুচেতনা’ কবিতার শেষ দুটি পঙক্তিতে সেকথাই বলতে চেয়েছেন –
দেখেছি যা হ‘লো হবে মানুষের যা হবার নয়-
শাশ্বত রাত্রির বুকে সকলি অনন্ত সূর্যোদয়।
জীবনানন্দ দাশ কবিতায় রূপকের মাধ্যমে নতুন একটি জগৎ তৈরি করেছেন। নির্জনতার চিত্র এঁকে তিনি পরাবাস্তবে মগ্ন থাকলেও আমাদের সামনে নিয়ে এসেছেন বিমূঢ় রহস্যময় আরেক বাস্তবতা। এই প্রসঙ্গে জার্মান কবি রিলকে’র একটি উপদেশের কথা মনে পড়ে গেল। তিনি তরুণ কবিকে একবার উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিলেন – ‘শিল্পী তাঁর নিজের একটি ভূখন্ড নির্মাণ করবেন এবং একটি আয়না ও প্রকৃতির মধ্যে সকল বিস্ময়ের সন্ধান করবেন। তুমি তোমার নির্জনতাকে ভালোবাসবে এবং নির্জনতার কারণে যে বেদনা, সে বেদনাকে সহ্য করবে। এই গভীর নির্জনতাকে ভালোবেসে, সহ্য করে যে রূপকল্প নির্মিত হবে তাই চূড়ান্ত নির্জনতা।’ মনে হয়েছে – কবি জীবনানন্দ দাশের ক্ষেত্রে এই উপদেশ যথার্থ।
কবি হতাশ নন, পৃথিবীর গভীর অসুখ দেখে তিনি কেবল কিছুটা বিচলিত। রক্তপাতের পরও শুভচেতনা দিয়ে, প্রেমের অমিত স্পর্শে হৃদয়কে যদি আলোকিত করা যায়, তবে নির্জন শ্যামল দ্বীপে একদিন অনন্ত সূর্যোদয় হবেই। ‘সুচেতনা’ নামক কবিতায় কবি ঐতিহাসিক চিন্তার গভীর ভাবাবেগকে নিপুণ ভাষাশৈলিতে ইতিহাসের উপাদানকে যেমন তুলে ধরেছেন, তেমনি নির্জনতার ভেতরে মানুষের অনুভূতিকে নিজের অভিজ্ঞতায় বর্ণনা করেছেন বিশেষ নৈপুণ্যে। তাঁর কবিতা পাঠে আমরা অপার আনন্দ লাভ করি, থরোথরো ভালোবাসায় ও পরিশীলিত বেদনায় মন ভরে যায়। উচ্চকিত হয়ে ওঠে অন্তরাত্মা। ফলে ‘সুচেতনা’য় কবিতার সমঝদার পাঠক কবিমনের গভীর অনুরাগটি সহজেই ধরতে পেরেছেন বলে আমাদের বিশ্বাস।
পরিশেষে বলা যায়, ‘সুচেতনা’য় কবি কবিতার জানালায় দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে দেখেন- কীভাবে মানুষ পৃথিবীতে বেঁচে থাকার জন্য প্রাণান্ত লড়াই করছেন। সমকালের অন্তর্লীন টানাপোড়েনে বিশ্ব বিবেক কীভাবে অনুভূতির প্রগাঢ়তায় বিশ্লেষিত হয়েছে। কবিতাটি বহুমাত্রিকতায় সমৃদ্ধ, মানবিকতায় সমুজ্জ্বল। বিষয়ের দিক থেকেও কবিতাটি এক অনিঃশেষ তাৎপর্য বহন করে। ইঙ্গিতময় শব্দের ব্যবহার ও প্রতীকী ব্যঞ্জনায় এই কবিতা আধুনিক জীবনদৃষ্টির অসাধারণ সংযোজন বলে আমাদের মনে হয়েছে।