সীমিত বিষয় ও সিলেবাসে এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষা সরকারের পরিকল্পনায় আশাবাদ

3

 

মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি চলছে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। গত ১৬ মাসে মোট তিন দফায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু নানা ভ্যারিয়েন্টে রূপ নেয়া করোনার সংক্রমণ অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আপাতত খোলার কোন সুযোগ নেই-সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য থেকে তা ধারণা করা যায়। প্রধানমন্ত্রী সাফ জানিয়েছেন, করোনা ভাইরাস সহনীয় পর্যায়ে না আসা পর্যন্ত আর শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের টিকাদান শেষ না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা যাবেনা। প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য যথার্থ ছিল। কারণ কোমলমতি শিক্ষার্থীদের একটি মরণব্যাধি ভাইরাসের কাছে আমরা সোপর্দ করতে পারি না। সহজে সংক্রমণযোগ্য ক্ষমতাধর এ ভাইরাস সামাজিক দূরত্ব ও মাস্কই যেখানে একমাত্র প্রতিরোধ নির্ভর সেখানে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এধরনের কঠোর স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা করে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করার সুযোগ ও পরিবেশ নেই। সুতরাং ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব হ্রাস ও শিক্ষার্থীদের টিকার আওতায় না আনা পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছুটি বাতিল করা উচিৎ নয়। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, মহামারির কবল থেকে রক্ষা করতে গিয়ে দেশের সামগ্রিক শিক্ষা কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে। বিশেষ করে সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে ২০২১ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে। ইতোমধ্যে সরকার চেয়েছিল ন্যূনতম সিলেবাসের ওপর শ্রেণিকাজ শেষেই পরীক্ষা নিতে। এ লক্ষ্যে পরীক্ষা নেওয়ার সার্বিক প্রস্তুতি শেষ করে রেখেছে সরকার। এসএসসির প্রস্তুতি শেষ হয়েছে, এইচএসসির ক্ষেত্রে প্রশ্ন তৈরির কাজ চলছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কবে পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হবে, কত নম্বরে নেয়া হবে এবং মূল্যায়ন পদ্ধতি কী রকম হবে-এসব প্রশ্ন ছিল শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সকল মহলের। অবশেষে সরকারের পক্ষ থেকে দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা দুটির সম্ভাব্য সময় বিকল্প মূল্যায়ন পদ্ধতি ঘোষণা করেছেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি। তাঁর এ ঘোষণায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের মধ্যে স্বস্তি এসছে, আশার সঞ্চার ঘটেছে। তবে কিছু সংবাদপত্রে প্রকাশিত অভিভাবকদের প্রতিক্রিয়া থেকে জানা যায়, মূল্যায়নের বিকল্প পরিকল্পনা বা সিদ্ধান্তগুলো আরো স্পষ্ট হওয়া জরুরি। এছাড়া বাংলা, ইংরেজির মত আবশ্যিক বিষয়ে পরীক্ষা নেয়া য়ায় কিনা, ভেবে দেখার কথা বলেছেন শিক্ষাবিদরা। শিক্ষামন্ত্রীর ভাষায় পরিস্থিতির উন্নতি হলে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে আগামী নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে এসএসসি ও সমমান এবং ডিসেম্বরে প্রথম সপ্তাহে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা নেওয়া হবে। ১০টি নির্দেশনাসহ এই দুটি পরীক্ষা বিষয়ে বিকল্প পরিকল্পনার কথা বলেছেন। পরিকল্পনা ও বিকল্প সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে রয়েছে, ঈদুল আযহার পর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ফরম ছাড়ার পাশাপাশি পূরণের কার্যক্রম শুরু হবে। এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ১২ সপ্তাহে ২৪টি এসাইনমেন্ট দেওয়া হবে। তারা প্রতি সপ্তাহে দুটি করে এসাইনমেন্ট জমা দেবেন। এইচএসসির পরীক্ষার্থীদের জন্য ৩০টি এসাইনমেন্ট দেওয়া হবে। প্রতিটি পত্রে পাঁচটি করে এসাইনমেন্ট করবেন। সপ্তাহে এসব শিক্ষার্থী দুটি এসাইনমেন্ট করবেন। ফলে আগে যে সংক্ষিপ্ত সিলেবাস দেওয়া হয়েছিল এর মাধ্যমে অ্যাসাইনমেন্ট কার্যক্রম শেষ করা হবে। আগামীকাল ১৮ জুলাই থেকে অ্যাসাইনমেন্ট কার্যক্রম শুরু হবে। বলারবকাম রাখেনা যে, এসএসসি ও এইচএএসসির মত দুটি পাবলিক পরীক্ষা দেশের উচ্চ শিক্ষার সোপন। এগুলো সম্পন্ন হলেই উপরের দিকের শিক্ষা কার্যক্রম অগ্রসর হয়। গেল বছরের ওই দুটি পরীক্ষার পরীক্ষার্থীরা পাশ করলেও তারা উচ্চশিক্ষা তথা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গিয়েও স্থির হয়ে আছে মহামারি করোনার কারণে। কবে তারা স্বাভাবিক নিয়মে ক্লাস করতে পারবে, তাও অনিশ্চিত! বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশগুলোতেও করোনা আঘাত হানলেও সেখানে নানা বিকল্প ব্যবস্থায় প্রায় পূর্ণমাত্রায় টিকিয়ে রাখা হয়েছে শিক্ষা কার্যক্রম। আমাদের দেশেও সরকার নানা বিকল্প ব্যবস্থায় বিশেষ করে অনলাইন ও টেলিভিশনের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত রাখার প্রয়াস চালিয়ে আসছে, কিন্তু রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোর কিছু অংশে এ কার্যক্রম কিছুটা সফল হলেও প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক সামর্থের অভাবে বিরাট সংখ্যক গ্রামীণ জনপদ শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে রয়ে গেছে। সবমিলিয়ে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ইতিহাসের এক নজিরবিহীন সংকটে পড়েছে। সম্প্রতি ইউনেস্কো-ইউনিসেফসহ নানা সংস্থা বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বের শিক্ষার বেহাল অবস্থা তুলে ধরেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশসহ ১৫টি দেশে ভাইরাসের উর্ধ্বগতি ও শিক্ষা ব্যবস্থার অর্ধগতির বিষয়ে তুলে ধরেছে। তারা স্থবির শিক্ষা কার্যক্রমে শিশু শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত ও শারীরিক-মানসিক নিয়ে নানা শঙ্কা প্রকাশ করেছে। আমরাও বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তিত। আমাদের আশাবাদ, এই সংশ্লিষ্টরা বিশ্বের নানা দেশের কার্যকর ব্যবস্থা দেখে শিক্ষা নিয়ে এবং মাঠ পর্যায়ে জরিপ চালিয়ে দ্রুত কোনো ব্যবস্থা নেবেন।