সীমান্তে গোলাবর্ষণ নিন্দনীয় মিয়ানমারের অতি বাড়াবাড়ি এখনই থামাতে হবে

9

দুই সপ্তাহের অধিক সময় ধরে বাংলাদেশর সীমান্ত এলাকায় মিয়ানমারের গোলাবর্ষণ চলছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কয়েকবার দেশটির রাষ্ট্রদূতকে ডেকে মৌখিক প্রতিবাদ ও সতর্কতা করা হয়েছে। কিন্তু কয়েকদিন বন্ধ থাকার পর আবারও গোলাবর্ষণ শুরু হয়েছে। আগে ছোট ছোট গোলা এসে পড়লেও গত কয়েকদিন থেমে থেমে ভারি গোলা বর্ষণ করা হচ্ছে বলে গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে। এসময় জিরো লাইনে গোলার আঘাতে একজন আশ্রিত রোহিঙ্গার মৃত্যু ও একজন বাংলাদেশিসহ চারজন আহত হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান জিরো লাইনে মিয়ানমারের গোলায় নিহত হওয়ার ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের তিনি জানিয়েছেন, ‘বাংলাদেশ মিয়ানমারের সাথে যুদ্ধ চায় না, আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমস্যার সমাধান করতে চায়। কিন্তু শান্তিপূর্ণ সমাধান না হলে বিষয়টি জাতিসংঘে উপস্থাপন করা হবে। বিষয়টি নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কাজ করছে জানিয়ে তিনি আশা করেন মিয়ানমার সংযত হবে। এখন যে গোলাগুলি, তাদের অভ্যন্তরীণ কনফ্লিক্ট (সংঘাত) সেটা তাদের ভেতরেই যেন থাকে। আমাদের এদিকে যেন না আসে। অপরদিকে সীমান্তে গোলাবর্ষণে হতাহতের ঘটনায় প্রতিবাদ জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। উল্লেখ্য যে, শুক্রবার রাতে বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নে তুমব্রু সীমান্তে মিয়ানমার থেকে আসা মর্টার শেলে একজন নিহত ও কয়েকজন আহত হন। ঘুমধুম সীমান্তে জিরো লাইনে রোহিঙ্গাদের একটি ক্যাম্পে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এর আগে গত ২৮ আগস্ট বান্দরবানের এই তুমব্রæ সীমান্তেই মিয়ানমার থেকে দু’টি অবিস্ফোরিত মর্টার শেল এসে পড়েছিল। এছাড়া গত ৩ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারের দুটি যুদ্ধবিমান এবং দুটি ফাইটিং হেলিকপ্টারের গোলা বাংলাদেশের সীমানার ভেতরে এসে পড়ে। সূত্র জানায়, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে এক মাসের বেশি সময় ধরে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘আরাকান আর্মির’ গোলাগুলি চলছে। বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় মিয়ানমারের কথা দিয়ে কথা না রাখার বিষয়ও উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমার কোনো সময় কথা দিয়ে কথা রাখে না। আমরা দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয়- সকল চেষ্টাই করে যাচ্ছি। আমাদের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। আমরা চাই, ১২ লাখ রোহিঙ্গা এখানে আশ্রয় নিয়েছে, শান্তিপূর্ণভাবে তারা যেন প্রত্যাবাসিত হয়, সে চেষ্টা আমরা করছি। ঘটনার পরপরেই বিজিবির পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কূটনৈতিক পর্যায়েও প্রতিবাদ জানানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেছেন, মিয়ানমারে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘর্ষ বেশ কয়েকদিন ধরেই চলছে। আমরা শুরু থেকেই সতর্ক আছি। মিয়ানমারের কোনো নাগরিক যেন বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারেন, সে বিষয়েও সর্বোচ্চ সতর্ক আছি। তাদের গোলা যেন আমাদের দেশে না আসে সে বিষয়ে তাদেরকে আগেও জানানো হয়েছে। নতুন করে আবারো জানানো হবে এবং ক‚টনৈতিকভাবেই এটি বন্ধ করার জন্য আলোচনা হচ্ছে।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়াটা বাংলাদেশের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে মানবিক কারণে আশ্রয় দেয়া এবং বারবার কথা দিয়েও মিয়ানমার সরকার কর্তৃক তাদের ফেরৎ না নেয়াই বড় সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ। তার মধ্যে সীমান্তে গুলি-মর্টার শেল নিক্ষেপে মারাত্মক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। গণমাধ্যমগুলো বলেছে, মর্টার শেলের গোলার বিকট শব্দে কাঁপছে এপারের সীমান্ত এলাকা। এতে এপারের ঘুমধুম ইউনিয়নের ২০ গ্রামের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এসএসসি পরীক্ষার্থীরা এক অনিশ্চয়তার মধ্যে পরীক্ষা প্রস্তুতি নিলেও সর্বশেষ ঘুনধুম এলাকা থেকে কেন্দ্র সরিয়ে নিরাপদ এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমরা মনে করি, মিয়ানমারের সাথে সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের মাধ্যমে এসব ঘটনা বন্ধ করতে হবে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরিণ সংকট নিয়ে বাংলাদেশ কোনদিন মাথা ঘামায়নি। প্রয়োজনও মনে করেনা। তবে তাদের আগ্রাসী মনোভাব বা সার্বভৌমের উপর আঘাত আসলে বাংলাদেশ বসে থাকবে মিয়ানমার এমনটি ভাবলে ভুল করবে। তাদের জানা আছে নিশ্চয় বাংলাদেশের স্বশস্ত্র যুদ্ধ করে মাত্র নয়মাসে দেশ স্বাধীন করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। আমরা আশঙ্কা করছি, মিয়ানমার একঢিলে দুই পাখি মারতে চায়। বিদ্রোহ দমনের নাম দিয়ে গোলা-শেল ছুড়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের দৃষ্টি অন্যদিকে ফিরাতে চায়। জনসমর্থনহীন মিয়ানমারের জান্তা সরকার নিজ দেশে যেখানে ধিকৃত সেখানে বিশ্বসম্প্রদায় তাদের এ ধরনের অন্যায়কে মেনে নেবে-এমনটি ভাবলে মনে করা হবে তারা বোকার স্বর্গে বাস করছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বসম্প্রদায় আশা করে মিয়ানমার সরকার তাদের বাড়াবাড়ি বন্ধ করে শিগগিরই রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে।