সীমান্তের ৩৩ কিলোমিটারজুড়ে স্থলমাইন বসালো মিয়ানমার

26

মাঈনুদ্দিন খালেদ, নাইক্ষ্যংছড়ি

তুমব্রু সীমান্তে প্রতিদিনই চলছে গোলাগুলি। এবার সীমান্তে গুনে গুনে ১শত মর্টারশেল নিক্ষেপ করা হয়েছে। এতে মর্টারশেলের আওয়াজে কেঁপে উঠলো তুমব্রু বাজারসহ আশপাশের এলাকা। বেসামাল হয়ে পড়ে বাজারের শতশত ব্যবসায়ী ও হাজার-হাজার সীমান্তবাসী।
বিষয়টি নিশ্চিত করে স্থানীয় ব্যবসায়ী বদিউল আলম বলেন, ‘গত ২ সপ্তাহ ধরে গোলাগুলির পর এই প্রথম মর্টারশেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটলো। যাতে করে নো-ম্যান্স ল্যান্ডের সাড়ে ৪ হাজার মানুষ স্ব-স্ব আশ্রয় শিবিরে নিরাপদে আশ্রয় নিয়েছে।’
ব্যবসায়ীরা জানান, বৃহস্পতিবার সকাল ৭টা থেকে ১১টা পর্যন্ত থেমে থেমে কয়েকটি আর্টিলারি মর্টার বিস্ফোরণের শব্দে কেপে ওঠে এলাকা, তার কিছু সময় বন্ধ থেকে আবারো কয়েকটি বড় বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান ওই তারা। নাইক্ষ্যংছড়ি-মিয়ানমার সীমান্তের ঘুমধুম হতে আষারতলী পর্যন্ত যতগুলো সীমানা পিলারের পয়েন্ট রয়েছে তার মধ্যে বেশি স্পর্শকাতর অবস্থায় রয়েছে তুমব্রুর ৩৪ ও ৩৫নং পিলার। এই দুই পিলারের মাঝখান দিয়েই সর্বোচ্চ বিস্ফোরণের আওয়াজ ভেসে আসে মিয়ানমারের কিছুটা অভ্যন্তর থেকে বাংলাদেশের সীমানায়।
কথা হয় ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য তুমব্রæ এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা মো. আলমের সঙ্গে। তিনি বলেন, এলাকার মানুষ এক কঠিন সময় অতিক্রম করছে। অনেকে রাতে ঘুমাতে পারছে না। আবার অনেকে রাতের বেলায় সীমান্ত জনপদের নিজ বাড়ি ছেড়ে দূরে স্বজনদের বাড়িতে রাত্রিযাপন করছেন।
ঘুমধুমের স্থানীয় এক মিডিয়াকর্মী জানান, বুধবারের চাইতে বৃহস্পতিবারের বিস্ফোরণ হয়েছে বেশি এবং বিস্ফোরিত শব্দ ছিল অনেক বড়।
এ বিষয়ে ঘুমধুম ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, তিনিও শুনেছেন সীমান্ত পয়েন্টে মিয়ানমারের ভিতর থেকে দেশের অভ্যন্তরে ভেসে আসা বিকট শব্দের কথা।
৩৩ কিলোমিটারজুড়ে স্থলমাইন বসালো মিয়ানমার : বাংলাদেশ নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের ৩৩ কিলোমিটারজুড়ে নতুন করে স্থলমাইন বসিয়েছে মিয়ানমার। সেদেশের সেনাবাহিনীর মাইন ডিফিউজ, আইডেনটিফিকেশন ও প্রিভেনশনের ট্রেনিংপ্রাপ্ত মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিটের সদস্যরা এ মাইন বসান আগস্টের প্রথম সপ্তাহ থেকে। তারা সীমান্তের তুমব্রুর উত্তরাংশের হেডম্যান পাড়া সংলগ্ন ৩৫ পিলার থেকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ৩৩ কিলোমিটার সীমান্তের জিরো পয়েন্টজুড়ে এসব মাইন বসান বলে নিশ্চিত করেন সীমান্তে বসবাসকারী একাধিক সূত্র।
তারা দাবি করেন, নতুন করে বসানো এ মাইনের আঘাতে ৩৫ পিলারের কাছাকাছি স্থানের একটি ছড়ায় গরু আনতে গিয়ে গত ১৬ সেপ্টেম্বর পা হারান তুমব্রু হেডম্যান পাড়ার যুবক অন্ন থোয়াই তঞ্চঙ্গা (২৮)। এর ২দিন আগে এ পয়েন্টে ১টি চোরাই গরুর পা উড়ে গিয়েছিল স্থলমাইনে। যেটির মাংস চোরাকারবারীরা তুমব্রæ বাজারে বিক্রি করে। আর আগে এ পয়েন্টে ক’বছর আগে এক পুলিশ সদস্যসহ ২ বাংলাদেশি মারা যায়। অনেকেই আহত হয়েছিল। এর ক’বছর আগে ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু ল্যান্ড মাইন্স বা আইসিবিএলএম-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে সীমান্তে উভয় দেশের ৬৪ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। এরা মূলত কাঠুরিয়া, বনজীবী বা চোরাকারবারী ছিলো। আর সে সময় আহত হয়েছিলো আরো ৮৭ জন। এখন নতুন করে স্থলমাইন বিষ্ফোরণের ফলে সীমান্তে নতুন করে মাইন আতংক ছড়িয়ে পড়ে।
নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নূরুল আবসার ইমন জানান, তিনি সীমান্তের জিরো লাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনী কর্তৃক স্থলমাইন বসানোর খবর পেয়ে তার এলাকার সীমান্ত পয়েন্টে বসবাসকারী অধিবাসীদের জিরো পয়েন্টে না যেতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। কেননা মিয়ারমারের জান্তা সরকারের সেনা ও বিজিপি দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে জিরো পয়েন্টে মাইন বসিয়ে আসছে।
বিজিবির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তারা সীমান্তে টহল জোরদার করেছে। পুরো সীমান্ত সিল কর দেয়া হয়েছে। কেননা মিয়ানমার তাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে একদিকে গোলাগুলি চালাচ্ছে অন্যদিকে স্থলমাইন বসিয়ে তাদের সীমানায় শত্রু দমনের চেষ্টা করছে।
এদিকে মিয়ানমার বাহিনীর গোলাগুলি ও মাইন বিষ্ফোরণের কারণে তুমব্রু পয়েন্টে আতঙ্কগ্রস্ত ৩শত পরিবারকে অন্যত্র সরাতে বাংলাদেশ সরকার চিন্তা-ভাবনা করছে। খসড়া তালিকাও প্রস্তত করছে বলে নিশ্চিত করেন নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার সালমা ফেরসৌস।