সিলেটে বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানোর মানবিক মানুষের গল্প

22

চৌধুরী মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম

সিলেটে ভয়াবহ বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানো কিছু সাধারণ মানুষ অসাধারণ হয়ে উঠার মানবিক গল্প সবার প্রশংসা কুড়িয়েছে। অসহায়দের পাশে দাঁড়িয়ে ব্যারিস্টার সুমন সহ অনেকে। কোটি টাকার তহবিল গঠন করে বন্যার্তদের জন্য খাদ্য ও ওষুধ নিয়ে ছুটে গেছেন। এছাড়া বন্যার্তদের পাশে দাঁড়িয়েছেন আধ্যাত্বিক মানবিক সংগঠন গাউসিয়া কমিটি বাংলাদেশ, বিশিষ্ট আলেম-ওলামা, সাংস্কৃতিক কর্মী, গায়ক, ইউটিউবার ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন। মহাদুর্যোগে অসহায়দের পাশে দাঁড়ানোর আকুলতা মানবিকতার এক অনন্য সরস চিত্র। সিলেটের এই মহাদুর্যোগে স্থানীয় কোন জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের দেখা যায়নি। তবে বন্যায় প্লাবিত এলাকায় জীবনের ঝুঁকি না থাকলে মুড়ি বিতরণের কথিত মানবতার ফেরিওয়ালাদের ফটোসেশানের হিড়িক পড়ে যেত। বন্যায় ব্যারিস্টার সুমনসহ অনেকে কয়েক কোটি টাকার ত্রাণ বিতরণ করে প্রমাণ করলেন
কাউকে সহযোগিতা করার জন্য পদ পদবি দরকার হয়না। প্রয়োজন সততা,আস্থা, ভালোবাসা ও সাধারণ মানুষের বিশ্বাস। পদ পদবি ও মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব না থেকেও একজন কিশোর কোটি টাকা সংগ্রহ করে বানবাসির মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন। এটি মোটেও কোন সহজ কাজ ছিলনা। দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতিতে ‘বিশ্বাস’ শব্দটির অভাব প্রকট হয়ে উঠেছে। তাই মানুষ কোটি টাকা কোন রাজনীতিবিদের হাতে তুলে না দিয়ে সাধারণ মানুষের হাতে দিয়েছেন। তারা বুঝতে পেরেছেন জনদরদীর হাঁকডাক মারা লোকেরাই মূলত রক্তচোষা। তারাই গরীব মানুষের ত্রাণ চুরি করে খাটের তলায় লুকিয়ে রেখেছিল। সিলেটের বন্যা প্লাবিত এলাকায় মানবিকতা ও অমানবিকতা দুটোই দেখলো। সারা দেশ থেকে মানবতার ডাকে সাড়া দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ত্রাণ দিতে গিয়ে দেখে নৌকার মাঝি অস্বাভাবিক ভাড়া দাবি করে বসে আছে। ব্যবসায়ীরা নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। দশ টাকার মোমবাতি একলাফে একশ টাকা হয়ে গেল। কথিত জনদরদীরা বন্যাকবলিত এলাকায় যাননি। বৃষ্টি ও বন্যার পানি কমে আসার পর অনেক রাজনীতিবিদ ফটোসেশানের জন্য গেলেও জনগণের তোপের মুখে পড়তে হয়েছে।
অন্তঃস্বত্তাকে চিকিৎসকের কাছে বহনের নৌকা কেড়ে নেওয়া কিংবা ফটোসেশান করতে গিয়ে জনগণের তোপের মুখে পড়ে এলাকা ছাড়তো হয়েছে। এতে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের নৈতিকতা ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, অবক্ষয় ফোটে উঠেছে। তবে এমন অমানবিক গল্পের বিপরীতে সুন্দর মানবিক গল্পও রয়েছে। সারা দেশের মানবিক মানুষ তহবিল গঠন করে খাদ্য, ওষুধ সহ নানা সামগ্রী নিয়ে বন্যার্তদের সহায়তায় ছুটে গিয়েছেন। সিলেটে বন্যার্তদের সামনে আরো কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। ভেঙে যাওয়া বাড়ি ঘর নির্মাণ ও মেরামত করা। পানিবাহিত রোগ সহ নানা রোগের সংক্রমন রোধ। সব মিলিয়ে কটিন সময় মোকাবিলা করতে হবে। ঘরবাড়ি, ভিটেমাটি হারানো মানুষ গুলো ঘুরে দাঁড়ানোর সময় পাশে থাকতে হবে। তাই ত্রাণবিতরণের মত সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের মাধ্যমে বন্যাকবলিত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে।
এছাড়া অসহায় মানুষের সরলতা ও দারিদ্র্যতাকে পুঁজি করে যে কোন ধরনের প্রতারণার দিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে। সিলেটে বন্যাকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে মহা মানবিক কাব্য রচিত হলো তা অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও শিক্ষনীয়। দেশপ্রেম ও সদিচ্ছা থাকলে সবকিছু করা সম্ভব। আমরা মানবিক ও মানসিক ইতিবাচক হতে চাই। আমরা চাই সমাজ ও রাষ্ট্রে আরো বেশী মানবিকতার চর্চা হোক। আমরা বিশ্বাস করতে চাই মানুষ মানুষের জন্য। সিলেটের সরস মানবিক চিত্র দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়–ক। আমাদের আগামী প্রজন্ম বেড়ে উঠুক মানবিকতার সুখের গল্প পাঠ করে। সামাজিক অবক্ষয় ও স্বার্থবাজদের দখলে থাকা সামাজিকতা ফিরিয়ে আনতে হলে সমালোচনা বাদ দিয়ে আমাদের কাঁধে দায়িত্ব তুলে নিতে হবে। বন্যা কবলিত এলাকায় যারা অসহায়ের পাশে দাড়িয়েছেন তাদের কাছ থেকে শিক্ষা নিতে হবে। নিজ অবস্থান থেকে মানবিক ও সামাজিক কর্মকাÐ চর্চা বাড়াতে হবে। নেতার নামে নয় সামাজিক ও মানবিক ¯েøাগান তুলতে হবে। মানব ধর্মকে সামনে রেখে সামাজিক ও মানবিক কাজে এগিয়ে আসতে হবে।
আমরা চাই সিলেটের মত যে কোন দুর্যোগে সবাই মানবিক কল্যাণে এগিয়ে আসবেন। কোন মত, পথ ও বিশেষ দল নয়। মানুষ মানুষের জন্য এ ¯েøাগান বুকে ধারণ করে একে অন্যের বিপদে এগিয়ে আসতে হবে। সিলেটে যেভাবে মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার সমন্বিত পদক্ষেপ লাখো মানুষ খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দিয়েছেন। একইভাবে ঘর নির্মাণ ও মেরামত সহ পুনর্বাসনেও সবাই এগিয়ে আসবেন। সরকারি ও বেসরকারী অনুদানে সিলেটের মানুষ ঘুরে দাঁড়াবে। প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ নয়, দুর্যোগে সাহসের সাথে মোকাবিলা ও সমন্বিত পদক্ষেপ একটি সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।
লেখক: গণমাধ্যম কর্মী