সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভায় নির্বাচনী সহিংসতারোধে প্রশাসনকে দায়িত্বশীল হতে হবে

11

এখন দেশব্যাপী চলছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন থেকে শুরু করে মফস্বল পৌর শহরের মানুষ নির্বাচনী উৎসবে ভাসছে, চলছে প্রার্থীদের নানারকম প্রচারণা সেইসাথে বাড়ছে সহিংসতা। নান্দনিক প্রচারণার মাঝে হঠাৎ হঠাৎ রক্তাক্ত হচ্ছে নির্বাচনের মাঠ। বিশেষ করে সম্প্রতি দেশের দ্বিতীয় বৃহৎ বাণিজ্যিক রাজধানীখ্যাত চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনী প্রচারণাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থীদের মাঝে হিংসাত্মক কার্যক্রম ও সহিংসতার কারণ পুরো নির্বাচনী মাঠে বৈরি হাওয়া বইতে শুরু করেছে। প্রতি মুহূর্তে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী এবং দলটির বিদ্রোহী প্রার্থীর নেতাকর্মীদের মাঝে সংঘাতের খবর আসছে। বিভিন্ন স্থানে প্রার্থীদের নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের নানা অভিযোগ উঠছে। শুধু অভিযোগ নয়, আচরণবিধি লঙ্ঘনের অনেক ঘটনা দৃশ্যমানও। সিটি কর্পোরেশন এবং পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারাদেশে সংঘাত ও সংঘর্ষের ঘটনায় দেশবাসী উদ্বিগ্ন না হয়ে পারে না। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষে গত সপ্তাহে একজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ঝিনাইদহ, বগুড়া, দিনাজপুরসহ কয়েকটি উপজেলায় দল মনোনীত ও বিদ্রোহী প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘাত ও সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। এমনকি একজন বিজয়ী কাউন্সিলরকে বিজিতের প্রতিহিংসার বলি হতে হয়েছে। নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য এই প্রতিষ্ঠানকে অগাধ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এই ক্ষমতা প্রয়োগের বিষয়টি নির্ভর করে নির্বাচন কমিশনের দৃঢ়তার ওপর। ২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত স্থানীয় সরকার পর্যায়ের অসংখ্য নির্বাচনসহ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এই নির্বাচনগুলোয় কোনো ধরনের সংঘাত-সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হিসেবেই ওই নির্বাচনগুলো স্বীকৃতি পেয়েছে। আগামীকাল ১৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে দ্বিতীয় ধাপের পৌরসভা নির্বাচন। দ্বিতীয় ধাপের ৩০টি পৌরসভার সাধারণ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) মাধ্যমে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। সেইসাথে ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন। এই নির্বাচনগুলোতে বাড়তি উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসবে সংঘাতের মাত্রা তত বাড়বে। এ ছাড়া তৃণমূল আওয়ামী লীগে হাইব্রিড প্রার্থীদের কারণে এই সংঘাতের আশঙ্কা আরো বাড়ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসনকে দায়িত্বশীল ভ‚মিকা পালন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, গণতান্ত্রিক দেশের শান্তি প্রতিষ্ঠিত করতে সুষ্ঠু নির্বাচনের বিকল্প নেই। আপামর জনগণের প্রত্যাশাও তাই। নির্বাচনের আগে ও পরে আপনাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটা ভালো ভ‚মিকা থাকতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আচরণবিধি মানতে বাধ্য করতে গিয়ে এমন কিছু করবে না যেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। তবে তাদের আন্তরিকতা ও যথাযথ আইনি পদক্ষেপ প্রয়োগ করা জরুরি। আশার কথা, সম্প্রতি নগরীর পাঠানটুলিসহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে সহিংসতার ঘটনায় নির্বাচন কমিশন বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন বলে গতকাল দৈনিক পূর্বদেশে প্রকাশিত প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়। কমিশন সংশ্লিষ্ট থানার ওসিদের উপর নজরদারিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনে নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানা যায়। আমরা মনে করি, শুধু নির্বাচন কমিশনের সদিচ্ছাতেই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে না, এরজন্য নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা, প্রার্থী, তাদের সমর্থক ও ভোটারদেরও আন্তরিক হতে হবে। প্রার্থীদের উচিত হবেÑ বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম, কারচুপি, তুচ্ছ বিষয়ে অভাব-অভিযোগে মন না দিয়ে বা দখলদারিত্বের আশ্রয় না নিয়ে জনগণের রায়ের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল থাকা। মনে রাখতে হবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ফলাফলে সরকার বা রাজনৈতিক দলের তেমন কিছুই আসে যায় না। তবে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম সমন্বয় ও তদারকি করতে স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধিদের গুরুত্ব রয়েছে- এমনটি অস্বীকার করা যায় না। আমরা মনে করি, উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের স্বার্থে সবার মধ্যে নির্বাচনকে শেষ পর্যন্ত উৎসবমুখর ও কার্যকর করার বিষয়ে শুভবুদ্ধির উদয় হবে।