সিআরবি এলাকায় শতবর্ষী গাছ আমাদের প্রাণ

7

সুপ্রতিম বড়ুয়া

“একটি গাছ, একটি প্রাণ কথার কথা নয়,
তরু বিনে হয় যে মরু, জীবন সংশয়।”

বৃক্ষলতা পৃথিবীর আদি সন্তান। বৃক্ষতলে মানুষের প্রথম আবির্ভাব। আবার দাবানলের আগুনে মানুষ দীক্ষা নিয়েছে বিজ্ঞানের। কিন্তু সভ্য মানুষের বর্বর লোভ বৃক্ষ ও তরুলতার জগৎকে ধ্বংস করতে উদ্যত। বৃক্ষ নাশ করে সভ্য মানুষ শহর নামক ইট-পাথরের জঙ্গল তৈরি করেছে। বৃক্ষ নিয়েছে বিদায়। যন্ত্রসভ্যতার দূষণে মানুষ-প্রাণীর সঙ্গে তরুলতার জগতেও নেমে এসেছে বিপদের অশনি সংকেত। আজ তাই নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে, নগরায়ণ জন্য বৃক্ষ ধ্বংস করা কি উচিত কাজ হচ্ছে? প্রাণধারণের পক্ষে বৃক্ষ অপরিহার্য। যদি কোনাে কারণে আমাদের এই সবুজ চট্টগ্রাম গাছ-শূন্য হয়ে পড়ে, তা হলে এই চট্টগ্রাম থেকে আমাদের সকলের বাস উঠে যাবে। কারণ, তরুই আমাদের প্রাণ-প্রদীপটিকে জ্বালিয়ে রেখেছে বলা যায়। বেঁচে থাকার জন্য আমরা প্রতি মুহূর্তে অক্সিজেন গ্যাস গ্রহণ করছি এবং নিশ্বাস ছাড়ার সময় ত্যাগ করছি কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস। এক হেক্টর আয়তনের ঘন অরণ্য বছরে প্রায় চার টন ওজনের কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস শুষে নেয় ও দেয় প্রায় দু-টন বিশুদ্ধ অক্সিজেন। এ ছাড়া বায়ুতে উপাদান হিসেবে নাইট্রোজেন গ্যাস গাছ নিজের প্রয়োজনে কাজে লাগায়। সুতরাং বােঝা যাচ্ছে, জীবজগতের পরিবেশরক্ষায় গাছ কতখানি প্রয়ােজনীয়। অক্সিজেন গ্যাস না-পেলে আমাদের হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে মৃত্যু ঘনিয়ে আসবে। আমাদের এই চট্টগ্রামে একসময় বৃক্ষরাজিতে ছিল সমৃদ্ধ। লােকসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা সেই অরণ্যভূমি কেটে তৈরি করে চলেছি বসতি। জ্বালানি সংগ্রহের জন্য এবং অনেক সময় শৌখিন আসবাব ও দরজা-জানালার জন্য গাছের পর গাছ কেটে চলেছি। নির্বিচারে গাছ কাটা নয়, গাছ লাগিয়ে যাওয়াই হবে এখন আমাদের প্রধান কাজ। জনবসতির অনুপাতে গাছের পরিমাণ নির্দিষ্ট হওয়া দরকার। গাছ না থাকলে বর্ষা হওয়া কঠিন। গাছই টেনে আনে জলভরা মেঘ, আনে মৌসুমি বাতাসের শীতলতা। মৌসুমি বৃষ্টির কল্যাণেই আমাদের দেশে চাষবাস হয়। বাংলাদেশের জনসংখ্যার অনুপাতে এই অরণ্য যথেষ্ট নয়। তাই আমাদের বেঁচে থাকার জন্য এবং পরিবেশকে সুস্থ ও স্বাভাবিক রাখার জন্য দরকার অরণ্য সৃষ্টির দরকার শত শত গাছ লাগানো। কেবল মানুষ নয়, জীবকুলকে বাঁচাতে হলেও এই গাছের প্রয়োজন। এই পৃথিবীতে সুস্থভাবে, সুখে-শান্তিতে বাঁচতে হলে আমাদেরকে সবুজায়নের দীক্ষা নিতে হবে। গাছপালার প্রতি গভীর অনুরাগ সৃষ্টি করতে হবে। অসুস্থ চট্টগ্রামকে সুস্থ করার সংকল্প দিকে দিকে প্রচার করতে হবে “গাছ লাগান, প্রাণ বাঁচান।” গাছই আমাদের প্রাণ, আমাদের বাঁচার মন্ত্র।
চট্টগ্রামের ফুসফুস হিসেবে পরিচিত সিআরবি এলাকার আশেপাশে শতবর্ষী গাছ কাটা হলে বিরাণ ভূমিতে পরিণত হবে। ধ্বংস হয়ে যাবে সেখানকার হরেক প্রজাতির উদ্ভিদ-প্রাণিসহ প্রাণ-প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য। ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রাকৃতিক শোভামন্ডিত চির সবুজ সিআরবি এলাকা ধ্বংস করে যে কোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করলে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে। পৌনে এক কোটি মানুষের এই নগরীতে বুকভরে নিঃশ্বাস নেবার স্থানটিকে ঐতিহ্য হিসাবে সংরক্ষণের কোন বিকল্প নেই। কারণ সিআরবি এখন চাটগাঁবাসীর জীবনের অংশ।চট্টগ্রাম নগরীর প্রাণকেন্দ্রে সবুজ পাহাড় ঘেরা ছায়া-সুশীতল সিআরবি এলাকায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের উঠ নামার সংযোগ রাস্তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হতেই প্রতিবাদমুখর চট্টগ্রাম। পরিবেশ বিনাশী এই কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে চলছে সামাজিক আন্দোলন। সামাজিক মিডিয়াতে প্রতিবাদের ঝর উঠেছে। পাহাড়ের মাঝে প্রাকৃতিক শোভামন্ডিত এলাকায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এর সংযোগ স্থল তৈরি হলে শতবর্ষী অনেক গাছ কাটা পড়ার পাশাপাশি এখানকার সবুজ নিঃসর্গ ধ্বংস হয়ে যাবে। কার্বন ও অক্সিজেনের ভারসাম্য বিনষ্ট হয়ে তাপমাত্রা বেড়ে যাবে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে গোটা নগরীতে। একশ’ থেকে দেড়শ’ বছর বয়সী এক একটি গাছে শতাধিক উদ্ভিদ ও প্রাণির বসবাস। চট্টগ্রাম মহানগরীর সিআরবি এলাকা হয়ে টাইগারপাস মোড় পর্যন্ত একটি র‌্যাম্প নির্মিত হবে। সরজমিনে দেখলাম এই র‌্যাম্পটি নির্মাণে মহানগরীর ‘ফুসফুস খ্যাত’ সিআরবি এলাকার অন্তত একশটি শতবর্ষী গাছ কাটার উদ্যোগ নিয়েছে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সেবা সংস্থা সিডিএ। ইতোমধ্যে সবুজঘেরা সিআরবি এলাকায় দÐায়মান বিশাল বিশাল এসব শতবর্ষী গাছে রং দিয়ে নাম্বারও দেওয়া হয়েছে। র‌্যাম্পের পিলার কোথায় হবে, সেটাও চিহ্নিত করে লাল রং দিয়েছে সংস্থাটি। এসব গাছ কাটা হলে প্রাণ-প্রকৃতি বিনাশ হয়ে যাবে। সিআরবিতে বিরল প্রজাতির অনেক গাছ পালা, পাখ-পাখালি এবং প্রাণি রয়েছে। জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হলে এসব বৃক্ষ ও প্রাণি বিলুপ্ত হবে। নগরীর ফুসফুসের স্থান বলে আর কিছুই থাকবে না। তাই বলছি সিআরবি এলাকায় শতবর্ষী গাছ আমাদের প্রাণ। এগুলো কাটবেন না।

লেখক : শিশুসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিত